ঢাকা ২৯ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

পাহাড়ে মসলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে

উচিংছা রাখাইন, রাঙ্গামাটি
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২১ ২১:০১:০৩ আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২১ ২১:০৭:২১
পাহাড়ে মসলা চাষে আগ্রহ বাড়ছে

পার্বত্য জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চ মূল্যের মসলা চাষে স্থানীয় কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এ এলাকার জমি মসলা জাতীয় ফসল ও ফলের বাগানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রান্তিক কৃষকদের জন্য গ্রহণ করেছে উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ প্রকল্প।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় ‘উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ’ প্রকল্পটি একটি পাইলট প্রকল্প। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত চার বছর মেয়াদী।

পাইলট প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় উন্নত জাতের উচ্চ মূল্যের মসলা যেমন: দারুচিনি, তেজপাতা, আলুবোখারা, গোলমরিচ, জুম মরিচ, ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া ইত্যাদি চাষাবাদ করে দেশের চাহিদা পূরণ করা যাবে। এসব ফসল আবাদের ফলে কৃষকগণ লাভবান হবেন এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছেন, এ প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলার ২ হাজার ৬শ’ জন কৃষককে মসলা চাষের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত কৃষকদের বিনামূল্যে আলুবোখারা, দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ ইত্যাদি মসলার চারা-কলমও প্রদান করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এর ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ’ প্রকল্প অফিস জানায়, এর পাশাপাশি তাদেরকে প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি, সার ও রোপণ কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।


তাছাড়া স্বল্প সময়ে আয়ের জন্য কৃষকদেরকে সাথী ফসল হিসাবে পেঁপে, উন্নত জাতের পেয়ারা ও জলপাই চারা প্রদান করা হচ্ছে।

এক সময় পাহাড়ে মসলা বলতে শুধু আদা ও হলুদ চাষকে বোঝাতো। কিন্তু এখন পাহাড়ের কৃষকরা জুম চাষের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের উচ্চ মূল্যের মসলা চাষের দিকে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। অনেক কৃষক মনে করছেন এই মসলা চাষের মাধ্যমে তারা অধিক লাভবান হবেন এবং এর থেকে তারা অর্থনৈতিক মুক্তি পাবে।

রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নের বরাদম এলাকার মসলা মসলা বাগান সৃজন-কারী চাষী যুদ্ধমনি চাকমা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে আমাকে উচ্চ মূল্যের মসলা চাষ করার জন্য দারুচিনি, গোলমরিচ, তেজপাতার চারা, সার ও সেচ যন্ত্রপাতি দিয়েছে। আমি এখন জুমচাষ বাদ দিয়ে মসলা চাষ করছি। আশা করছি এই মসলা চাষে আমি লাভবান হবো।

তিনি আরো জানান, তার সৃজিত বাগান দেখে এলাকার অনেকেই মসলা বাগান করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

আরেক কৃষক রতন চাকমা বলেন, উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় আমি আমার বাগানে দারুচিনি, আলুবোখারা ও পেঁপে ও পেয়ারা বাগান করেছি। আমাকে মসলা চাষের বাগান করার জন্য সহযোগিতা করা হয়েছে। আমি উন্নয়ন বোর্ডকে ধন্যবাদ জানাই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মসলা চাষ প্রকল্পের রাঙামাটি সদর উপজেলার মাঠ সংগঠক জগদীশ্বর চাকমা জানান, এখানকার কৃষকরা আগে জুম চাষ করতো, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে মসলা চাষ সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিলোনা তাদের। এই প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর কৃষকদেরকে প্রথমে আমরা উদ্বুদ্ধ করি যে, আপনারা তো জুম চাষ করেন, জুমের পরিবর্তে মসলা চাষ আপনাদের বেশি লাভবান করে তুলবে।

তিনি বলেন, কৃষকদের আমরা কিভাবে চারা রোপণ করতে হয়, জৈব সার ও বীজ তৈরি করতে হয় তা হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।

উচ্চমূল্যের মসলা চাষ প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, এ মসলা চাষ প্রকল্পটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রকল্প। এসব ফসল কম ওজনদার, দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য ও মূল্যবান হওয়ায় কৃষকরা নিজ ঘরে তা সংরক্ষণ ও প্রয়োজনের সময়ে সহজে দূরের বাজারে নিয়ে বিক্রি করে অধিক অর্থ পেতে পারে।


মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, এটি একটি পাইলট প্রকল্প। পরবর্তীতে এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বড় আকারে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকদের জন্য মসলা চাষ প্রকল্পটি হাতে নিতে পারবো।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে এখনো অনেক অনাবাদি জমি রয়েছে যেখানে মসলা চাষের প্রচুর সম্ভাবনা  রয়েছে। দেশে মসলার চাহিদা এবং আমদানির মধ্যে অনেক ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণের জন্য বর্তমান সরকার এ প্রকল্পটি হাতে নিয়েছে।

মসলা চাষ প্রকল্পটি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় রয়েছে।

তিনি জানান, এ প্রকল্পে রয়েছে আলু বোখারা, তেজপাতা ও গোল মরিচ।

প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, আমরা এই মসলা চাষ প্রকল্পে সাথী ফসল হিসেবে কৃষকদের পেয়ারা এবং পেঁপে চারা দিয়েছি। পেয়ারা এবং পেঁপে থেকে কৃষকরা ছয়মাস থেকে এক বছরের মধ্যে লাভবান হচ্ছে।

আরও পড়ুন: রাজধানীর বাজারে চালের দামে তেলের গরম

মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এসব মসলাগুলোর আমাদের দেশে চাহিদা অনেক বেশি। এর চাহিদা পূরণ করতে পারলে আমরা দেশে আমদানি নির্ভরতা কমাতে পারবো। পাহাড়ের কৃষকরা কিন্তু খুবই উৎসাহী মসলা চাষে। অনেক কৃষক ইতিমধ্যে আলু বোখারার নার্সারি করে চারা কলম নিজেরা বিক্রয় করছে।

এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বর্তমানে  আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি এ এলাকার যারা প্রান্তিক জনগণ আছে তাদের কিভাবে আমরা অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি করা যায়।


নিখিল কুমার চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর চিন্তা প্রসূত একটি প্রতিষ্ঠান। তারই ফল শ্রুতিতে উন্নয়ন বোর্ডের সৃষ্টি।

তিনি আরো বলেন, পাহাড়ের কৃষকরা মসলা চাষে অত্যন্ত আগ্রহী। আমি কয়েকটি বাগান পরিদর্শনে গিয়ে তা উপলব্ধি করেছি। এই প্রকল্পের সফলতা দেখে দীর্ঘ মেয়াদী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।


একাত্তর/আরএ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন