ঢাকা ২২ মে ২০২২, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের জমি দখলের অভিযোগ, পর্যটকদের দুর্ভোগ

সংবাদদাতা, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারী ২০২২ ২০:০৬:৩৭ আপডেট: ১১ জানুয়ারী ২০২২ ২০:৩৮:২০
প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারের জমি দখলের অভিযোগ, পর্যটকদের দুর্ভোগ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার কুয়াকাটার মিশ্রিপাড়া গ্রাম। এক সময়ের রাখাইন অধ্যুষিত এ গ্রামে ১৯১১ সালে নির্মাণ করা হয় মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধ বিহার। এ বিহারে রয়েছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ প্রায় ৩২ ফুট উচ্চতার গৌতম বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন মূর্তি। রেঙ্গুন থেকে আনা প্রাচীন কাঁশার ঘণ্টা। ইন্দোচীনের আদলে তৈরি অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে নির্মিত এ বিহার দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের শতশত পর্যটকরা আসেন। রয়েছে কয়েকশ বছরের পুরনো মিষ্টি পানি সংরক্ষণের কুয়া। 

সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশে পর্যটকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে বেড়ান চারদিকে। বিহারের ভেতরে এতো সৌন্দর্যের মধ্যেও পর্যটকরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন প্রবেশ পথে। বৌদ্ধ বিহারের জায়গা দখল করে আটটি দোকান নির্মাণ করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এ কারণে যেকোন অনুষ্ঠানে সেখানে আসার পথে রাখাইন নারী-পুরুষরা যেমন হয়রানীর শিকার হচ্ছেন, তেমনি চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন পর্যটকরা। 

বৌদ্ধ বিহারের জায়গা দখলমুক্ত করতে বিহার কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্টমন্ত্রী ও পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করায় উল্টো ওই জমি নিজেদের দাবি করে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছেন দখলদাররা। 

মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধ বিহার

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক বলেন, রাখাইনদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তারা তদন্ত কাজ সম্পন্ন করেছেন। দু’একদিনের মধ্যেই জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। তবে বৌদ্ধ বিহারের সৌন্দর্য রক্ষা এবং চলাচলের জন্য রাস্তাটি বড় করা প্রয়োজন বলে জানান।

১৭৮৪ সালে পটুয়াখালীর উপকূলে রাখাইন জনবসতি গড়ে উঠে। ওই সময়ে জেলায় ১১২ টি রাখাইন পাড়া ছিলো। ২০২১ সালে এ পাড়ার সংখ্যা কমতে কমতে এখন রাখাইন পাড়া রয়েছে ৩১ টি। মিশ্রি মগের নাম অনুসারে নামকরণ হয় মিশ্রিপাড়া গ্রাম। ওই সময়ে এ পাড়ায় দুই শতাধিক রাখাইন পরিবার ছিলো। এখন রয়েছে মাত্র ১৮ টি। 

১৯১১ সালে পাড়ার প্রধান এক একর ৮৬ শতাংশ জমির উপর নির্মান করেন মিশ্রিপাড়া সীমা বৌদ্ধ বিহার। ২০১৪ সালে জার্মান সরকারের সহায়তায় বিহারটি আধুনিকায়ন করা হয়। দেওয়া হয় চারিদিকে তারকাটার সীমানা প্রাচীর। কিন্তু সেই সীমানা প্রাচীরের মধ্যেই দোকান তুলে জায়গা দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ইউনুচ মাষ্টার, সেলিম মাওলানা, জাহাঙ্গীর মাতুব্বর, মোতালেব হাওলাদার, জাহাঙ্গীর গাজী, শাহ আলম ভূইয়া, সালাউদ্দিন মাতুব্বর ও নির্মল হাওলাদার।

জমির দাবিদার সেলিম মাওলানা 

রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন অভিযোগ করেন, এক সময় বিহারের সামনের ওই জায়গা ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করতো অভিযুক্তরা। কিন্তু বর্তমানে কর্তৃপক্ষের অগোচরে ওই জায়গা বিএস রেকর্ড করে তাদের দাবি করছে দখলদাররা। কর্তৃপক্ষ নিজেদের জমিতে একটি মার্কেট চালু করলেও ওই দখলদারদের কারণে দোকান খুলতে পারছেন না।

যদিও বৌদ্ধ বিহারের জায়গা দখলের অভিযোগ অস্বীকার করছেন দখলদাররা। তাদেরই একজন সেলিম মাওলানা। এ জমি তাদের দাবি করে আদালতে মামলাও করেছেন তিনি। 

সেলিম মাওলানার দাবি, তারা ক্রয় সূত্রে এ জমির মালিক। ২০ বছররেরও বেশি সময় ধরে তাদের দখলে এ জমি। তবে যার কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছেন সে কোথায় আছেন তা জানাতে পারেননি সেলিম। একই কথা বলছেন অন্য দখলদাররাও।

আরও পড়ুন: ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ২৪৫৮, সংক্রমণের হার প্রায় ৯

বিহারধক্ষ্য উত্তম ভিক্ষু বলেন, ২০১৩ সালে জার্মান সরকারের সহায়তায় বৌদ্ধ বিহারের সীমানা প্রাচীর দেওয়া হয়। তৎকালীন পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক সরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে এ তারকাটার সীমানা প্রাচীর দেওয়া হয়। তখন কেউ জমি দাবি করেনি। বরং ওই দখলদাররা বিহারের সামনে ব্যবসা করার অনুমতি চাইলে তারা সীমানা প্রাচীরের মধ্যে জায়গা ভাড়া দিয়ে তাদের ব্যবসা করার অনুমতি দেন। কিন্তু গত দুই বছর ধরে তারা ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে এখন ওই জমি তাদের দাবি করছে। তারা বৌদ্ধ বিহারের সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করলেও এখনও উচ্ছেদ হয়নি মন্দিরের সামনের অবৈধ স্থাপনাগুলো।

বিহারধক্ষ্য উত্তম ভিক্ষু

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, পটুয়াখালীসহ দক্ষিনাঞ্চলে রাখাইনদের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তারা সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যা শূণ্য হয়ে যাবে। তাদের কৃষিজমি, বসত ঘর, বিহার, পুকুর, শ্মশান ও মন্দিরের জায়গা দখল হয়ে যাচ্ছে। জাল দলিল করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। প্রান্তিকতার কারণে রাখাইনরা আদালতে গিয়ে মামলা মোকাবেলা করার সামর্থ না থাকায় সহজেই দখলদাররা এ সুযোগ নিচ্ছে। তাই তাদের দাবি, যাতে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে দেশে বাস করতে পারে এজন্য রাখাইনদের দখলকরা সম্পত্তি উদ্ধারে প্রশাসনের সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: ভাড়া বাড়ানোর দাবি বাস মালিকদের

আর মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, তারা বেশ কিছু বছর ধরে লক্ষ্য করছেন রাখাইনদের পরিবার ও লোকসংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। আগে রাখাইনদের যেভাবে দেখতাম, তার ক্ষুদ্র একটি অংশ এখন অবশিষ্ট আছে। প্রতিদিনই রাখাইনরা তাদের জমি, শ্মশান ও মন্দিরের জমি হারাচ্ছে। রাখাইনদের রক্ষা করার জন্য দৃশ্যমান যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া দরকার, তারমধ্যে এই সম্প্রদায়ের জমি রক্ষা করা প্রধান দায়িত্ব। মূলত দখলদাররা রাখাইনদের বিভক্ত করে কৌশলে এ দখল কাজটি করায় ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে রাখাইনদের বসতঘর, পাড়া, শ্মশান ও মন্দির। তাদের রক্ষার জন্য রাষ্ট্র বা সরকারের তরফ থেকে যে শক্ত বার্তা দেওয়া দরকার আমরা অনেক ক্ষেত্রে তার অনুপস্থিত দেখছি। 


একাত্তর/আরবিএস  

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন