ঢাকা ০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯

সোনিয়া কাদিরের লেখায় ‘গৃহত্যাগী পিতার আমেরিকা জয়ের গল্প’

শামীম আল আমিন
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২২ ১৮:৩১:৫০ আপডেট: ০৭ জুন ২০২২ ১৯:২৯:৫৭
সোনিয়া কাদিরের লেখায় ‘গৃহত্যাগী পিতার আমেরিকা জয়ের গল্প’

বাংলাদেশ থেকে প্রথম আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছিলেন কে? এই প্রশ্নের সঠিক কোন উত্তর জানা যায় না। তবে কখন, কিভাবে মার্কিন মুল্লুকে বাঙালিদের বসতি গড়ে উঠেছিল; তাদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও সফলতার অনেক কথামালা অবশ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সেই ইতিহাসকে ধারণ করার উদ্দেশ্যেই কবি ও লেখিকা সোনিয়া কাদির একটি অনবদ্য বই লিখেছেন। বইটি মূলত তার অভিবাসী পিতার সংগ্রাম ও লড়াই করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প নিয়ে লেখা। তবে এর পরতে পরতে উঠে এসেছে আমেরিকায় কিভাবে থিতু হয়েছিলেন অভিবাসীরা। কিভাবে অভিবাসীদের মাধ্যমেই গড়ে উঠলো আজকের স্বপ্নের আমেরিকা; সেইসব ইতিহাস। নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ড দিয়ে একদিন অভিবাসীদের ঢল নেমেছিল আমেরিকায়; নানা উপায়ে সেই স্রোত আজও বহমান। 

সোনিয়া কাদিরের বইটির নাম ‘বাংলাদেশ টু আমেরিকা’। তার ঠিক নিচেই লেখা রয়েছে ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ জার্নি অব মাই ইমিগ্র্যান্ট ফাদার অ্যান্ড হিজ লিগেসি’। সোনিয়া কাদির মূলত তার বাবার জীবনীর একটা অধ্যায় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। সেই পথ ধরে তিনি তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন আমেরিকায় বাঙালিদের আগমণ, এখানে তাদের টিকে থাকা এবং দিনে দিনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মহাসংগ্রামের কাহিনী। তিনি লিখেছেন, “আমেরিকায় বাঙালিদের ইতিহাস ঘেঁটে ও আমার আব্বার বলা স্মৃতি থেকে জানতে পেরে সেই সংগ্রামী দিনের কিছু চিত্র আমি আঁকার চেষ্টা করছি”। 

তার বইটির ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় ভারতীয়দের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। ইমিগ্রেশনের কড়াকড়ির ফলে এখানে ভারতীয় অভিবাসীর সংখ্যা সেই হারে বাড়ছিল না। বইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০ সালের দিকে আমেরিকার সুপ্রীম কোর্ট ভারতীয়দের নাগরিকত্ব পাওয়ার বিরুদ্ধে রায় দেয়। তখন সোনিয়া কাদিরের বাবা নবাব আলী জাহাজে কাজ করার সুবাদে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতেন। সেই সময়টায় তিনি ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকা, আমেরিকা থেকে আফ্রিকাগামী জাহাজে চলাচল করতেন। তখন তার বাবা একবার যাত্রাপথে নিউইয়র্কে থেকে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তবে অভিবাসীদের জন্য সময়টা ভালো না হওয়ায়, সেবার তিনি চলে যান। পরবর্তীকালে নবাব আলী ১৯২৮ সালে আবারো গিয়ে আমেরিকায় থেকে যান। 

তবে তারও অনেক আগ থেকে খুব অল্প সংখ্যায় বাঙালিদের আমেরিকায় আগমণের কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সোনিয়া কাদির লিখেছেন, ১৯২০ সালের বৃটিশদের রোষানল থেকে বাঁচতে ছাত্রনেতা ইব্রাহীম চৌধুরী আমেরিকায় চলে এসেছিলেন। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের থিয়েটার পাড়ায় তার রেস্টুরেন্ট বেঙ্গল গার্ডেন হয়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলার মানুষের আশ্রয়স্থল। সোনিয়া কাদিরের মতে, বাঙালি অভিবাসীদের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় ১৯৬৮ সালে যখন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট এ সই করেছিলেন। তখন অনেকেরে মতো বাঙালিদেরও এদেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ সুগম হয়।  

১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল সিলেটের বিয়ানীবাজারের ছোটদেশ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সোনিয়া কাদিরের বাবা নবাব আলী। এরপর কিভাবে তিনি জাহাজের খালাসি হয়ে উঠছেন, হলেন গৃহত্যাগী সেইসব গল্প উঠে এসেছে বইটিতে। ১৯২৮ সালে আমেরিকায় গেলেও নবাব আলী সেখানে গ্রীন কার্ড পেয়েছিলেন দীর্ঘ সময় পর, ১৯৪২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। পেন্সিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়া থেকে সেই কার্ড ইস্যু হয়েছিল। সেই সময়টায় কাজের কারণে গোটা আমেরিকা ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। তবে দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। একসময় নিউইয়র্কে ফিরে আসেন নবাব আলী। সেখানে ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর পুয়ের্তেরিকান বংশোদ্ভূত জুয়ানিতা মোরালেসকে বিয়ে করেন। সেই সংসারে দুই ছেলে জোনাব আলী ও লুইস আলী। তবে মতের মিল না হওয়ায় ভেঙে যায় সেই বিয়ে। 

শুরুতে নবাব আলী নিউইয়র্কের ঐতিহাসিক হারলেমে। বইটিতে চলচ্চিত্রের মতো উঠে এসেছে হারলেমের ইতিহাস। আমেরিকায় অভিবাসীদের বসতির খুটিনাটি নানা তথ্য তুলে ধরেছেন সোনিয়া কাদির। যেমনিভাবে উঠে এসেছে ১৮০০ শতকের দিকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আসা মুসলিম অভিবাসী মোকসেদ আলীর কথাও। 

১৯৫৫ সালে নবাব আলী প্রথমবারের মতো দেশে ফেরেন। আমেরিকায় রেখে আসেন দুই পুত্র সন্তানকে। দেশে ফিরে খোদেজা খাতুন মায়াকে বিয়ে করে আবারো সংসারি হন। সেই ঘরেই জন্ম হয় কবি ও লেখিকা সোনিয়া কাদিরসহ তার ভাইবোনদের। তবে এরপরও নবাব আলী অনেকবারই আমেরিকায় গেছেন। সেইসব কথাও বইটিতে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন চলছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ, তখন নিউইয়র্কে ছিলে নবাব আলী। তখন সেখানে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার প্রচারণা ও অর্থ সংগ্রহের জন্য কাজ করেছিলেন। জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আয়োজিত ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর টিকেট বিক্রিসহ নানাভাবে তিনি জড়িয়ে ছিলেন, বইটিতে সে কথাই বলেছেন সোনিয়া কাদির। 

সোনিয়া কাদির মূলত কবিতা লিখে সুনাম কুঁড়িয়েছেন। তবে এবার বৃহৎ কলেবরের এই ইতিহাসনির্ভর সাহিত্য রচনা করলেন তিনি। বাংলার সঙ্গে বইটিতেই ইংরেজি অনুবাদও যুক্ত করা হয়েছে। আছে ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য, ছবি ও দলিলাদী। ২০২২ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশিত হয়েছে। বইটার প্রচ্ছদ করেছেন অরূপ বাউল। আর বইটি প্রকাশ করেছে মেঘদীপা প্রকাশন। বাংলাদেশের বাইরে লন্ডন ও নিউইয়র্কেও পাওয়া যায় বইটি।

সোনিয়া কাদির বইটিতে লিখেছেন, ‘পাখি উড়ে গেলে পালক ফেলে যায়। মানুষ মারা গেলেও স্মৃতি রেখে যায়। অতীত কখনও মুছে যায় না। বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাঝেই লুকিয়ে থাকে। সমাজ, সভ্যতা ও মানুষের রেখে যাওয়া, ঘটে যাওয়া নিদর্শন, যুগ যুগান্তর ধরে মানবসভ্যতার চলমান জীবনধারাই-মানবের জীবন সংগ্রামের চমকপ্রদ ইতিহাস’। আর বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে থাকা অভিবাসীদেরকে।

লেখক: সাংবাদিক, লেখক, তথ্যচিত্র নির্মাতা এবং একাত্তরের যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি।


একাত্তর/এআর

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

বাতাস যখন ভয়ঙ্কর-২

বাতাস যখন ভয়ঙ্কর-২

৫ দিন ১ ঘন্টা আগে