ঢাকা ১৭ আগষ্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯

খানহাজানের বসতভিটায় মিলল সাড়ে ছয়শ বছর আগের তৈজসপত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট
প্রকাশ: ২০ জানুয়ারী ২০২২ ১২:১৮:১২ আপডেট: ২০ জানুয়ারী ২০২২ ১৫:০৪:১০
খানহাজানের বসতভিটায় মিলল সাড়ে ছয়শ বছর আগের তৈজসপত্র

বাগেরহাটে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ খানহাজান (রহঃ) এর বসতভিটায় খনন কাজ চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগের বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।

ঐতিহাসিক বাগেরহাট ষাটগম্বুজ মজসিদ থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে সদর উপজেলার সুন্দরঘোনা গ্রামে মাটির নিচে পাওয়া যাচ্ছে সুলতান এবং মোগল আমলের বিভিন্ন তৈজপত্র।

২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ১০ একর আয়তনের এই বসতভিটায় খনন কাজ চালাচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। খননে মাটির পরতে পরতে মিলছে মেঝে, দেয়াল, অলংকৃত ইট এবং মৃৎ শিল্পের বিভিন্ন ভগ্নাংশ। 

এর আগে কয়ক দফায় খনন করে মাটির নিচ থেকে পঞ্চদশ শতকে নির্মিত খানজাহান (রহঃ) এর বাসভবনের বিভিন্ন কক্ষের ভিত্তি, প্রাচীর, গোলাকার কর্ণার বুরুজ, প্রাচীন রাস্তা, মুসলিম ঐতিহ্যবাহী প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেইন্টিং ওয়্যার, ষ্টোন, ওয়্যার, পোরসোলাইন পাত্রের টুকরা এবং পানি নিস্কাশনের ড্রেনের সন্ধান পেয়েছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।


২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পুনরায় খনন কাজ শুরু করা হয়। চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত খনন কাজ চলবে বলে জানায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।

সুন্দরঘোনা গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, খানজাহান (রহঃ) এর বসতভিটায় ৬ মিটার বাই ৬ মিটার গ্রিক করে হেরিচমেট্রিক্স পদ্ধতিতে খনন কাজ চলছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাতজনের বিশেষজ্ঞ টিম খনন কাজ করছেন। তার সাথে স্থানীয় ১৪ জন নারী-পুরুষ খনন কাজে যুক্ত হয়েছেন।

কেউ মাটি তুলছে, কেউবা মাটি খুড়ছে। মাটি খনন করে প্রায় দুই থেকে তিন মিটার গভীরে গেলেই মিলছে বিভিন্ন স্থাপত্য। এর আগে খনন করা এলাকা মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা দেখতে আসছেন খনন কাজ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতার নেতৃত্বে এই খনন কাজ চলছে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ আশা করছে, খনন কাজ সম্পন্ন হলে খানজাহান (রহঃ) এর বাসভবন সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানা যাবে। মাটির নিচে প্রাপ্ত স্থাপত্য শৈল্য গবেষণার মধ্যে দিয়ে পঞ্চদশ শতকের তথ্য সমৃদ্ধ হবে এবং প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাসে নব অধ্যায়ের সূচনা হবে। 


প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সুত্র জানায়, ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো খানজাহান (রহঃ) এর নির্মিত ষাটগম্বুজ মসজিদসহ ১৭টি স্থাপনা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভূক্ত করে। এর মধ্যে খানজাহান (রহঃ) এর বসতভিটা অন্যতম। বাগেরহাট সদর উপজেলার সুন্দরঘোনা গ্রামে খানজাহানের বসতভিটা খননের জন্য ১৯৯৭ সালে ৯ একর ৬৭ শতক জমি অধিগ্রহন করা। ২০০১ সাল থেকে ধারাবাহিক ভাবে খনন কাজ চলছে।

খানজাহান (রহঃ) দক্ষিণবঙ্গের এক অবিস্মরণীয় নাম। ইসলাম প্রচারক এবং এই অঞ্চলে আবাদকারী হিসেবে তিনি সারা দেশের মানুষের মনে প্রতিষ্ঠিত। প্রবাদ আছে হযরত পীর খানজাহান (রহঃ) পারস্য দেশীয় একজন ধনবান মুসলমান ছিলেন।

৬০ হাজার সৈন্য ও ১১ জন আউলিয়া নিয়ে তিনি এই দেশে আগমন করেন। খলিফাতাবাদ তথা আজকের এই বাগেরহাটে তার আগমন ঘটে ১৪২৯ খ্রীষ্টব্দে। মাজারে পাথরে খোদাই করে তার মৃত্যুর তারিখ লেখা রয়েছে ১৪৫৯ খ্রীষ্টাব্দ। তবে তা ঘিরে অস্পষ্টতার শেষ নেই। 

খানজাহান (রহঃ) এর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি বাগেরহাট ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যর এক অনন্য নিদর্শন। ষাটগম্বুজ মসজিদের দক্ষিণপাশে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে।


খানজাহান (রহঃ) ষাটগম্বুজ মসজিদ সংলগ্ন আরো কিছু কীর্তির মধ্যে রয়েছে, মাজার শরিফ, খাঞ্জেলি দিঘি, মোহাম্মদ তাহেরের মাজার, জিন্দাপীরের মাজার, একগম্বুজ মসজিদ, বিবি বেগনীর মসজিদ, পচা দিঘি, চুনখোলা মসজিদ ও  সিংরা মসজিদ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা ও বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা জানান, খানজাহান (রহঃ) এর বসভিটায় খনন কাজের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, মধ্যযুগের অন্যতম ঐতিহাসিক শহর খলিফাতাবাদের (বর্তমান বাগেরহাট) সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এবং প্রাচীন মানুষের বসত সম্পর্কে জানা এবং তুলে ধরা।

খনন করে এরইমধ্যে খানহাজান (রহঃ) এর সমসাময়িক সময়ে প্রায় সাড়ে ৬০০ বছর আগের বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ, মেঝে, ইটের দেওয়াল এবং গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মৃৎপাত্র, প্রদীপদানি, সংরক্ষণ আধার, অংলকৃত ইটসহ বিভিন্ন স্থাপত্য পাওয়া গেছে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে এসব স্থাপত্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মন্তরে জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।

সুন্দরঘোনা গ্রামে এখানে খানজাহান (রহঃ) এর বসতবাড়ি কি না এমন প্রশ্ন করা হলে আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা জানান, খানজাহান (রহঃ) এর এটা বসতবাড়ি তা নিশ্চিত করে বলার মতো ঐতিহাসিক কোন তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে এটা খানজাহান (রহঃ) এর বসতবাড়ি। সঠিক ইতিহাস জানতে হলে আরো অনেক দিন ধরে খনন কাজ করত হবে বলে তিনি জানান।

বাগেরহাট যাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মোহাম্মদ জায়েদ জানান, খানজাহান (রহঃ) বসতভিটায় খনন করে যে সব স্থাপত্য পাওয়া যাচ্ছে তা রেজিস্ট্রেশন করে প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এসব যাদুঘর অথবা সংরক্ষণাগারে সংরক্ষণ করা হবে। আর খনন করা ওই ঢিবিগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হবে। একই সাথে গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত ইতিহাস জানা যাবে। 

বাগেরহাট ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদের ইমাম হেলাল উদ্দিন জানান, এপর্যন্ত খনন করে মাটির নিচে যে সব স্থাপত্য পাওয়া গেছে তাতে মনে হয় এটি খানজাহান (রহঃ) এর বসতবাড়ি। খনন শেষ হলে মানুষ খানজাহান (রহঃ) এর বসতবাড়ি সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে। 

খনন কাজ দেখতে আসা খানজাহান (রহঃ) মাজার এলাকার কলেজছাত্র জুম্মান শেখ জানায়, সে জেলার সব পুরাকৃর্তি নিয়ে কাজ করে একটি তালিকা প্রস্তত করেছে। এই খননের মাধ্যমে বাগেরহাটের ইতিহাস এবং ঐহিত্য জানা যাবে বলেই তিনি আশাবাদী।

খনন কাজে স্থানীয় শ্রমিক হিসেব যুক্ত আব্দুর রহিম শেখ জানান, খননের শুরু থেকে তিনি শ্রমিক হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব টিমের সাথে কাজ করছে। মাটি খুঁড়ে বিভিন্ন স্থাপত্য পাওয়া যাচ্ছে। খনন কাজে যুক্ত হতে পেরে তার কাছে ভাল লাগছে।


একাত্তর/টিএ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

বাতাস যখন ভয়ঙ্কর-২

বাতাস যখন ভয়ঙ্কর-২

১ মাস ১৫ দিন আগে