ঢাকা ০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

গল্প: আমার বাবার ভায়োলিন

শামীম আল আমিন
প্রকাশ: ০২ মে ২০২২ ১১:৪৩:৫৩ আপডেট: ০২ মে ২০২২ ১৫:৩৫:০৫
গল্প: আমার বাবার ভায়োলিন

শফিক সাহেবের চোখ দুটো বার বার জলে ভরে উঠছে। দৃষ্টি অস্বচ্ছ হয়ে আসছে। তিনি কয়েকবার ফুঁপিয়ে কেঁদেও উঠলেন। বুকের ভেতরে কেমন যেনো এক ধরণের হালকা চাপ অনুভব করছেন। তীব্র ভালোলাগা আর আবেগ মিলিয়ে অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি হয়েছে তার মনের মধ্যে। গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি সেই আনন্দাশ্রুর পথে বাঁধ দেয়ার কোন চেষ্টাই করলেন না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। অদ্ভুত আলো আঁধারি। সামনে সারি সারি গাছ। লম্বা কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে দানবের মতো। তার ফাঁক গলিয়ে আকাশে বিশালাকৃতির এক চাঁদ দেখা যাচ্ছে। রহস্যময় চাঁদের আলোয় যেনো সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। চাঁদের প্রতিচ্ছবি পড়েছে সামনের লেকে। মনে হচ্ছে যেনো চকচকে একটা রূপার থালা ভাসছে। শফিক সাহেব মনে মনে বার দুয়েক বললেন, ‘জীবন এত সুন্দর কেন!’

রাতের এই সময়টাতেও বাড়ির সামনের রাস্তা ধরে গাড়ির আনাগোনা থাকার কথা। কিন্তু কিযে হোল আজ; এই পথটাকে মনে হচ্ছে জনমানবহীন। জায়গাটা নিউইয়র্ক সিটির একটু বাইরে। লং আইল্যান্ডের নিউ হাউড পার্কে। বেশ সুন্দর; ছিমছাম পরিপাটি চারপাশ। ছবির মতো সাজানো।

পাশের রুম থেকে ভায়োলিনের সুর ভেসে আসছে। শফিক সাহেব মনে মনে ভাবছেন, এমন সুর এর আগে কখনো, কোনদিন শোনেননি তিনি। এই পৃথিবীর কেউ কখনো এমন সুর তোলেনি। বেণু আকুল হয়ে ভায়োলিন বাজাচ্ছে। রাতের এমন পরিবেশ; চাঁদের আলোর বন্যায় মনে হচ্ছে অন্য এক ভুবন। যেখানে কেবল সুন্দরের মেলা। শফিক সাহেব ভাবছেন, এমন আনন্দ এক জীবনে তিনি আর কখনোই পাননি। বেণু তাকে রীতিমতো চমকে দিয়েছে। মেয়েটার জন্য গভীর মমতায় বুকটা ভরে উঠেছে তার। তিনি বার বারই ভাবছেন পনেরো বছরের মেয়েটা এমন ভায়োলিন বাজানো কোথা থেকে শিখলো।

শফিক সাহেব তার মেয়ের বাজানো ভায়োলিনের সুরে ডুবে গেলেন। এর মধ্যেই মাথার মধ্যে একটা গানের কয়েকটা লাইনও ঘুরতে থাকলো, ‘ছেলেবেলার সেই বেহালা বাজানো লোকটা, চলে গেছে বেহালা নিয়ে, চলে গেছে গান শুনিয়ে’। নাগরিক কবিয়াল কবির সুমন গাইছেন দরদ দিয়ে। কোথাও তো গানটা বাজছে না। তাহলে তিনি কিভাবে শুনছেন। বুঝতে পারছেন না; আসলে কি হচ্ছে। শফিক সাহেব গুনগুন সেই সেই গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলাতে শুরু করলেন। শফিক সাহেবের মনে এলো মেলো ভাবনা। হঠাৎ বব ডিলানের সেই মিস্টার টাম্বোরিন ম্যানের কথাও মাথায় আসে। তার মতো কাউকে যদি পাওয়া যেতো, তাহলে চাঁদের আলোয় ভাসিয়ে দেয়া এই রাতে তিনি একটা গান শুনতে চাইতেন। সঙ্গে বাজতো বেণুর বেহালা। আর তিনি বলতেন ‘হেয়, মিস্টার ট্যাম্বোরিন ম্যান, আমার জন্য একটা গান গাও। আমার ঘুম আসছে না এবং আমার কোথাও যাওয়ার নেই’।

****

বছর কয়েক আগের কথা। স্কুল থেকে ফিরে বাবার সামনে একটা কাগজ বাড়িয়ে দেয় বেণু। ‘বাবা এখানে সাইন করতে হবে। টিচার আমাকে বলেছে, অকেস্ট্রা টিমে যোগ দিতে। আমি ফ্লুট শিখতে চাই বাবা’।

শফিক সাহেব কাগজটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে দেখেন তার মেয়েটা গোটা গোটা অক্ষরে লিখে ফরমটা পূরণ করে এনেছে। পছন্দের ইন্সট্রুমেন্ট এর ঘরে লিখেছে ‘ফ্লুট’। নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন করেন শফিক সাহেব, ‘বাঁশি শেখার আগ্রহ কোথায় পেলো মেয়েটা’?

মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি হেসে বললেন, ‘বাবা ফরমটা কি এক্ষুনি সই করে দিতে হবে’?

‘হ্যাঁ দিয়ে দাও’। বেণু কখনো কখনো অস্থির ধরণের আচরণ করে। কখনো কিছু একটা বললে, এমনভাবে বায়না ধরে যেনো তার সেটা তক্ষুনি চাই। তবে মেয়েটা তার খুব লক্ষ্মীও হয়েছে। বাবা মায়ের কথা খুব শোনে। বুঝিয়ে বললে বোঝে।  সে যখন আরও ছোট ছিল তখন প্রায়ই বলতো, “মা আমাকে বুঝিয়ে বলেছে, আমি বুঝেছি”।

শফিক সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, “ফ্লুট শিখতে চাও কেন? আমি বলি কি ভায়োলিন শেখো। এটা ভালো হবে”।

ছোট্ট মেয়েটা জোড়ালো প্রতিবাদ করতে পারে না। তবে অনেকটা অবদারের সুরে বলতে থাকে, ‘প্লিজ বাবা আমি ফ্লুট শিখবো। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ’।


শফিক সাহেব তখন আর কিছু বলতে পারলেন না। মেয়ের এমন আকুতির পর তার কিছু বলতেও ইচ্ছা করছে না। তবে মনের মধ্যে গোপন ইচ্ছাটাকেও চট করে ঝেড়ে ফেলতেও পারছেন না। বারবারই মনে হচ্ছে, যদি মেয়েটা ভালোবেসে ভায়োলিন শিখতো, যদি জগৎ আলো করতো তার সুরের ঝলকানি; তবে মনে শান্তি পেতেন তিনি।

কাগজে সই না নিয়েই তখনকার মতো বিদায় নিল বেণু। শফিক সাহেবের খুব খারাপ লাগছে। শোবার ঘরটা অন্ধকার করে শুয়ে নানা কিছু ভাবছেন। চোখ বন্ধ করে আছেন, তবে ঘুমাননি। এমন সময় রাবেয়া শোবার ঘরে ঢুকলেন। স্বামীর পাশে বসতে বসতে বললেন, “ঘুমিয়ে না থাকলে একটা কথা বলতাম”।

চোখ খুললেন শফিক সাহেব। ‘বলো’।

রাবেয়া বললেন ‘ভায়োলিন শেখাটা কি খুব জরুরী। মেয়েটা যা শিখতে চায়, তাই শিখতে দাও। ওকে ডেকে একথাটা বলে দাও’।

শোয়া থেকে উঠে বসতে বসতে শফিক সাহেব ডাকতে থাকেন, ‘বেণু, মা বেণু, এদিকে আয় তো’।

বেণু এসে ঘরে ঢুকলো। বাবা-মায়ের মাঝখানে এসে বসলো। ‘আমায় ডেকেছো বাবা’। এত সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা। আমেরিকায় বড় হচ্ছে। ইংরেজিতে পড়াশোনা করছে। কিন্তু কি সুন্দর করেই না বাংলাটা বলে। শুনলে মনটা ভালো হয়ে যায়।

শফিক সাহেব মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘তোমার যেটা শিখতে মন চাইবে, সেটাই শিখবে। সেটাই তুমি ভালো শিখতে পারবে। একদম মন খারাপ করবে না’। 

‘কি খুশি তো’? এবার রাবেয়া যোগ করেন।

খুশিতে ঝলমল করে উঠলো বেণুর মুখটা। তবে সে অবাক করে দিয়ে বাবা-মাকে বললো, ‘থাক মা ভায়োলিনই শিখি। দুটোই তো আমার জন্যে নতুন। একটা শিখলেই হলো’।

অতটুকুন মেয়ে, বড়দের মতো করে কথা বলে। শফিক সাহেব অবাক। রাবেয়াও মাঝে মাঝে ভাবে, ‘এই মেয়েটাতো অনেক বুঝতে পারে’। তিনজনই একসঙ্গে হেসে ওঠে।