ঢাকা ০৬ মে ২০২১, ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

প্রিয় শহরের হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ

একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৩৩:০৭ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৩৩:২৯

প্রয়াত কবি শঙ্খ ঘোষ। করোনা কেড়ে নিলো বাংলা সাহিত্যের আরো এক অগ্রজকে। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কলকাতার নিজের বাসায় ৮৯ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অবসান হলো বাংলা সাহিত্যের একটা অধ্যায়ের। 

কয়েক মাস ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় কাতর ছিলেন কবি। এরমধ্যেই গেলো ১৪ এপ্রিল তাঁর শরীরের করোনা ধরা পড়ে। বাসায় আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার রাত থেকেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। বুধবার সকালে কবিকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ইহলোক ত্যাগ করেন তিনি।

শঙ্খ ঘোষের পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী আড়ম্বরহীনভাবেই তাঁকে শেষ সম্মান জানায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নিমতলা মহাশ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া শেষে দাহ করা হয় কবিকে। তাঁর শেষবিদায়ের সময় তোপধ্বনি হয়নি, কারণ সেটা পছন্দ করতেন না তিনি।

অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া শুরুর আগে কবির ভাই নিত্যপ্রিয় ঘোষের সল্টলেকের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর সেখান থেকেই নিমতলার উদ্দেশে রওনা দেয় কবির দেহবাহী গাড়ি। তারও আগে উল্টোডাঙার বাড়ি থেকে কবির দেহ বের করা হয়।

শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে শোকের মেঘ নেমে আসে বাংলা সাহিত্যের আকাশে। কারো কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকসম। কারও কাছে অগ্রজের সমান। তবে সকলেই একমত, বাংলা সাহিত্যের এক মহীরুহের শিকড় উপড়ে গিয়েছে। 

বিদ্রোহ থেকে শুরু করে প্রেমের অনুভূতি, সবক্ষেত্রেই শব্দকে হাতিয়ার করে সমানভাবে বিচরণ করেছেন শঙ্খ। প্রতিবাদকে ভাষায় ফোটাতে কলমকে করেছেন সঙ্গী। পরে তাঁর ভাষাতেই কথা বলতো মানুষ।

আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে তাঁকে বরণ করে ভারত সরকার। ২০১০ সালে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০১৫ সালে শিবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে ডিলিট পান তিনি।

জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার চাঁদপুরে। প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। দেশভাগের পরে চলে যান কলকাতায়। ১৯৪৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দু' বছর পর সেখান থেকেই বিএ পাশ করেন। ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেন মাস্টার্স ডিগ্রি। 

কাব্যচর্চার পাশাপাশি বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। বঙ্গবাসী কলেজ, জঙ্গিপুর কলেজ, বহরমপুর গার্লস কলেজ, সিটি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করেন তিনি। এছাড়াও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, শিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

কবিতা ছাড়াও নিরন্তর রবীন্দ্র চর্চা চালিয়ে গেছেন শঙ্খ ঘোষ। স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্ত্বাই ছিল তাঁর পরিচিতি। অন্যায়ের সঙ্গে কখনওই আপোস করেননি।

১৯৫৩ সালে 'কৃত্তিবাস' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা 'দিনগুলি রাতগুলি'। ১৯৫৬ সালে ওই শিরোনামেই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ লেখার পাশাপাশি হয়ে ওঠেন সাহিত্য সমালোচকও।

আসলে গদ্য হোক বা পদ্য, শঙ্খ ঘোষের প্রতিটি রচনায় থাকত এক অনন্য রসবোধ, বৈদগ্ধতার পরিচয়। যা পাঠকের মনকে শান্ত করে। নতুন করে ভাবতে শেখায়। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার জন্ম দেয়।

‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ কবি উপহার দিয়েছেন পাঠককে।

রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ে বাংলা আধুনিক কবিতার পঞ্চপাণ্ডব ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু এবং শঙ্খ ঘোষ। প্রথম চারজনকে আমরা আগেই হারিয়েছি। আর এবার শঙ্খ ঘোষের বিদায়ে শেষ হল সাহিত্যের একটি যুগের। 

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন