ঢাকা ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮

আলতাফ মাহমুদ । অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২১ ১৬:০০:৪৪
আলতাফ মাহমুদ । অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আলতাফ মাহমুদ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

আলতাফ মাহমুদ কে আমি প্রথম দেখি পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের কেন্দ্রীও অফিসে আমাদের ঠাটারিবাজারের বাড়ির অদূরে যোগীনগর লেনের একটি দোতলা বাড়ির ওপর তলায় মোহাম্মাদ তোয়াহা থাকতেন সপরিবারে নীচের তলায় যুবলীগ অফিস তখন ১৭/১৮ বছর বয়স হবে তার সুঠাম দেহ, চোখ দুতি আয়ত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অল্পকাল আগে আমি যুবলীগ এ যোগ দেই যতদূর মনে পড়ে, সে সময়েই তার সাথে দেখা আলতাফ মাহমুদ অত্যন্ত সুন্দর পোস্টার লিখতে পারতেন তিনি যখন পোস্টার লিখতেন, তখন দাড়িয়ে দেখতে ইচ্ছা হত পরে আবিষ্কার করি, তার ছবি আঁকার হাত ছিল কোলকাতা আর্টস্কুল এ কিছুদিন নাকি পড়াশোনা করেছিলেন আলতাফ মাহমুদ মনের আনন্দে গান গাইতেন, সে ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বোধহয় স্বশিক্ষিত ভাষা আন্দোলনখ্যাত গাজীউল হক এর ছোট ভাই নিজামুল হক নৃত্যগীতে পারদর্শী ছিলেন অগ্রজের মত তিনিও যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন আলতাফ মাহমুদ আর তিনি কিছুকালের জন্য হয়ে উঠেছিলেন যুবলীগের নিজস্ব সঙ্গীত শিল্পী

আলতাফ মাহমুদ তখন ছিলেন গন সঙ্গীত শিল্পী ভাষা আন্দোলনের পরপর বরিশালের আর এক কৃতি সন্তান ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ উদ্দিন আহমদ উচ্চ সরকারী পদে কর্মরত থেকেই গান লিখেছিলেন – মৃত্যু কে যারা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচানোর তরে / আজিকে স্মরিও তারে আলতাফ মাহমুদ এতে সুরারোপ করেছিলেন গানটি ১৯৫৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীর প্রথম প্রভাত ফেরীতে গাওয়া হয়েছিল সে সময় ভাষা আন্দোলনের গান ছিল আরও দুটি গাজীউল হক এর – ভুলব না এ একুশে ফেব্রুয়ারী এবং আব্দুল গাফফার চৌধুরীর – আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী গাফফার এর গানটিতে নতুন সুর দেন আলতাফ মাহমুদ, তার সুরেই গানটি কালজয়ী হয়

অল্প বয়শেই আলতাফ মাহমুদ এর রাজনৈতিক চেতনা এবং শিল্পবোধের বিকাশ ঘটে ঢাকায় আসার আগেই বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি নিজেকে উজাড় করে দেন তার গান বিশেষ উদ্দীপনার সৃষ্টি করে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন

যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান গভর্নর এর শাসন প্রবর্তিত হলে আলতাফ আত্মগোপন করেন তখনই তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় তিনি করাচী চলে যান, সেখানে কিছুকাল থেকে সঙ্গীতশিল্পী হিশেবে সুনাম অর্জন করে আবার ঢাকায় ফিরে আসেন তখন তাকে দেখি বুলবুল ললিতকলা একাডেমীতে একটি অর্গান বাজিয়ে একাগ্রচিত্তে সুর রচনা করছেন তার সুর যেমন ছিল শোনার মত, তেমনি তার নিবিষ্টতা ছিল দেখার মত সে সময় চলচ্চিত্রের জগতেই তিনি ক্রমশ বেশী জড়িয়ে যান এবং সঙ্গীত পরিচালক হিশেবে যশস্বী হয়ে ওঠেন তবু প্রথম জীবনের দৃপ্ত রাজনৈতিক চেতনা তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি সময় এবং সুযোগমত তিনি গনসঙ্গীতে সুর দিয়েছেন, পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলনে সে সব গান বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে যেমন ১৯৬৯ সালের গনঅভ্যুত্থান কালে তিনি সুরেরডালি নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন

এই পটভূমিতে এটা অনিবার্য ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধে আলতাফ মাহমুদ সম্পৃক্ত হয়ে যাবেন এবারে তার ক্ষেত্র কেবল সঙ্গীতে সীমাবদ্ধ ছিলনা তিনি সক্রিয় যুদ্ধে জড়িত হয়ে যান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই অবস্থায় অগাস্ট মাসে ধরা পরেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচারে শহীদ হন আমি তখন কোলকাতায়, সে সময় মুক্তিযুদ্ধের কাজে যারা নিয়মিত আন্তর্জাতিক সীমানা যাতায়াত করতেন, তাদের মধ্যে আমার দুই অনুজপ্রতিম আবুল বারক আলভী ও আহবার আহমেদ ছিল বেশ কিছুকাল ব্যাবধানে একবার আলভীর সঙ্গে দেখা হল এতদিন পরে কেন জিজ্ঞেস করায় আলভী বলে, ঢাকায় সে সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পরেছিল কিন্তু সে যে আলভী এ কথা স্বীকার না করায় বেঁচে যায় তবে তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছিল এবং আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তার হাতের আঙ্গুলগুলো তার সাক্ষ্য বহন করছিল আমি সহানুভূতি সূচক কিছু বলায় সে আমাকে থামিয়ে দেয় বলে, এরচেয়ে খারাপ খবর আছে অস্ত্রসহ আলতাফ মাহমুদ ধরা পরেছেন এবং বন্দীশিবিরে আলভীর পাশের ঘরেই তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার করা হয় দরজা খুলে যাওয়ায় আলভী একঝলক দেখতে পায়, সিলিং ফ্যানের সঙ্গে হাত পা বেঁধে মাথা উল্টো করে আলতাফ মাহমুদ কে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এক সময় সে ভেবে নেয় যে আলতাফ মাহমুদ আর বেঁচে নেই

খবর পেয়ে আমি স্তব্ধ হয়ে থাকি আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের দিনগুলো মনে পরে যায় এই অসাধারণ প্রতিভা দেশের জন্য এভাবে নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিলেন, বয়শ তার ৪০ ও তখন হয়নি দেশকে আলতাফ মাহমুদ যা দিয়েছেন, তা অতুলনীয় আর সবকিছু ভুলে গেলেও “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” ভোলা অসম্ভব এই একটি গানই তাঁকে অমর করেছে দেশের জন্য প্রান দিয়ে তিনি আমাদের আরও ঋণী করে গেলেন এদেশের দুটি বড় ঘটনা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে আলতাফ মাহমুদ নিজেকে যুক্ত করলেন প্রতিভা দিয়ে এবং জীবন দিয়ে


আলতাফ মাহমুদ ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন