সুইস পাহাড়ের গভীরে মহাকাশচারীদের স্কুল

সুইজারল্যান্ডের এক পাহাড়ের গভীরে একটি সাবেক অতি-গোপনীয় সামরিক দুর্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ‘চাঁদের ঘাঁটিতে জীবন’ কেমন হতে পারে, তার অনুকরণ করে গ্রীষ্মের কিছু দিন কাটিয়েছেন। বিশ্বের প্রথম ও বৃহত্তম এই ছাত্র-নেতৃত্বাধীন মহাকাশ উদ্যোগ, ‘অ্যাসক্লেপিওস’ -এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের মহাকাশ পেশাদাররা চরম পরিস্থিতিতে মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন।

মহাকাশচারী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকেরই শৈশবের স্বপ্ন। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জিং পেশা অর্জনের কোনো স্পষ্ট পথ নেই। ফ্রান্সের টুলুজের ইনস্টিটিউট সুপেরিয়র ডি ল’এরোনটিক এট ডি ল’এসপাস (আইএসএই-সুপারিয়েরো) -এর ২৪ বছর বয়সি আমেরিকান অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং মাস্টার্স ছাত্রী ক্যাটি মালরি বলছেন, ‘আমি খুঁজছিলাম কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবো, কী পড়বো। কিন্তু সত্যি বলতে, এর কোনো স্পষ্ট পথই নেই।’

astronauts-school1

মালরি, অ্যাসক্লেপিওস -এর প্রকল্প নেত্রী; যা বিশ্বের প্রথম ও সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ছাত্র-নেতৃত্বাধীন মহাকাশ উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর অনুকরণীয় মহাকাশ মিশন পরিচালনা করে।

গ্রিক পুরাণে অ্যাপোলো হলেন সূর্য, জ্ঞান ও ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা। তারই নামে নাসার চন্দ্রাভিযানের নাম হয়েছিলো ‘অ্যাপোলো’।

astronauts-school2

মালরি বলেন, অ্যাসক্লেপিওস অ্যাপোলোর পুত্র। এটা যেন অ্যাপোলো কর্মসূচির পদাঙ্ক অনুসরণ করে আবার চাঁদে ফিরে যাওয়া।

গোপনীয় দুর্গে অনুকরণীয় ঘাঁটি

অ্যাসক্লেপিওস -এর পঞ্চম মিশন—অ্যাসক্লেপিওস ভি—এর চূড়ান্ত পর্যায়ে ৯ জন আন্তর্জাতিক ছাত্র-ছাত্রী চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটিয়েছেন সুইজারল্যান্ডের টিচিনোর গথার্ড সামরিক দুর্গের গভীরে, যা একসময় অতি গোপনীয় ছিলো।

স্থানের বৈশিষ্ট্য

astronauts-school9

ঘন কুয়াশা এবং আল্পসের নিচে লুকিয়ে থাকা এই জায়গাটি ইচ্ছাকৃতভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের ভেতরে খোদাই করা এই সুড়ঙ্গের জালটি প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার (২.১৭ মাইল) লম্বা, যেখানে তাপমাত্রা সারাবছর ধরে স্থির ৬° সেলসিয়াস (৪২.৮° ফারেনহাইট)।

এই অন্ধকার, ঠান্ডা ও সংকীর্ণ পরিবেশটি চাঁদের ‘গুহা’ (আসলে চন্দ্র লাভা-সুড়ঙ্গ) এর ভিতরে অবস্থিত একটি ঘাঁটির প্রতিনিধিত্ব করে। এর লক্ষ্য হলো চাঁদ বা মঙ্গলের চরম পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে আচরণ করবে—এই জটিল চ্যালেঞ্জগুলো বোঝা এবং পৃথিবীতেই তা শেখা।

astronauts-school4

মালরি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমার লক্ষ্য মহাকাশে মানুষের জীবন আরো সহজ করা, হয়তো একদিন নিজেও মহাকাশে যাওয়া।’

বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ ও বিনামূল্যে অভিজ্ঞতা

অ্যাসক্লেপিওসে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৬০ জন সদস্য রয়েছে এবং এটি ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) ও নাসার নির্বাচন ও প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার অনুকরণে গড়ে উঠেছে।

এখানে পুরো বছর ধরে অংশগ্রহণকারীরা চরম পরিবেশে প্রশিক্ষণ নেন—শীতে আল্পসে হাইকিং, হিমায়িত হ্রদের নিচে ডুব দেওয়া, জিরো-গ্র্যাভিটি প্যারাবলিক ফ্লাইটে যোগ দেওয়া এবং প্রাথমিক চিকিৎসা, বেঁচে থাকার কৌশল ও উদ্ধার দক্ষতা শেখা।

অ্যাসক্লেপিওসের একটি বিশেষ দিক হলো, নির্বাচিত অংশগ্রহণকারীদের জন্য এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। অলাভজনক সংগঠন হিসেবে তারা পুরোপুরি দান ও স্পনসরশিপের ওপর নির্ভর করে।

astronauts-school3

ব্রাজিলের বাসিন্দা মাতেউস মাগালহায়েস (২৭), যিনি এই মিশনে কমান্ডারের ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকেই বিমানের প্রতি মুগ্ধ ছিলেন এবং অ্যাসক্লেপিওস -এর মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষে এতো ব্যয়বহুল মিশনগুলোতে অংশ নেওয়া সম্ভব হয়।

সূর্যের আলোবিহীন মিশনে বিজ্ঞান পরীক্ষা

মিশন কন্ট্রোল সেন্টারে (এমসিসি) পৃথিবী বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ২৫ বা ৩০ জন শিক্ষার্থী অনুকরণীয় মিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ‘ইগনিশন’ ঘোষণার মাধ্যমে মিশন শুরু হওয়ার পর, অ্যানালগ মহাকাশচারীরা একদিনের যাত্রার পর ‘চাঁদের ঘাঁটি’তে প্রবেশ করেন। পরের ১৬ দিনের জন্য এটিই তাদের বাসস্থান।

astronauts-school5

তারা আসল মহাকাশচারীদের মতো ডিহাইড্রেটেড খাবার খান এবং প্রস্তুত করা বিজ্ঞান পরীক্ষাগুলো চালান।

তারা পুরো সাজসজ্জা ও মহাকাশ স্যুট পরে চাঁদের হাঁটা অনুকরণ করেন। দুর্গের সুড়ঙ্গগুলো এক্ষেত্রে চাঁদের লাভা-সুড়ঙ্গের মতো কাজে লাগে।

পরে প্রশিক্ষণার্থীরা পুরো সময় সূর্যের আলো এড়িয়ে থাকেন। এমনকি অনুকরণীয় ‘চাঁদের হাঁটা’ ও রাতেই হয়, যাতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর মতো পরিবেশের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যায়। এই বিশেষ প্রকল্পের নাম ‘ক্রোনোএসপাজিও’ বা ‘সিমুলেটেড স্পেসে সার্কাডিয়ান রিদম ও ঘুম’।

astronauts-school6

প্রধান গবেষক মারিয়া কোমাস সোবেরাতস -এর নেতৃত্বে ক্রু-রা ঘুম ও শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য কবজিতে পরিধানযোগ্য যন্ত্র ব্যবহার করেন। মেলাটোনিনের মাত্রা এবং দৈহিক ছন্দের জিন প্রকাশ পরিমাপ করতে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

পৃথিবীর উপকারে মহাকাশের প্রযুক্তি

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের ২৩ বছর বয়সি ব্রিটিশ পিএইচডি গবেষক ম্যাথিউ অ্যাসেভস্কি, যিনি এই মিশনে বিজ্ঞান কর্মকর্তার ভূমিকায় অভিনয় করছেন, তিনি বলেন, অ্যাসক্লেপিওস তাকে সত্যিকারের হাতে-কলমে কাজের সুযোগ দিয়েছে এবং এই অভিজ্ঞতা মানুষের মহাকাশযাত্রা গবেষণার দিকে তার আগ্রহ আরো বাড়িয়েছে।

astronauts-school7

লরেন ভিক্টোরিয়া পলসন (২২), জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ব্রিটিশ-আমেরিকান পিএইচডি ছাত্রী। তিনি ক্রু’র ঘাঁটির ইঞ্জিনিয়ার। লরেন বিশ্বাস করেন, মহাকাশ মিশনের প্রভাব পৃথিবীতেও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। মহাকাশের একটা আশ্চর্যজনক দিক হলো, সেখানে কিছুই নষ্ট করা যায় না— এক ফোঁটা পানিও না।

মহাকাশের জন্য ডিজাইন করা প্রযুক্তিগুলোকে ছোট করে এনে পৃথিবীর চরম ঠান্ডা পরিবেশ, মরুভূমি বা পানির অভাবে থাকা এলাকায় ব্যবহার করা যায়।

তিনি বলেন, অনেক প্রযুক্তি মহাকাশ থেকে শুরু হয়ে পৃথিবীর প্রয়োজনে এসেছে... আমাদের সব মোবাইল ফোন মহাকাশের স্যাটেলাইট ব্যবহার করে।

astronauts-school8

লরেন ভিক্টোরিয়া বলেন, ‘প্রতিবার আমরা আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা ঠেলে একটু একটু করে মহাকাশচারীর মতো হয়ে উঠি। বিষয়গুলো কঠিন মনে হলেও স্থিতিস্থাপক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’ তথ্যসূত্র : বিবিসি।