ঢাকা ০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯

৫০ বছর পর বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাচ্ছেন বেদনা দত্ত

নিজস্ব প্রতিনিধি, নরসিংদী
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২১:১৬:৪৪ আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ ২১:৩৪:৪৩
৫০ বছর পর বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পাচ্ছেন বেদনা দত্ত

১৯৭১ সালে দেশে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য নর-নারী। তাদের মধ্যে একজন নরসিংদীর বেদনা দত্ত। 

যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের রান্না করে খাইয়েছেন। সাহায্য করেছেন নানাভাবে। এর জেরেই পাকিস্তানীদের নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বেদনা দত্তকে। 

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া হচ্ছে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি। আর স্বীকৃতি পেয়ে খুশি বেদনা দত্তসহ প্রতিবেশীরাও। 

বঙ্গবন্ধুর ডাকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহীদ হয়েছেন দেশের ৩০ লাখ বীর বাঙ্গালী। সম্ভ্রম হারিয়েছেন প্রায় তিন লাখেরও বেশী নারী। 

তাদের মধ্যে একজন নরসিংদীর পলাশের জিনারদী বরিবাড়ি এলাকার বেদনা দত্ত। যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিবাহিনীদের রান্না করে খাওয়াতেন, তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করতেন। 

আরও পড়ুন: ঢাকায় ব্যস্ততম প্রথম দিন কাটালেন ভারতের রাষ্ট্রপতি

যুদ্ধের সময় পাকিস্তানীদের ক্যাম্প ছিলো জিনারদী বরিবাড়ি রেল ব্রিজের নীচে। ক্যাম্পে থাকা সিরাজ নামে এক রাজাকারের চোখ পড়ে বিধবা বেদনা দত্তের উপর। ঘরে ছোট্ট তিনটি শিশু সন্তান নিয়ে রাজাকারের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বেদনাকে তুলে দেয়া হয় পাকিস্তানীদের হাতে। 

নরপশুরা তাকে তিনদিন ক্যাম্পে রেখে পাশবিক নির্যাতন করে। পরে মৃত ভেবে জঙ্গলে ফেলে দেয়। অবশেষে চারদিন পর কৌশলে বাড়ি ফেরেন। 

গ্রাম্য চিকিৎসকের সহায়তায় কিছুটা সুস্থ হয়ে অবহেলা, বঞ্চনা আর লোকলজ্জায় সন্তানদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যান বেদনা। 

শরীরের বিভিন্ন অংশে, কপালে ও মুখে আজও ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন পর নিজ বাড়িতে ফিরে বীরাঙ্গনার মেয়ে হওয়ায় নিজের মেয়ে জোসনা দত্তকে বিয়ে দিতে পারেননি। যার ফলে মেয়েটিও আজ পাগলপ্রায়। 


বাড়িতে এসে অন্যের বাড়িতে কাজ করে ও লতা-পাতা খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন বেদনা। সম্প্রতি সরকারিভাবে প্রাপ্ত ভিজিডি চালই তার একমাত্র ভরসা। বেদনা দত্তের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশক্রমে সরকার বেদনা দত্তকে বীরাঙ্গনা হিসেবে গেজেটভূক্ত করেন। আর এবারের বিজয় দিবসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছেন। দীর্ঘ ৫০বছর পর হলেও তাকে স্বীকৃতি দেয়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বেদনা দত্ত ও প্রতিবেশীরা।

পলাশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ জাবেদ হোসেন বলেন, বেদনা দত্তের আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর তাকে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতিদানের মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হলো এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার।  
আরও পড়ুন: পঙ্গুত্বের কাছে হার না মানা সালমার জীবনযুদ্ধ

বেদনা দত্তকে এবারের বিজয় দিবসে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দিতে পেরে গর্ববোধ করছেন বলে জানান পলাশ থানার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা আফসানা চৌধুরী।

স্বাধীনতার ৫০ বছরের এই সুবর্ণজয়ন্তীতে বেদনা দত্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি লাভে গর্বিত এলাকাবাসী, গর্বিত স্থানীয় প্রশাসন। আর বেদনা দত্তের মতো আরও যারা রয়েছেন তালিকার বাইরে তাদের খুঁজে বের করে সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি দেবেন, এমনটাই আশা স্থানীয়দের।


একাত্তর/এসজে

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন