ঢাকা ২৯ মে ২০২২, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান মনস্কতা ও আজকের বাংলাদেশ

মাহবুব রেজা
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২২ ২০:২৮:৫৯ আপডেট: ০১ মে ২০২২ ১২:৫৪:৪০
রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান মনস্কতা ও আজকের বাংলাদেশ

১.

রবীন্দ্রনাথের জীবনযাপনের বিভিন্ন পর্বে ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ আর এদেশের প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বহুরৈখিক লেখালেখির জগত, সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনাসহ নানা কিছুর সঙ্গে বাংলাদেশ নানাভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে- একথা অস্বীকার কোন উপায় নেই। শাহজাদপুর, পতিসরসহ বাংলাদেশের মনোমুগ্ধকর বিচিত্র প্রকৃতি আর সৌন্দর্য তাঁর লেখায়, স্মৃতিতে, স্বপ্নে, ভাবনায়, রঙে, চিত্রকলায় আচ্ছন্ন হয়েছিল।

রবীন্দ্র জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৮৪০ সালে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর নাটোরের রানি ভবানীর জমিদারির অংশ ডিহি শাহজাহাদপুর ১৩ টাকা ১০ আনায় কিনে নিলে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দ্বিতল ভবনটির উত্তরাধিকার পান ঠাকুর পরিবার৷ শাহজাদপুরে জমিদারি কেনারও আগে তাঁর পিতা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর নওগাঁয় নাগর নদীর পাড়ে পতিসর, কালিগ্রামের জমিদারি কেনেন। জমিদারির হাতবদল হতে হতে এক পর্যায়ে এর দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে শাহজাদপুরের জমিদারি দেখতে হয়েছে পাঁচ বছর৷ 


প্রথম তিনি সেখানে আসেন ১৮৯০ সালের জানুয়ারি মাসে৷ শাহজাদপুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটা অন্যরকম নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। শাহজাদপুরের সৌন্দর্য, পরিবেশ তাঁকে শুধু মুগ্ধই করেনি তাঁর লেখালেখিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। 

এই শাহজাদপুরে তিনি গল্প, কবিতা, গান, নাটক- কিনা রচনা করেছেন। পোস্টমাস্টার, ক্ষুধিতপাষাণসহ আরও অনেক রচনা এখানে থেকে তিনি লিখেছেন। শাহজাদপুর থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে বহু চিঠি লিখেছেন। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরাকে লিখছেন, ‘এখানে যেমন আমার মনে লেখবার ভাব এবং লেখবার ইচ্ছা আসে আর কোথাও না।’

পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশ রবীন্দ্র রচনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। কবি নির্দ্বিধায় সেসবের ঋণ স্বীকারও করেছেন। বলা যায় বাংলাদেশের অপূর্ব রুপবিভা তাঁর লেখার পরিসরকে বিচিত্র ভাবালুতায় আচ্ছন্ন করেছে। ১৮৯১ সাল থেকে ১৯০১ এই দশ বছর একটানা রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতার হুকুম তলব করতে বাংলাদেশে জমিদারি দেখাশোনার কাজে থেকেছেন। এই দশ বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছে নদীতে। পানির মধ্যে থেকে থেকে তিনি এক অদ্ভুত সৌন্দর্যকে অবলোকন করেছিলেন। নদীকে তিনি বলেছেন জলের রানী। 

শিলাইদহ, শাজাদপুর,পতিসর- এই তিন জায়গায় তাঁকে থাকতে হয়েছে কখনো কুঠি বাড়িতে, কখনো বজরা বা বোট ‘পদ্মা’য়। তবে কুঠি বাড়ির চেয়ে ‘পদ্মা’ বোটেই তিনি থাকতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন বেশি। ‘চিত্রা’ নামেও তাঁর আরেকটি বোট ছিল। নদীর প্রতি কি পরিমাণ ভালবাসা থাকলে তিনি তাঁর বোটের নাম রাখতে পারেন পদ্মা আর চিত্রা, ভাবা যায়!

বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল আত্মিক সম্পর্ক। এদেশের মানুষ, মানুষের জীবন তাঁকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। এদেশের প্রকৃতিও তাঁকে দুর্বার টেনেছিল। শিলাইদহ থেকে শাজাদপুর এবং পতিসরে আসা যাওয়ার সময় তাঁকে অনেকটা সময় নদীর ওপর থাকতে হতো। এ সময় তিনি লিখেছেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কণিকা, ক্ষণিকা, কল্পনা, কথা, নৈবেদ্য, চিত্রাঙ্গদা, মালিনী, গান্ধারির আবেদন, বিদায় অভিশাপ, কর্ণ–কুন্তী সংবাদ এবং গল্পগুচ্ছের অনেক গল্প, ছিন্নপত্রের অনেক পত্রও। 

রবীন্দ্র গবেষকরা তাঁর ছিন্নপত্রের পত্রগুলোকে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও তার তীরবর্তী মানুষজনের উপাখ্যান বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর অনেক লেখায় বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী উঠে এসেছে যার মধ্যে রয়েছে পদ্মা,যমুনা, গড়াই, ইছামতি, বড়াল, নাগর, বলেশ্বরি, আত্রাই, হুড়ো সাগর প্রভৃতি। 

শিলাইদহ থেকে শাজাদপুর ও পতিসরের যাত্রাপথের বর্ণনা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়, ‘বোট ভাসিয়ে চলে যেতুম পদ্মা থেকে কোলের ইছামতিতে, ইছামতি থেকে বড়লে (বড়ালে), হুড়ো সাগরে, চলনবিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদিতে, যমুনা পেরিয়ে সাজাদপুরের খাল বেয়ে সাজাদপুরে।’   

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল সমস্ত কাজেকর্মে বাংলাদেশ সবসময়ই ক্রিয়াশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কবিগুরু তাঁর অনুভবে,সত্ত্বায় বাংলাদেশকে ধারণ করেছেন নিবিষ্টচিত্তে।

২.

রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাংলাদেশ ও বাঙালির একটা নিবিড় যোগ রয়েছে। বাঙালির চিন্তা- চেতনাকে রবীন্দ্রনাথ তীব্রভাবে দেশমুখিন করেছেন। আবার বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষ রবীন্দ্রসাহিত্যের ভুবনকে সম্প্রসারিত করেছে- এ কথাও সমানভাবে সত্য। রবীন্দ্রনাথ এদেশের লালনের বাউল ধর্মের উদার ও সর্বব্যাপ্ত ভাবনাকে তাঁর বিশ্ব মানব ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। রবীন্দ্র চেতনার গঠনে বাংলাদেশের ভূমিকা তাই ব্যাপক ও ব্যাপ্ত। 

আজ রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের একান্ত স্বজন, শুধু কবি নন। রবীন্দ্রচর্চার এই ব্যাপকতা, রবীন্দ্রনাথকে গ্রহণ করার এই আন্তরিকতা ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গেও তেমন লভ্য নয়। আমাদের মধ্যে এক প্রবল রবীন্দ্র অধিকারবোধ তৈরি হয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথকে আমরা অর্জন করেছি প্রবল রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতাকে পরাহত করে।’ 

রবীন্দ্র গবেষকরা তাদের গবেষণায় বলছেন, ‘আজ যে বাংলা ভাষা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত, যে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিয়েছে বাঙালি, সেই ভাষাকে বিশ্বসভায়, বিশ্বভাষায় অসীম শক্তির ভাষা হিসেবে নতুন প্রাণ দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের গতিপ্রবাহ বিবেচনায় রেখে এ কথা বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ না হলে বাংলা সাহিত্য ও ভাষা মধ্যযুগের দেউড়িতেই আবদ্ধ থাকত। বিদ্যাসাগর, মধুসূদন ও বঙ্কিমের তৈরি পথটিকে রাজপথে রূপান্তরিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

বাংলা কবিতার আবেগ ও ভাষার গীতলতাকে তিনি চূড়ান্ত মানোচ্চতায় পৌঁছে দেন। তিনি সত্য সুন্দরকে এত চমৎকারভাবে প্রকাশ করেছেন যে, তিনি নিজেই সত্য সুন্দরের কবি হয়ে উঠেছেন। বাঙালি হাজার বছর ধরেই সত্য সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত থেকেছে। তারই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে নতুন ও চিরন্তন শিল্পের পথে ধাবিত করেন। তাঁর লেখায় বাঙালির হাজার বছরের প্রেম, আবেগ ও সংগ্রামের শৈল্পিক উত্থান ঘটে। তাই বাঙালি সকল সংকটে হাত বাড়িয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান ও চিন্তার ভুবনে।

রবীন্দ্রনাথের কাছে হাত বাড়াবার আরেকটি কারণ আত্মশক্তির অন্বেষণ। বাঙালির আত্মশক্তি ও আত্মমুক্তির বাণী রবীন্দ্রনাথের লেখায় লভ্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের সেই আত্মশক্তিকে জাগ্রত করেছে। প্রবল দেশপ্রেমে ডুবেছিল বাঙালি। 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি' বাউল সহজিয়া সুরের এই গানে বিধৃত বাংলার চিরন্তন রূপ মুক্তি সংগ্রামীকে শত্রুর বন্দুকের সামনে বুক পেতে দেওয়ার সাহস জুগিয়েছে।’

রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। আমাদের সকল চাওয়া পাওয়া, ব্যথা বেদনা, আনন্দ প্রাপ্তি, সুখে দুঃখে, অর্জনে তিনি অবিচ্ছেদ্য ভাবে মিশে রয়েছেন- এ এক অলিখিত বন্ধন। বাংলাদেশের পক্ষে রবীন্দ্রনাথ সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। 

এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসাও ছিল প্রবল। বাঙালি সব সময় রবীন্দ্রনাথে দায়বদ্ব ছিল। বাঙালি তাঁর সকল আন্দোলন সংগ্রামে, সংকটে বিপন্নতায় রবীন্দ্রনাথ থেকে শক্তি গ্রহন করেছে। পরম মমতায় তাঁকে বেছে নিয়েছে। দেশভাগ থেকে শুরু করে আমাদের ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গণঅভুথ্যান, অসহযোগ শেষে মহান মুক্তিযুদ্ব- সব কিছুতেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের শক্তির উৎস হয়ে উঠেছেন নিজ গুণে।


৩.

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পকার হিসেবে, কবি হিসেবে, নাট্যকার হিসেবে, ঔপন্যাসিক হিসেবে, প্রাবন্ধিক হিসেবে, ভ্রমণকাহিনীকার হিসেবে বাঙালি হৃদয়ে ঠাই করে নিয়েছেন। এর বাইরেও তাঁর হরেক রকম পরিচয় ছিল। ভাবুক ছিলেন, প্রেমিক ছিলেন, সুরকার ছিলেন, গীতিকার ছিলেন, অভিনেতা ছিলেন, ছিলেন প্রকৃতি প্রেমিক- সেই সঙ্গে আরও অনেক রকমের পরিচয়ে পরিচিত ছিলেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, তিনি কি বিজ্ঞান মনস্ক ছিলেন? তাঁর মধ্যে যে তীব্র বিজ্ঞানচেতনা ও বিজ্ঞান মনস্ক এক মন ছিল তা আমরা ক’জন জানি?

একটু পেছনে ফিরে যাওয়া যাক।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) জন্মের কিছুকাল পর থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে কি বিজ্ঞান,কি শিক্ষায়, কি চিত্রকলায়, কি চলচিত্রে, কি সাহিত্যে অর্থাৎ জীবনের  নানা ক্ষেত্রে রুপান্তর ঘটতে লাগল। উনিশ শতকের প্রথম ভাগেই ঘটে যায় শিল্প বিপ্লব। স্টিম ইঞ্জিনের আবিস্কার এবং তা ব্যপকভাবে চালু হলে মানুষ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর এক স্থান থেকে আরেক স্থানে চলে যেতে সক্ষম হল। তাদের কাছে দূরত্ব আর দূরত্ব থাকলো না। যোগাযোগের নিবিড়তা মানুষকে একে অন্যের কাছে নিয়ে গেল। চিন্তার সমন্বয় হল। এর ফলে মানুষের বিকাশ সর্বোপরি সভ্যতার বিকাশ দ্রুত থেকে দ্রুততর হল। 

রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে ডারউইনের নানাবিধ আবিস্কার বিশেষ করে তাঁর অভিব্যক্তিবাদ জীববিদ্যার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর এক পরিবর্তন এনে দেয়। একই সময় রসায়ন বিদ্যায় নানারকম উদ্ভাবন, বিদ্যুত শক্তির ব্যবহার। জীবাণুতত্ব সহ নানা আবিস্কার মানুষের যাপিত জীবনে এনে দেয় এক বিশাল চমক। ঠাকুর পরিবারের কঠোর নিয়মকানুন ও অনুশীলনের মধ্যে পড়ে শিশু রবিন্দ্রনাথ নর্মাল স্কুলের নিবেদিত ছাত্র হয়ত তিনি হতে পারেন  নি কিন্তু ঠাকুর বাড়ির পাঠশালায় তাঁকে পড়াশোনা করতেই হতো । না করে উপায় আছে? ঠাকুর বাড়ির গৃহশিক্ষকদের ফাঁকি দেয়া চারটে খানি কথা নয়। 

এখানে তাঁকে পড়তে হতো গনিত, ভুগোল, জ্যামিতি,পদার্থবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যার কঠিন সব পড়া। সাহিত্যের পাঠ নিতে হতো মেঘনাদবধ কাব্য থেকে । রবীন্দ্রনাথের লেখায় আমরা জানতে পারি,কংকাল খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মানবদেহের খুঁটিনাটি শেখাতেন এক পণ্ডিত ।শুধু তাই-ই নয় মানবদেহের বৈজ্ঞানিক পাঠ নেয়ার জন্য মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের লাশকাটা ঘরেও যেতে হতো ঠাকুর বাড়ির অন্যান্য বালকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও।  

সে থেকে বিজ্ঞানের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল তাঁর।পরবর্তী সময়ে এক লেখায় রবীন্দ্রনাথ সে কথার উল্লেখও করেছেন বেশ মজা করে, ‘সপ্তাহে একদিন রবিবার  সীতানাথ দত্ত ( ঘোষ ) মহাশয় আসিয়া যন্ত্রতন্ত্রযোগে  প্রকৃতি বিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন।... যে রবিবার সকালে তিনি নয়া আসিতেন , সে রবিবার আমার কাছে রবিবার বলিয়াই মনে হইত না।’ ( জীবনস্মৃতি, পৃষ্ঠা - ৪১) 

পিতা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে বালক রবীন্দ্রনাথ যখন ডালহৌসি পাহাড়ে বেড়াতে যেতেন সেটা তখন তাঁর বিজ্ঞান চর্চার ক্লাস হয়ে উঠত। পিতা তাঁর বালককে পাহাড় দর্শন , পাহাড় বেড়ানোর পাশাপাশি তাঁর প্রতিটি সন্ধ্যাকে পরিণত করতেন জ্যোতিবিদ্যার ব্যবহারিক ক্লাস সেশনে।  জ্যোর্তিবিদ পিতা পুত্রকে পাহাড়ের চূড়া থেকে সন্ধ্যাবেলায় দূরবীক্ষণ যন্ত্রযোগে নক্ষত্রমন্ডলীর গ্রহ নক্ষত্রদের চিনিয়ে দিতেন। 

জ্যোর্তিবিদ্যার পাশাপাশি পিতার কাছ থেকে বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারগুলোর বিষয়েও পাঠ নিতেন কিশোর রবীন্দ্রনাথ। পিতার কাছ থেকে পাওয়া ধারনা নিয়েই তিনি ১৮৭৩ সালে বারো বছর বয়সে লিখেছিলেন প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা ‘ভারতবর্ষীয় জ্যোতিষশাস্ত্র’। 

এই  লেখাই পরিবারে তাঁকে বিজ্ঞানের লেখক হিসাবে প্রতীষ্ঠা দেয়। যে কারণে রবীন্দ্রনাথের অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী  দেবী ঠাকুর বাড়ি থেকে শিশূ কিশোরদের জন্য ‘বালক’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। রবীন্দ্রনাথকে সে পত্রিকায় পদার্থবিদ্যা, জ্যোর্তিবিদ্যা ও ভূবিদ্যা প্রভৃতি বিজ্ঞান বিষয়ে শিশূ কিশোর উপযোগী লেখা দেবার জন্য নিয়মিত লেখক হিসাবে মনোনিত হন। ‘বালক’ পত্রিকায় বালক কবি  প্রায় প্রতি সংখ্যায় লিখেছেন। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দ থেকে সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সাধনা’ নামে পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ সাধনায় প্রাণিবিদ্যা ও জ্যোর্তিবিদ্যা বিষয়ে বেশ অনেকগুলো লেখা দিয়েছিলেন।  তাঁকে নুতন ইংরেজি শিক্ষিতজন তখন বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলায় কিছু কিছু লিখতে শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের সে সব রচনা পড়েও প্রাণিত হয়েছিলেন। 

কিছুকালের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের জোর্তিবিজ্ঞানের আগ্রহ প্রাণবিজ্ঞানে সঞ্চারিত হয়েছিলো। বিশ শতকের গোড়ায় রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞান বিষয়ক এক  প্রবন্ধ লিখে বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুকে চমকে দিয়েছিলেন। তিনি বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সান্নিধ্য  পেয়েছিলেন। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্রের গবেষণার বিষয় নিয়ে ১৯০১ সালে ‘বঙ্গদর্শন’এ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘জড় কি সজীব?’ এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন যা পড়ে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু বিস্মিত হয়ে তাঁকে বলেছিলেন ,‘ তুমি যদি কবি না হইতে তো শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক হতে পারিতে।’

৪.

রবীন্দ্রনাথ নিজেও এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন যে তাঁর মধ্যে বিজ্ঞানের প্রতি একধরণের ঝোঁক ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক লেখায় বলছেন, ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সে কথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বাল্যকাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিলো না ’।

তবে কি রবীন্দ্রনাথ জীবনের শুরু থেকেই বিজ্ঞানী হতে চেয়েছিলেন ? না, সেরকম কোন ব্যাপার তাঁর মধ্যে ছিল না তবে ছোটবেলা থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির ধারায় নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে না পারলে পিছিয়ে যেতে হবে। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে পিছিয়ে পড়ে থাকা যাবে না, এগিয়ে যেতে হবে। তাই বিজ্ঞান চর্চার বিষয়টিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিজ্ঞান চর্চার বিষয়টিকে আজীবন গুরুত্ব দিয়েছেন এর প্রায়োগিক দিকটি মাথায় রেখে। 

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন এবং মানতেন যে বর্তমান পৃথিবীর উন্নয়ন , অগ্রযাত্রা সবকিছুই বিজ্ঞানের হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের ক্রম অগ্রগতি তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষনে রাখতেন। তিনি যখন ১৯২৬ ইউরোপের পথে বেরুলেন তখন গেলেন জার্মানীতে। সেখানে গিয়ে তিনি জগতবিখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথে দেখা করলেন। আইনস্টাইন তখন তাঁর আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব প্রকাশ করে বিজ্ঞানের জগতে আলোড়ন তুলেছেন। 

সেখানে তিনি আইনস্টাইনের কাছে ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কথা জানতে পারলেন। ফিরে এসে তিনি অনুজ সত্যেন বোসকে খুজে বের করলেন এবং তার সাথে বিজ্ঞান চর্চায় যুক্ত হন। ৪ বছর পর ১৯৩০ এ আবার তিনি জার্মানিতে যান আইনস্টাইনের সাথে দেখা করেন। এ সময়ই বেতারযন্ত্র, আকাশ বিজয়, তেজস্ক্রিয়া, পরমাণুর গড়ন, ইলেকট্রন-প্রোটন, দু’ধরণের তড়িৎকণা, কোয়ান্টামবাদ, জ্যোতিষ্ক লোকের রহস্য, জীবাণুতত্ত্ব, বংশগতিবিদ্যা – এসব বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবণা রবীন্দ্রনাথের মনেও প্রবলভাবে দোলা দিয়েছিলো।

সাহিত্যের মানুষ হয়েও রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন কুসংস্কার, গোঁড়ামি আর অন্ধ বিশ্বাস থেকে মানুষকে সরিয়ে আনতে না পারলে মানুষকে তাঁর কাংখিত লক্ষে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তিনি মানুষের এই অজ্ঞতা বোধ থেকে তাদের মুক্তির লক্ষে বিজ্ঞানের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিলেন।তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানের চেতনার কোন বিকল্প নেই । 

বিজ্ঞান মানুষের চিন্তায়, চেতনায় একমাত্র বিজ্ঞানই পারে কাংখিত মুক্তি কিংবা বিপ্লব এনে দিতে। তিনি বিজ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন এবং তাঁর লেখালেখির পাশাপাশি তিনি চেয়েছিলেন তাঁর জীবনের বিজ্ঞান বিষয়ক সমস্ত ভাবনাকে পরিণত বয়সে এসে এক করে গ্রন্থিত করতে থাকেন। কবিগুরু তার বহিঃপ্রকাশ ঘটান ১৯৩৭ সালে। তিনি ‘বিশ্বপরিচয়’ নামে যে প্রবন্ধ সংকলনটি ১৯৩৭ সালে বের করেন তা ছিল মুলত তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ। 

তাঁর ‘বিশ্ব পরিচয়’ গ্রন্থের সূচিপত্রটি দেখলে পরিষ্কার হয়ে যায় যে তিনি কতোটা বিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এই বইয়ের সূচিতে আমরা দেখি তিনি কতোটা সুনিপুণভাবে পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, গ্রহলোক, ভূলোক- সহজ বাংলায় বিজ্ঞানের সব বিষয়কেই এক মলাটের মধ্যে আনার চেষ্টা করেছিলেন।

মূলত রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন বিজ্ঞানকে দূরে সরিয়ে রেখে একটি অগ্রসরমান জাতির পক্ষে উন্নতির শিখরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি যে এই বোধটিও বাঙালির মধ্যে জাগিয়ে দিতে পেরেছিলেন তা আজ দিবালোকের মতো পরিষ্কার।

লেখক সিনিয়র সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক


মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন