স্ত্রীর খোঁজে ১৫ বছর ধরে সমুদ্রে ডুব দিয়ে যাচ্ছেন এক স্বামী!

জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে সুনামি যখন সবকিছু কেড়ে নিয়েছিলো, তখন সমুদ্রের বিশাল জলরাশি শুধু ঘরবাড়িই ভাসিয়ে নেয়নি, ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল বহু ভালোবাসার গল্পও। তবে সেই দানবীয় সাগরের জলরাশিই আজ এক নিঃসঙ্গ স্বামীর জন্য হয়ে উঠেছে শোক, স্মৃতি ও পরম সংযোগের একমাত্র ঠিকানা।

Yasuo Takamatsu 03
প্রতি মাসে দুবার, মুখে মাস্ক, পিঠে এয়ার ট্যাংক আর ওয়েট বেল্ট পরে জাপানের মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে ছোট একটি নৌকায় চেপে রওনা হন পঞ্চাশোর্ধ্ব ইয়াসুও তাকামাতসু। গন্তব্য, উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে সমুদ্রের সেই হিমশীতল পানি, যে পানি ২০১১ সালের এক অভিশপ্ত সকালে তাঁর কাছ থেকে চিরতরে কেড়ে নিয়েছিল প্রিয় স্ত্রী ইউকোকে।

২০১১ সালের সেই ভয়াবহ সুনামির সকালে ইয়াসুও নিজেই স্ত্রীকে কর্মস্থলে নামিয়ে দিয়েছিলেন। গাড়ির সংক্ষিপ্ত যাত্রায় দুজন গল্প করেছিলেন রাতের খাবার কী হবে তা নিয়ে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বেজে ওঠে সুনামির সতর্কীকরণ সাইরেন।

Yasuo Takamatsu 06
ইউকো তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যাংকের ছাদে আশ্রয় নেন এবং স্বামীকে শেষ একটি বার্তা পাঠান- ‘তুমি কি নিরাপদ আছো? আমি বাড়ি যেতে চাই’। বার্তাটি দেখে ইয়াসুও ভেবেছিলেন স্ত্রী হয়তো নিরাপদে আছেন। কিন্তু পরদিন আশ্রয়নেন্দ্রে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, সুনামি ইউকোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। সেই শুনে পুরো শক্তি হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন ইয়াসুও।

পরবর্তী সময়ে শত শত মৃতদেহ উদ্ধার হলেও ইউকোর দেহাবশেষের আর কোনো সন্ধান মেলেনি। দুই বছর ধরে উপকূলরক্ষী বাহিনীর উদ্ধারকাজ দেখার পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন ইয়াসুও। নিজের স্ত্রীর দেহ না হলেও অন্তত তাঁর কোনো স্মৃতি বা জিনিসপত্র খুঁজে পাওয়ার আশায় পঞ্চাশের কোঠায় এসে সাঁতার ও ডাইভিং শেখেন তিনি। সেই থেকে শুরু, গত ১৫ বছরে ৭৬০টিরও বেশি ডাইভ দিয়েছেন তিনি পানির নিচে।

Yasuo Takamatsu 04
বৌদ্ধধর্মীয় রীতির কুয়োর মাধ্যমে জাপানিরা মৃত স্বজনদের স্মরণ করলেও ইউকোর কোনো কবর না থাকায় ইয়াসুও সেভাবে শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি। তাই সমুদ্রের তলদেশে ডুব দেয়াটাই এখন তাঁর কাছে নিজস্ব এক পবিত্র রীতিতে পরিণত হয়েছে। ইয়াসুওর মতে, এটা কবরে গিয়ে স্মরণ করার চেয়ে আলাদা। কারণ সে কবরে নেই, সমুদ্রেই আছে। পানিতে নামলে মনে হয় যেন আমি সরাসরি তার সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছি।

পানির ৫০ মিটার গভীরে যখন ধ্বংসস্তূপ, আধভাঙা গাড়ি কিংবা স্মৃতিচিহ্নগুলো চোখে পড়ে, তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন ইয়াসুও। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সমুদ্রকে তিনি ঘৃণা করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রকৃতি যেমন একহাতে সব কেড়ে নেয়, তেমনি অন্যহাতে বেঁচে থাকার পথও তৈরি করে। আজ ১৫ বছর ধরে সাগরের তলদেশে ভাঙা গাড়িগুলো নতুন প্রবাল প্রাচীরে পরিণত হয়েছে, সেখানে মাছেরা খেলা করে, ডিম পাড়ে, বিনাশের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় নতুন জীবন।

Yasuo Takamatsu 05
ডুব দিতে যাওয়ার পথে ইয়াসুও সবসময় হাসিখুশি ও প্রাণবন্ত থাকেন। শ্লেষাত্মক রসিকতা করে বলেন, আজ যদি ইউকোর সাথে আমার দেখা হতো, সে হয়তো প্রথম দেখাতেই অবাক হয়ে বলতো, তোমার তো বয়স হয়ে গেছে! সম্প্রতি এটি ছিল তাঁর ৭৬৩তম ডুব। স্ত্রী ইউকোর কাছাকাছি থাকার এই ব্যাকুল আকুতি ও সমুদ্রের নীল জলরাশিতে তাঁর এই অনুসন্ধান এখনও থামেনি। শোকের সেই তীব্র ক্ষত আর ক্ষমার সমুদ্রকে সঙ্গী করে ইয়াসুও নিশ্চিতভাবেই খুব দ্রুত আবার ফিরে যাবেন সাগরের গভীর তলদেশে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া