ঢাকা ০৬ মে ২০২১, ২৩ বৈশাখ ১৪২৮

একাত্তর জার্নালে যা জানালেন মুনিয়ার বোন

একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২১ ২২:৫৯:৫৪ আপডেট: ০৪ মে ২০২১ ১৪:৪৫:১৫
একাত্তর জার্নালে যা জানালেন মুনিয়ার বোন

৩০ এপ্রিল শুক্রবার ফারজানা রুপার সঞ্চালনায় একাত্তরের নিয়মিত আয়োজন একাত্তর জার্নালে উপস্থিত হন নুসরাত জাহান। গুলশানে অপমৃত্যুর শিকার কলেজ ছাত্রী মোশারাত জাহান মুনিয়ার বড় বোন তিনি। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবাহান আনভীরকে আসামি করে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া চাঞ্চল্যকর মামলাটির বাদিও তিনি।

কোনো মিডিয়ার সামনে এটাই তার প্রথম উপস্থিতি। বোন মুনিয়ার সাথে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিল তার, জানান নুসরাত। তিনি জানান, শেষ বার্তায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আনভীর তাকে ধোঁকা দিয়েছে বলে চিৎকার করছিল মুনিয়া। আনভীরের শত্রু শারুনের সাথে হাত মিলিয়েছে মুনিয়া- এমন অভিযোগ আনভীরের বলেও বোনকে জানিয়াছিলেন বোনের সান্ত্বনায় কর্ণপাত না করে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে তার অনেক বিপদ এবং যেকোন সময় একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলেও মুনিয়া তাকে জানিয়েছিলেন বলে জানান নুসরাত।

জার্নালে উপস্থিত অতিথি সিনিয়র সাংবাদিক জ ই মামুনের কি ধরনের বিপদ পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি আঁচ করছিলেন এমন এক প্রশ্নের জবাবে নুসরাত জানান, আনভীর মুনিয়াকে বিয়ে করবে না বলে জানিয়েছিল মুনিয়া। নানা ধরনের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছেও বলে তাকে জানিয়েছিল বোন- এমন জানান নুসরাত।  

আনভীরের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে আগে থেকেই জানতেন কি না তিনি এমন এক প্রশ্নের জবাবে নুসরাত জানান, তার বোন তাকে এ বিষয়ে বলার সাহস পায়নি। ২০২০ সালে আনভীরের স্ত্রী একটি ‘ফেইক আইডি’ থেকে এক বার্তায় মুনিয়া তার স্বামীর সঙ্গে প্রেম করছেন বলে  জানিয়েছিলেন বলে জানান নুসরাত।

২০২১ সালের মার্চে আনভীর তাকে বিয়ে করবে বলে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মুনিয়া প্রেমে এতই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে তিনি তাকে নিজের কাছে রাখতে পারেননি বলেও হতাশ কণ্ঠে জানান নুসরাত।

আত্মহত্যার কোন লক্ষণ বোনের মাঝে লক্ষ্য করেননি বলেন নুসরাত। ঘটনার দিন ২৬ এপ্রিল সোমবার মুনিয়ার সাথে অন্যান্য ভাইবোনদের নিয়ে ইফতার করার কথা ছিল। সকাল থেকেই দফায় দফায় ফোনে ও মেসেঞ্জারে বোনের সাথে যোগাযোগ হচ্ছিল বলে জানান নুসরাত। মুনিয়া তাকে কলা নিয়ে যেতে বলেছিলেন বলেও জানান নুসরাত।

মুনিয়া যেই ভাড়া গাড়িতে কুমিল্লা থেকে ঢাকা যাতায়াত করতেন, সেই গাড়িতেই ঢাকা আসবার কথা ছিল নুসরাতের। ১০ মিনিট-২০ মিনিট করে দুই ঘণ্টারও অধিক কালক্ষেপন করে এসির কাজ করাচ্ছেন এবং এতে এতো সময় লাগবে বলে বুঝতে পারেননি বলে জানানোর পর অন্য গাড়িতে ঢাকা আসেন নুসরাত। ঘটনার সাথে বিষয়টির কোন সম্পর্ক আছে কি না এ নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করেন তিনি।

দুপুর দেড়টায় রওনা দেয়ার পর মুনিয়ার বাড়িওয়ালা ফোন করেন নুসরাতকে। তিনি নুসরাতকে জানান, রোববার (২৫ এপ্রিল) রাতে ফোন করে মুনিয়া তার গাড়ি ধার চেয়েছিল। পালিয়ে গিয়ে যশোরে তার অপর বোনের কাছে আশ্রয় নেবার পরিকল্পনার কথা বাড়িওয়ালাকে জানিয়েছিলেন মুনিয়া।

সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় মুনিয়ার ফ্ল্যাটে পৌঁছে দরজায় তালা দেখতে পান নুসরাতরা। অনেকবার নক করে, ফোন করে, নিচ থেকে ইন্টারকমে ফোন করে মুনিয়ার কোনো সাড়া-শব্দ পাননি তারা। দরজার লকটি ভেতর-বাহির উভয় দিক থেকে চাবি দিয়ে বন্ধ করার মতো।  ফ্ল্যাট মালিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ভবনের ম্যানেজারকে তালার মিস্ত্রি ডেকে এনে দরজা খোলার ব্যবস্থা করতে বলেন।

রাত নয়টার দিকে দরজা খোলা হলে ভেতরে সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় ওড়না প্যাঁচানো নিথর মুনিয়াকে দেখতে পান নুসরাতরা। ঘটনার বিবরণ দেয়ার সময় কান্না বিজড়িত কণ্ঠে একাত্তর জার্নালকে নুসরাত বলেন, 'এরকম কিছু দেখবো বলেতো আমরা যাইনি!'  

ভবনের ম্যানেজার পুলিশকে ঘটনা জানান। এসময় নিচেই অপেক্ষা করছিলেন নুসরাতরা। পুলিশের উপস্থিতিতেই প্রথম ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন বলে জানান নুসরাত। দেখতে পান, ঝুলন্ত মুনিয়ার পা ছিল বিছানায়, হাতে-গলায় কালশিটে দাগ।

এসময় একাত্তর জার্নালে উপস্থিত আনভীরের আগাম জামিন আবেদনের আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল মামলা প্রসঙ্গে জানান, এরকম ঘটনায় সাধারণত অপমৃত্যুর মামলা হওয়ার কথা থাকলেও, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কিছু ধারা যুক্ত হবার কথা থাকলেও হয়েছে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা।

মামলা করার অভিজ্ঞতা নিয়ে সাংবাদিক শ্যামল দত্তের এক প্রশ্নের জবাবে নুসরাত জাহান পুলিশের সহযোগিতামূলক আচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন।

জার্নালে নুসরাত জাহান আকুতি জানান, ‘আমার বোন মারা গিয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।‘ এজন্য সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।

উপস্থিত সিনিয়র সাংবাদিক শ্যামল দত্ত ও জ ই মামুন মুনিয়ার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে মুনিয়া ইস্যুতে কিছু মিডিয়ার ভূমিকার নিন্দা করে সাংবাদিক হিসেবে দুঃখ প্রকাশ করেন।



১ মে শনিবার আবারও একাত্তর জার্নালে হাজির হন মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান। সুরহাতালের রিপোর্ট অনুযায়ী মনে হচ্ছে এটা হত্যাআত্মহত্যা নয় বলে দাবি করেন তিনি।

নুসরাত জাহান আরও বলেন, এখনও পর্যন্ত তদন্তের বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানতে পারিনি। যা সামনে আসছে তার বিষয়ে আমাকে তদন্তকারী পুলিশ সদস্যরা জিজ্ঞাসা করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ার নানা বিতর্ক ও কিছু মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদে ক্ষুব্ধ নুসরাত বলেন, আনভীর মুনিয়াকে মার্চে বিয়ে করবে বলে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর তিনি (আনভীর) কি করেছেন! এরপর মুনিয়ার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে! মুনিয়া যাই হোক না কেন, তাই বলে তাকে কেউ মেরে ফেলবে? তাকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে! এই হত্যার বিচার, সঠিক তদন্ত চাই আমরা।

পুলিশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে নুসরাত জাহান বলেন, আমি পুলিশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। তারা বিভিন্ন সময়ে যেসব বিষয় ভাইরাল হচ্ছে, আমাকে সেসব নিয়ে জিজ্ঞাসা করছেআমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না।

সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়ার পরেও আনভীরকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না প্রশ্ন রেখে মুনিয়ার বোন বলেন, এতকিছুর পরেও কেন আনভীরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছেনা? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সায়েম সোবহান আনভীর দেশেই আছেন। তাহলে কেন তাকে গ্রেপ্তারের জন্য প্রশাসন কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না? আমি সঠিক তদন্ত ‘ভিক্ষা’ চাই। সঠিক বিচার চাই।

উপস্থিত অতিথি অ্যাডভোকেট আইনুন নাহার সিদ্দিকা বলেন, বিচার সবারই পাওয়ার কথা। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত হোক। সঠিক বিচার হোক। পুলিশ যেহেতু মোসারত জাহান মুনিয়ার ‘আত্মহত্যার’ ঘটনাটি তদন্ত করছে, আমাদের কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। এরপর কোন কিছু আমাদের চোখে অনুচিত মনে হলে আমরা তা আদালতের নজরে আনব।

প্রসঙ্গত, ২৬ এপ্রিল সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানের একটি ভবন থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় কলেজছাত্রী মোসারত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ওইদিন রাতেই বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ অভিযোগে মামলা করে মুনিয়ার পরিবার।


একাত্তর/জো

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন