ঢাকা ২২ জানুয়ারী ২০২২, ৮ মাঘ ১৪২৮

ভয়ংকর সেই রাতে কী ঘটেছিলো শেরে বাংলা হলে!

একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৩:০৮:১৬ আপডেট: ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ১৩:১৯:১১
ভয়ংকর সেই রাতে কী ঘটেছিলো শেরে বাংলা হলে!

২০১৯ সালে শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ। একই হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন তিনি। মৃত্যুর ১০ দিন আগে ছুটিতে বাড়িতে যান তিনি। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িতে থাকার পরিকল্পনা থাকলেও পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করতে হলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও সাবেক বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সমাজসেবা বিষয়ক উপসম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল আদালতে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, ২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন একটি মেসেঞ্জার গ্রুপে আবরারকে মারার নির্দেশনা দেন। কিন্তু আবরার হলে না থাকায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা তার ফেরার অপেক্ষা করতে বলেন।

৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে তার দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপসহ ২০১১ নম্বর কক্ষে নিয়ে আসা হয়। রায়ে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক বুয়েট ছাত্রলীগের উপদপ্তর সম্পাদক মুজতবা রাফিদ এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর মোবাইল ফোন দুইটি চেক করেন।

একই বিভাগের যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মুনতাসির আল জেমি ল্যাপটপটি চেক করেন। এসময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেহেদী হাসান রবিন আবরারকে চড় মারতে থাকেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সামসুল আরেফিন রাফাত স্ট্যাম্প এনে দিলে তা দিয়ে ইফতি মোশাররফ সকাল আবরারকে চার-পাঁচটি আঘাত করলে স্ট্যাম্পটি ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অনিক সরকার, আবরারের হাঁটু, পা, পায়ের তালু ও বাহুতে স্ট্যাম্প দিয়ে মারতে থাকেন। এরপর ক্রীড়া সম্পাদক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেফতাহুল ইসলাম জিওন আবরারকে চড় মারেন এবং স্ট্যাম্প দিয়ে হাঁটুতে আঘাত করেন। এসময় মেহেদী হাসান বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদি হাসান রাসেলের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন।

আরও পড়ুন: আবরার হত্যাকাণ্ডের রায়: ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ৫ জনের যাবজ্জীবন

রাত সাড়ে ১০টার দিকে মারধরের ফলে অসুস্থ আবরার মেঝেতে শুয়ে ছিলেন। ইফতি মোশাররফ সকাল ধমক দিয়ে তাকে দাঁড় করিয়ে চড় দেন। পরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মুজাহিদুর রহমান স্কিপিং রোপ দিয়ে আবরারকে মারতে থাকেন। এরপর ইফতি মোশাররফ সকাল স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারের হাঁটু ও পায়ে মারেন। খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর চড়-থাপ্পড় মারেন আবরারকে। রাত ১১টার দিকে অনিক সরকার গায়ের সব শক্তি প্রয়োগ করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারকে আঘাত করেন। এরপর ১২ টার দিকে সবাই কক্ষটি থেকে বের হয়ে যান।

আবরারের শ্বাসকষ্ট হওয়ায় ইফতি মোশাররফ সকাল তার মাথার নিচে দুইটি বালিশ দেন। বেশ কয়েকবার বমি করে আবরার। আবরারকে এরপর ২০০৫ নাম্বার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। উপ-আইন বিষয়ক সম্পাদক অমিত সাহা সবকিছু জানার চেষ্টা করেন, তাকে মেরে আরও তথ্য বেড় করার কথা বলেন। তিনি আবরারের অবস্থা খারাপ জেনে তাকে হল থেকে বের করতে বলেন। মেহেদী হাসান ও অনিক সরকার ২০০৫ নম্বর কক্ষে ঢুকে দেখে তার অবস্থা ঠিক আছে বলে চলে যান। এরপর আবরার আবার বমি করেন। মেহেদী হাসান তাকে পুলিশের হাতে হস্তান্তর করার কথা বলছিলেন। ১৭ ব্যাচের ছেলেরা তখন তাকে তোশকসহ নিচতলায় নামিয়ে রাখেন। সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল তখন পুলিশের সাথে কথা বলছিলেন। মুনতাসির আল জেমি আবরারের অবস্থা খারাপ জানালে ইফতি মোশাররফ সকাল মালিশ করতে বলেন। ইসমাইল ও মনির অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দিলে তা আসতে দেরি হওয়ায় তামিম বুয়েট মেডিকেলের চিকিৎসককে নিয়ে আসেন।

বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলের নিচতলায় ভোর তিনটার দিকে পুলিশ আবরারের লাশ উদ্ধার করে। মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. মাশুক এলাহী রাত তিনটার দিকে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। আবাসিক হলের দ্বিতীয় তলায় ইনস্টল করা একটি ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরা দ্বারা ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায় কয়েকজন লোক তার হাত ও পা ধরে করিডর থেকে নিচে টেনে নিচ্ছেন।


একাত্তর/টিএ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন