ঢাকা ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৬ আশ্বিন ১৪২৯

একজন পিকে হালদারের যত দুর্নীতি ও অর্থ লোপাট

কাবেরী মৈত্রেয়, একাত্তর
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২২ ১৭:৫৩:৪৭
একজন পিকে হালদারের যত দুর্নীতি ও অর্থ লোপাট

একটু আধটু পুকুর নয়, এ যেন সাগর চুরি। ফাকাঁ করেছেন ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং মিলিয়ে চার চারটি প্রতিষ্ঠান। লুট করা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এসব আর্থিক কেলেংকারির পেছনে নায়ক হলেন পিকে হালদার। মানুষের আমানত লুট করে তছরূপ করার নায়ক তিনি।

কাগুজে কোম্পানি খুলে সুকৌশলে অর্থ লুট করে ভারতে পালিয়ে যান তিনি। অস্তিত্বহীন কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে কীভাবে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ লোপাট করে সেগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া যায়, তা দেখিয়ে দিয়েছেন পি কে হালদার।

অবশেষে শনিবার ভারত থেকে বিশেষ অভিযানে আটক হয়েছেন পিকে হালদার। পি কে হালদার নামে পরিচিত হলেও পুরো নাম প্রশান্ত কুমার হালদার। নানা কৌশলে নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলে, প্রভাব খাটিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ধসিয়ে দেয়ার নায়ক তিনি।

ঋণের নামে টাকা লোপাট, নামে-বেনামে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিকে হালদারের বিরুদ্ধে।
পশ্চিমবঙ্গে পিকে হালদারের সম্পদের পাহাড়

(পশ্চিমবঙ্গে পিকে হালদারের বাড়ি)

পাশাপাশি তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে-পরে নিজের আত্মীয়, বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে পর্ষদে বসিয়ে অন্তত চারটি ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখল করেন তিনি। এই চার কোম্পানি হল- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)।

এ চারটি ছাড়াও একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। রয়েছে বিপুল অংকের অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ। অস্তিত্বহীন ৩০-৪০টি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণের নামে জালিয়াতি করে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ সরিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে দুই হাজার ৫০০ কোটি, এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি, রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে প্রায় দুই হাজার ৫০০ কোটি ও পিপলস লিজিং থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এসব ঋণের বিপরীতে জামানত নেই বলে দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পিকে হালদার গড়ে তোলেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশিরভাগই কাগুজে। এর মধ্যে রয়েছে পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ট্রাভেল, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল, হাল টেকনোলজি, সুখাদা লিমিটেড, আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, রেপটাইল ফার্মসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান।

এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন পিকে হালদারের আত্নীয়রা। মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রিতিশ কুমার হালদার ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারীসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে প্রতিষ্ঠান খোলা হয়ে। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমেদ ও সাবেক সহকর্মী উজ্জ্বল কুমার নন্দীও আছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়।
পিকে হালদারের পাচার করা বিপুল সম্পত্তির খোঁজ মিললো ভারতে - বিবিধ -  দৈনিকশিক্ষা

(ভারতে পিকে হালদারের রয়েছে এমন বেশ কয়েকটি বাড়ি)

২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় প্রথম পিকে হালদারের নাম সামনে আসে। এ সময় দুদক যে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে, তাদের মধ্যে পিকে হালদার একজন। ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি দুদক পিকের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পিকে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। অবৈধ সম্পদের অবস্থান গোপন করতে ১৭৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন পিকে হালদার। তিনি এসব অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা রাখেন।

পাশাপাশি এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে ও বেনামে আরও ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। দুদকের তথ্য বলছে, পিকে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আত্নসাৎ করেন তিনি। কোম্পানিটি নিয়ন্ত্রণে নিতে ২০১৫ সালে বিভিন্ন নামে শেয়ার কেনেন পিকে।

এর মধ্যে রয়েছে, হাল ইন্টারন্যাশনাল, বিআর ইন্টারন্যাশনাল, নেচার এন্টারপ্রাইজ, নিউ টেক এন্টারপ্রাইজ। হাল ইন্টারন্যাশনালের ৭০ শতাংশ শেয়ারের মালিক পিকে হালদার নিজে নেন। প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানের নামে বের করে নেয়া হয় ২ হাজার ২৯ কোটি টাকা।

বিআইএফসির-তে আমানত রাখা গ্রাহকরা এখনো আমানতে ফিরে পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। সুকুজা ভেঞ্চার ও কাঞ্চি ভেঞ্চার নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রন নেন পিকে হালদার। সুকুজা ভেঞ্চারের শেয়ার সুখাদা লিমিটেড ও সুকুমার মৃধার মেয়ে অনিন্দিতা মৃধার হাতে। এর মধ্যে অনিন্দিতা মৃধার শেয়ারই ৯০ শতাংশ।

কাঞ্চি ভেঞ্চারের ৯৫ শতাংশ শেয়ার হাল ইন্টারন্যাশনালের হাতে থাকে। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় পিপলস লিজিং থেকে। এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ছিল আনন কেমিক্যাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের। আবার আনন কেমিক্যালের ৯৪ শতাংশ শেয়ার প্রীতিশ কুমার হালদারে হাতে ও পাঁচ শতাংশ শেয়ার তার খালাতো ভাই অভিজিৎ অধিকারীর হাতে।

পিপলস লিজিংয়ের আমানত ফেরত দিতে না পারায় অবসায়ন ঘোষণা করা হয়। এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল ও রেপটাইল ফার্মের নামে প্রতিষ্ঠান খোলেন পি কে হালদার। মালিক মূলত পিকে হালদারই।

কে এই পিকে হালদার? পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে পিকের জন্ম । বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তার মা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পিকে হালদাররা দুই ভাই।

তিনি ও প্রীতিশ কুমার হালদার দুই ভাই–ই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। পি কে হালদার ২০০৮ সাল পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে উপব্যবস্থাপনা (ডিএমডি) পরিচালক ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি বনে যান অদৃশ্য ইশরায়।


একাত্তর/এসএ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছাদ খোলা অভিবাদন!

ছাদ খোলা অভিবাদন!

১০ দিন ৯ ঘন্টা আগে