ঢাকা ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮

গোপন কথাটি আর থাকছে না ‘গোপন’

হৃদয় আলম
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২১ ১৪:৫৫:১৪ আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২১ ২১:৩০:১০
গোপন কথাটি আর থাকছে না ‘গোপন’

পক্ষীরাজ পেগাসাসকে বশে এনেছিলেন রাজা বেলেরোফোন। তিনি দেবী অ্যাথেনার মন্দিরে রাত্রিযাপন করে মনোবাসনা পূর্ণ করেছিলেন। 

দেবীর দান করা সোনার তৈরি লাগামে বশে আসে ‘পক্ষীরাজ পেগাসাস’। আর ‘স্পাইওয়্যার পেগাসাস’ দিয়ে বিভিন্ন দেশের কর্তাব্যক্তিরা বশে আনছেন প্রতিপক্ষকে। 

আড়ি পেতে থাকা এই সফটওয়্যার ফাঁস করছে গোপন সব নথি। বাদ যাচ্ছেন না সাংবাদিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, অধিকারকর্মী কেউই। 

আর দেবী অ্যাথেনার মতোই পেগাসাস স্পাইওয়্যারের ক্রেতাদের তথ্য পেতে সহায়তা করে যাচ্ছে ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান ‘এনএসও’ গ্রুপ।

এনএসও’র বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই ২০১২ সাল থেকে। স্প্যানিশ ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা ল্য পিরেনসার খবরে বলা হয়েছে, পানামায় ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি রিকার্ডো মার্টিনেল্লি এটি ব্যবহার করেছিলেন। 

একই সময়ে হোয়াটসঅ্যাপ অভিযোগ করে, এনএসও’র পেগাসাস কমপক্ষে ১৫০ জনের তথ্য ফাঁস করেছে। সে সময় আলোচনায় আসে আরও একটি ইসরাইলি প্রতিষ্ঠান এমএলএম প্রটেকশন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন দেশের সরকার বৈধ লাইসেন্সে পেগাসাস ব্যবহার করেছে। হোয়াটসঅ্যাপ বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ মানুষের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ এনেছে ইসরাইলি এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে পেগাসাস। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট, লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান, ফ্রান্সের লা মঁদ, মেক্সিকোর এরিস্টেগুই নোটিশিয়াস, জার্মানির ডাইজিট, জার্মানির সুদডিউসচে জাইতুং, নক, রেডিও ফ্রান্স, স্পেনের ল্য পিরেনসা, বেলজিয়ামের লি সোয়ার, ইসরাইলের হারাতেজ, সাংবাদিকদের সংগঠন ফরবিডেন স্টোরিস এবং মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিশ্বের প্রথম সারির ১৭টি মিডিয়ার যৌথ অনুসন্ধানে ৮০ জন সাংবাদিকের সহায়তায় পেগাসাস নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসে। 

এই অনুসন্ধানে আরও যুক্ত ছিল দ্যা অর্গনাইজড ক্রাইম অ্যান্ড কর্পোরেশন রিপোর্টিং প্রোজেক্ট, দারেজ, দ্যা উইয়ার, ডাইরিক্ট, ফ্রন্টলাইনের মতো প্রতিষ্ঠান। আর এতেই নড়েচড়ে বসেন বিশ্বনেতারা। আলোচনা হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও।

ব্রিটেনের শীর্ষ দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, পেগাসাস স্পাইওয়ার ব্যবহার করে আড়িপাতা হয়েছে বিশ্বের কমপক্ষে ৪৫টি দেশের প্রায় ৫০ হাজার টেলিফোন নম্বরে।

তবে, সব অভিযোগ অস্বীকার করে এনএসও কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন, পেগাসাস প্রযুক্তি থাকায় বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ নিরাপদে রাস্তায় হাঁটতে পারেন এবং শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। 

তারা তাদের এই প্রযুক্তির সহায়তায় গোয়েন্দা ও আইনি সংস্থাগুলোর কাজে সহায়তা করে থাকেন। একই ধরনের কথা লেখা রয়েছে এনএসও’র ওয়েবসাইটে। 

সেখানে বলা হয়েছে, ‘এনএসও এমন প্রযুক্তি তৈরি করে যা সরকারি এজেন্সিগুলোকে সহায়তা করে। এটি কাজ করে সন্ত্রাসবাদ এবং অপরাধের বিরুদ্ধে।’

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২১ সাল পর্যন্ত পেগাসাস আক্রমণের জন্য ‘জিরো ক্লিক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এ আক্রমণগুলো ২০১৮ সালের মে মাস থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ২০২১ সালের জুলাইয়ে দেখা যায়, আইফোন ১২ তে আক্রমণের জন্য অনেকগুলো শূণ্য ব্যবহার করে পেগাসাস।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, পেগাসাসের বর্তমান ভার্সনটি চালু হয়েছে ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে। ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে চারবছরে এর কমপক্ষে তিনটি ভার্সন বন্ধ হয়েছে।

সূত্র বলছে, লিঙ্কে ক্লিক করলে যেমন পেগাসাস ইন্সটল হয় তেমনি হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস কল করে ঢোকানো যায় এ স্পাইওয়্যার। হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলেও পেগাসাস ইন্সটল করা যায়। কল রিসিভ না করলেও এই পেগাসাস ইন্সটল করানো সম্ভব। আর এটি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে মোবাইল বন্ধ থাকলেও।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একবার ইন্সটল হলেই পেগাসাস কম-বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এটি খুদে বার্তা, ইমেইল, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ফটো এবং ভিডিও, অডিও হাতিয়ে নিয়ে পারে। এছাড়া পেগাসাস ব্যবহারকারীর ক্যামেরা চালু করতে পারে। কল রেকর্ড করতে পারে। লোকেশন চালুর পাশাপাশি কন্টাক্টের সব নম্বরও দেখতে পারে পেগাসাস।

ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, কয়েক মাস ধরে চালানো এই অনুসন্ধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যবহার করা ৫০ হাজারেরও বেশি মোবাইল ফোন নম্বর পরীক্ষা করা হয়েছে। যে ১৪ জন রাষ্ট্র এবং সরকার প্রধান পেগাসাসের টার্গেট হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে আছে তিন জন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট- ফ্রান্সের ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা এবং ইরাকের বারহাম সালিহ।

আর, ১০ জন প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে তিন জন এখনও ক্ষমতায়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মিসরের মোস্তফা মাদব উলি এবং মরক্কোর সাদ-এদিন আলওথমানি। টার্গেট হয়েছেন মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহামেদ। 

এছাড়া, ৩৪টি দেশের ৬০০ সরকারি কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিকের ফোন নম্বর রয়েছে। এছাড়া আরব রাজ পরিবারের সদস্য, ৬৪ কোম্পানি কর্মকর্তা, ১৮৯ সাংবাদিক এবং ৮৫ মানবাধিকার কর্মীরাও রয়েছেন।

ওয়াশিংটন পোস্ট সিটিজেন ল্যাবের বরাতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ফ্রান্স, কানাডা, ভারত নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইয়েমেন, লিবিয়াসহ ৪৫ দেশে পেগাসাসের গ্রাহক রয়েছে। 

ওয়াশিংটনের ওই পোস্টে আরও বলা হয়েছে, কোনো দেশে পেগাসাসের উপস্থিতি মানেই এই নয়- তার গ্রাহক শুধু দেশটির সরকার।

আমেরিকান প্রযুক্তি বিষয়ক সংবাদের ওয়েবসাইট দ্য ভার্জের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, এনএসও গ্রুপ পেগাসাস সফটওয়্যারের মূল্য নিয়ে থাকে পাঁচ লাখ ডলার। আর ফোন হ্যাক করতে আলাদা চার্জ। 

ওই সময় মোট সাড়ে ছয় লাখ ডলার নেয়া হতো দশটি আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড ফোন হ্যাক করতে। পাঁচটি ব্ল্যাকবেরি হ্যাক করতে নেয়া হতো পাঁচ লাখ ডলার। অতিরিক্ত ১০০ ফোন টার্গেট করতে আট লাখ ডলার এবং ৫০ ফোন হ্যাক করতে পাঁচ লাখ ডলার দিতে হতো। এছাড়া বার্ষিক ব্যবস্থাপনা ফি হিসেবে এনএসও মোট মূল্যের ১৭ শতাংশ নিয়ে আসছিলো।

দ্য গার্ডিয়ানের বরাতে দ্য ভার্জ বলছে, অ্যাপল কর্তৃপক্ষ এনএসও’র সক্ষমতা অস্বীকার করেনি। তারা বলছেন, ‘অ্যাপল কর্তৃপক্ষ সর্বদা গ্রাহকের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর জন্য বছর বছর কয়েক মিলিয়ন অর্থ ব্যয় করা হয়। ফলে পেগাসাস বেশিরভাগ গ্রাহকের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবেনা।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কুইন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের অক্টোবরে ফেসবুকের মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপ এনএসও বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। 

যেখানে হোয়াটসঅ্যাপ কমপক্ষে ১৪০০ ব্যবহারকারীর তথ্য হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ এনেছে পেগাসাসের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে একশ’ সাংবাদিকসহ আইনজীবী ও মানবাধিকার-কর্মীরা ছিলেন।

হিন্দুস্থান টাইমসে গৌতম ভাটিয়ার লেখা এক মতামতে দাবি করা হয়েছে, পেগাসাসের ক্ষতিকর দিকগুলোর ক্ষেত্রে দেশগুলোর সরকারের আইনি পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

এদিকে সিঙ্গাপুর ভিত্তির স্ট্রেইটস টাইমস বলছে, মরক্কোর সরকার পেগাসাস ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির সরকার বলছে, এটি বানোয়াট এবং সম্পূর্ণ মিডিয়ার কারসাজি। একইসাথে ২১ জুলাই (বুধবার) হুমকি দিয়ে দেশটির সরকার জানায়, কেউ যদি এমন অপপ্রচার করে তবে তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

অবশ্য পাকিস্তান পেগাসাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২৩ জুলাই জাতিসংঘের কাছে গোটা বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। 

ভারতে আইনজীবী এম এল শর্মা পেগাসাস ফোন হ্যাকিং কাণ্ড নিয়ে জনস্বার্থে মামলা করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্টে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছেন।

সাধারণ মানুষের ফোনে পেগাসাস থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। এ বিষয়ে একমত হয়েছেন বিশ্বের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ফোনে পেগাসাস স্পাইওয়্যার ইন্সটলের জন্য মোটা অঙ্কের একটি অর্থ ব্যয় করতে হয়। 

অন্যান্য ম্যালওয়্যারের মতো এটি গণহারে ছড়িয়ে দেয়া হয়নি। পেগাসাসও একই ধরনের দাবি করছে। বিশ্বব্যাপী ৫০ হাজারের বেশি ফোন নম্বরের তালিকা ফাঁস হওয়ার পর এনএসও দাবি করছে, তাদের গ্রাহক সংখ্যা খুবই কম। ৪০টি দেশে তাদের মাত্র ৬০ জন ক্লায়েন্ট রয়েছে। একেকটি ক্লায়েন্ট বছরে সাধারণত সর্বোচ্চ ১১২টি ফোনকে টার্গেট করে।

যে ৫০ হাজার ফোন নম্বর নিয়ে আলোচনা চলছে, তার তালিকা খুব দ্রুতই প্রকাশিত হতে পারে বলে জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে। এমতাবস্থায় নড়েচড়ে বসেছে ইসরাইল সরকার। পেগাসাসের অপব্যবহার হয়েছে কি না, এতে এনএসও গ্রুপের ভূমিকা কী ছিল, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।

ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক কমিটির প্রধান রাম বেন বারাক ২২ জুলাই দেশটির আর্মি রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে আমরা এর ফলাফল দেখতে চাইবো এবং কোনো সংশোধন করার প্রয়োজন দেখলে সেটাও করা হবে’।

ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের উপ-প্রধান ছিলেন বেন বারাক। তিনি বলেন, পেগাসাসের লাইসেন্স দেয়ার সার্বিক প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।


একাত্তর/আরএইচ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন