ঢাকা ০৬ মে ২০২১, ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

টিকা না দিয়ে চুক্তির লঙ্ঘন করছে ভারতের সেরাম: পাপন

একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২১ ২২:৩৩:৫১ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২১ ২৩:৫৮:১৬
টিকা না দিয়ে চুক্তির লঙ্ঘন করছে ভারতের সেরাম: পাপন

অনিশ্চয়তায় পড়েছে করোনার দ্বিতীয় ডোজের টিকা। একাত্তর জার্নালকে এ বিষয়ে বিস্তর জানিয়েছেন বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান পাপন এমপি।

করোনার যাঁতাকলে পৃথিবী যখন উদ্বিগ্ন তখন নতুন ভোরের আলোর মতোই সামনে এলো করোনার টিকার আবিষ্কার হয়েছে। পাশের দেশ ভারতেই উৎপাদন হচ্ছে অ্যাস্ট্রাজেনেকের এই করোনা প্রতিরোধী টিকা। ভারত থেকে টিকা আনতে ত্রিমুখী চুক্তি হয় বাংলাদেশ সরকার, টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইন্সটিটিউট ও সেরামের লোকাল ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালের। কয়েক দফা ভারত থেকে টিকা এলেও দেশটিতে করোনায় নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হলে বাধসাধা হয় টিকা রপ্তানিতে। সৃষ্টি হয় এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির। উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা জানতে একাত্তরের সামনে আসেন সেরামের লোকাল ডিস্ট্রিবিউটর বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান পাপন এমপি।

একাত্তর জার্নালে সঞ্চালক নূর সাফা জুলহাজের এক প্রশ্নে পাপন বলেন, প্রথমত আমরা লক্ষ্য রাখছিলাম কোন ভ্যাকসিনটা বাংলাদেশে আনা যায়। আমরা ভেবেছিলাম মর্ডাণা, ফাইজার এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আসবে। সেখান থেকে আমরা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পছন্দ করি। কেননা এটার সংরক্ষণে যে তাপমাত্রার প্রয়োজন তা আমাদের অনুকূলে ছিল এবং এর দাম ছিল আমাদের জন্য আকর্ষণীয়। 

টিকা পেতে ডিসেম্বরে ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে আমাদের ত্রিমুখী তিন কোটি টিকার চুক্তি হয়েছিল, পরিশোধ করা হয়েছিল অগ্রিম টাকা এবং প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে আসার কথা ছিল। ফেব্রুয়ারি এবং মার্চে ৮০ লাখ টিকার আসার কথা থাকলেও টিকা আসেনি। অথচ এই টিকার জন্য আমরা অগ্রিম টাকা পরিশোধ করেছি।

টিকা বিপণনের ক্ষেত্রে বেক্সিমকোর ভূমিকা কি ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হাসান বলেন, বেক্সিমকোর দায়িত্ব ছিল টিকার আমদানি এবং বিতরণ করা। আমরা টিকাটি ইউকেএমআইআর এ অনুমোদনের পাঁচ মাস আগে চুক্তি করি। বেক্সিমকো সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে চুক্তিটি করে। কেননা টিকাটির রিসার্চ রিস্ক ছিল। টিকাটি বাতিলও হতে পারতো। যখন দেখা গেলো টিকার অনুমোদন প্রায় হতে চলেছে তখন বিতরণের দায়িত্ব সরকারকে দেওয়া হয়। কেননা এতো বড়ো বিপণন ব্যবস্থা আমাদের জন্যও কষ্টসাধ্য ছিল। চুক্তিতে বাংলাদেশ ড্রাগ রেগুলেটরি অথারেটিতে টিকা অনুমোদন পাওয়ায় এক মাসের পর থেকে প্রতি মাসে ৫০ লাখ করে তিনমাসে ছয় কোটি ডোজ দিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। 

হঠাৎ করেই কেন টিকা আমদানি বন্ধ হয়ে গেলো এমন প্রশ্নের জবাবে পাপন বলেন, ২৫ ডিসেম্বর সেরাম আমাদের প্রথম চালান পাঠায়। যদিও টিকা আসার কথা ছিল ফেব্রুয়ারিতে। এর মধ্যেই হঠাৎ করে আমরা জানতে পারি ভারত সরকার রপ্তানি ওপর একটি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এটা জানার পর ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা সেরামকে চিঠি দিয়ে ঘটনা জানতে চাই।

পরে সেরাম সিইও আমাদের আমাদের চিঠি দিয়ে জানায়, ভারত সরকার ভ্যাকসিনেশনে কিছু শর্ত দিয়েছে। সেখানে টিকা দিতে কোনো সমস্যা হবে না বলেও জানায় সেরাম। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি রপ্তানির জন্য একটি ছাড়পত্র লাগবে বলেও জানানো হয়।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশকে ৫০ লাখ টিকা দিতে আমরা ছাড়পত্র চেয়েছি। তবে কবে ছড়পত্রটি পাবো এবং কতো টিকা দিতে পারবো।

ফেব্রুয়ারি মাসে শুধু ২০ লাখ ডোজ টিকা কেন এলো এমন প্রশ্নের জবাবে পাপন বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৫০ লাখ টিকার জন্য ছাড়পত্র পেতে সেরাম ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অবেক্ষাধীন ছিল। সেরাম জানিয়েছে ভারত সরকার তখন ২০ লাখ টিকা রপ্তানির ছাড়পত্র দিয়েছিল।

এখনও কেন টিকা আসছে না জানতে চাইলেন বেক্সিমকো ফার্মার এই প্রধান কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে সেরামের কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম। সেরামের বক্তব্য, এখনও তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করছে।

টিকা দেওয়া প্রসঙ্গে সেরামের বক্তব্য জানতে চাইলে পাপন বলেন, সেরাম টিকা দেবেনা এমন বক্তব্য কখনও দেয়নি। এদিকে ভারত সরকার বলে আসছে তারা সবসময় আমাদের পাশে আছে। অথচ আমরা ইতিমধ্যে দ্বিতীয় ডোজের সঙ্কটে পড়ে গেছি।

টিকা না আসার এমন ঘটনাকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে পাপন বলেন, আমি এর আগে কখনও এমন ঘটনা দেখিনি।

একাত্তর জার্নালে যুক্ত থাকা জিটিভির প্রধান সম্পাদক ইশতিয়াক রেজার এক প্রশ্নে পাপন বলেন, ভারতের এখন যে পরিস্থিতি তাতে ভ্যাকসিন আসা কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে আমি বিষয়টা একটু অন্যভাবে দেখছি। সেরাম যদি বলতো, আমরা ভ্যাকসিন দেবো না বা দিতে পারবো না তাহলে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা নিতো। এখন সরকারের উচিত সরাসরি সেরামকে চিঠি দিয়ে জানানো তারা ভ্যাকসিন দেবে কি না।

একাত্তর জার্নালের সঞ্চালকের করা আরেক প্রশ্নের জবাবে পাপন বলেন, যে তিন কোটি ভ্যাকসিনের জন্য আমরা টাকা পরিশোধ করেছি সেই ভ্যাকসিনটি এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ার কথা নয়। একটি কোম্পানির সঙ্গে আরেকটি কোম্পানির ক্ষেত্রে এমনটি হয়ে পারে। কিন্তু একটি সরকারের  সঙ্গে একটি কোম্পানির এমনটি হওয়ার কোনো কথা নয়। এখানে অগ্রিম টাকা ভারতও দেয়নি। বাংলাদেশ দিয়েছে। আর এটা ভারতের নিজস্ব ভ্যাকসিন নয়। ভ্যাকসিনটি অ্যাস্ট্রাজেনেকার। সেরাম চুক্তিভিত্তিক ওই ভ্যাকসিন তৈরি করছে। আমাদের টাকায় ওই ভ্যাকসিনের উৎপাদন হয়েছে।

এক্ষেত্রে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগে কি ভূমিকা রাখতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে পাপন বলেন, আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারকে বিষয়টি জানিয়েছি এবং সেরামকে চিঠি পাঠাতে বলেছি।

যদি সেরাম আমাদের চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধ করা টাকার ভ্যাকসিন দিতে না পারে তবে বিকল্প ব্যবস্থা কি আছে এমন প্রশ্নের জবাবে পাপন বলেন, বিকল্প হিসেবে মর্ডাণা, ফাইজার ছাড়া সবগুলো কোম্পানি আমাদের জন্য উন্মুক্ত আছে।

যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন তাদের কি দ্বিতীয় ডোজও একই কোম্পানির টিকা নিতে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুল হাসান বলেন, দ্বিতীয় ডোজ অন্য ভ্যাকসিন নেওয়ার কোনো অপশনই নেই। এ জন্যই তাদের চিঠি দিয়ে জানাতে হবে ওরা আমাদের কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী টিকা দেবে কি না। যদি বলে না, তারপরও আমাদের দ্বিতীয় ডোজ যাদের বাকি আছে সেই টিকাগুলো অবশ্যই দিতে হবে। তারা হঠাৎ কোনোভাবেই এটা বন্ধ করতে পারে না।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার আরেক প্রশ্নে পাপন বলেন, সেরাম যদি চুক্তি অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করতে না পারে তাহলে ওয়ার্ল্ড ট্রেড ইউনিয়নের প্রিন্সিপাল অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। ইতিমধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার সাথে ইউরোপিয় ইউনিয়ন তাদের চুক্তি বাতিল এবং মামলা করেছে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নাজমুল হাসান বলেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকা মাসে ২০ কোটি ডোজ বানাতে পারে। সেরাম পারে সাত কোটি। জুন থেকে সেরাম উৎপাদন বাড়িয়ে ১০ কোটি করবে। এ জন্য তারা সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। এদিকে অ্যাস্ট্রাজেনেকা আরও ১৫টি দেশে উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে। জুলাই থেকে তাদের উৎপাদিত টিকা গুলো সরবরাহ করা হবে। এই উৎপাদন হবে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ কোটি। জুলাইয়ের পর থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার কোনো অভাব থাকবে না। 

এই দুর্যোগ মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব কেমন প্রশ্ন রেখে পাপন বলেন, আমরা কোনো অনুগ্রহ বা দান নয়, আমরা চাচ্ছি আমাদের প্রাপ্ত ভ্যাকসিন বুঝে নিতে। এরপরও যদি সেরাম আমাদের ভ্যাকসিন দিতে না চায়; সমস্যা নেই আমরা নেবো না। কিন্তু দ্বিতীয় ডোজের যে ভ্যাকসিন প্রয়োজন, তা আমাদের দিতেই হবে।

মে মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় ডোজের টিকা পাওয়া যাবে আশাবাদ রেখে নাজমুল হাসান বলেন, দুদেশের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে তাতে আমার বিশ্বাস, আমরা ভ্যাকসিন পাবো। আর সরকার যদি আরও এগ্রেসিভ ডিপ্লোমেসি করে তাহলে আমাদের ভ্যাকসিন না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। 


মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন