ঢাকা ২০ আগষ্ট ২০২২, ৪ ভাদ্র ১৪২৯

একাত্তরকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে সামিট চেয়ারম্যান

বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক, নিজস্ব শক্তিতেই এগুবে দেশ

জুলিয়া আলম, একাত্তর
প্রকাশ: ০৪ আগষ্ট ২০২২ ১১:২৭:৫১ আপডেট: ০৪ আগষ্ট ২০২২ ১৪:২৩:৩৬
বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট বৈশ্বিক, নিজস্ব শক্তিতেই এগুবে দেশ

কৃচ্ছতা সাধনে লোডশেডিং সরকারের ভালো সিদ্ধান্ত। বিদ্যৎকেন্দ্রগুলোকে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়াও অযৌক্তিক নয়। এটি বলছেন বেসরকারী খাতের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদক সামিট গ্রুপের কর্ণধার মুহাম্মদ আজিজ খান। একাত্তরের সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুদ্ধ বাধিয়ে জ্বালানী সংকট তৈরি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার কামাচ্ছে আমেরিকা, রাশিয়া ও পশ্চিমা বড় তেল-গ্যাস কোম্পানীগুলো। এর ভুক্তভোগী বাংলাদেশসহ বাকি বিশ্ব। তবে এমন সংকটেও অন্য সবার তুলনায় ভালো আছে বাংলাদেশ। তার মতে, বৈদেশিক ঋণ নিয়ে শংকার কিছু নেই। আর বৈদেশিক বিনিয়োগ নয়, দেশের জন্য নিজস্ব বিনিয়োগই বেশি টেকসই। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যত এবং সিংগাপুর থেকে সামিট এর ব্যবসা পরিচালনার সুফল নিয়েও অনেক কথা উঠে এসেছে জুলিয়া আলম এর সাথে তার আলাপচারিতায়।

জুলিয়া আলম: আবার এলো লোডশেডিং বা পরিস্থিতি এমন যে সরকার বাধ্য হয়েছে। এটি কি এড়ানো যেতো? বেসরকারি খাতে বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় উৎপাদক হিসেবে এই পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে দেখছেন? 

মুহাম্মদ আজিজ খান: লোডশেডিং একচ্যুয়ালি যতখানি ভাবা হয়েছিল তার থেকে কমই হচ্ছে। কৃচ্ছতা সাধন যদি বলি তাহলে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে এটাই রাইট ডিসিশন। বর্তমানে পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে সরকার বিদ্যুৎ কম নিচ্ছে। সরকার বিদ্যুৎ এর বিল পরিশোধ সময়মতো করছেন না। সেটাতো আমরা বলতেই থাকবো। কিন্ত এটাও সত্য যে ইন্ডিয়াতে প্রায় ৬ মাস পর বিল দিচ্ছে। পাকিস্তানেতো বিল দেয়া বন্ধই করে দিয়েছে। শ্রীলংকা তো আপনি জানেন যে সরকারই বদল হয়ে গেছে। আসলে পরিস্থিতির সাথে মিলিয়েই ডিসিশন নিতে হবে। একেক সময় একেক পরিস্থিতি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হচ্ছে। 

আমরা কোভিডের মতো মহামারি দেখলাম ১০০ বছর পর। আমরা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে সর্বপ্রথম ইউরোপে যুদ্ধ দেখছি। যে যুদ্ধ রাশিয়া করছে। আসলে আমেরিকা এবং ইউরোপও যুদ্ধ করছে রাশিয়ার সাথে। পুরো দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। ১৯৭৩ সনে ওপেক সৃষ্ট জ্বালানী সংকটের পরে এবার তেল-গ্যাস মানে এনার্জিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এনার্জি উইপন ব্যবহার করে এক দেশ আরেক দেশের সাথে জিততে চাচ্ছে। আগে  যুদ্ধ হতো তরবারী দিয়ে। এখন এর বদলে উইপেনাইজড হয়ে গেছে তেল-গ্যাস। একই সাথে উইপেনাইজড ডলার। দেখেন ইকনোমিক স্যাংশনও  উইপন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আমেরিকা ব্যক্তি পর্যায়ে স্যাংশন  দিচ্ছে,  কোম্পানী পর্যায়ে দিচ্ছে, দেশ পর্যায়ে দিচ্ছে আরো নানা উপায়ে দিচ্ছে। এটাতো আমরা পৃথিবীতে কখনোই দেখিনি আগে। এমন পরিস্থিতিতে কৃচ্ছতা সাধন করা ছাড়া আমরা কি করতে পারি? বাংলাদেশে ১৭ কোটি লোকও এই যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছি আমাদের ইচ্ছায় না, আমাদের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য না;  এমন না যে এক পক্ষকে সাহায্য করি আরেক পক্ষের বিপক্ষে আছি এসবও না। কভিডের মতোই যুদ্ধে জড়ায় গেছি। কভিডকালে যে রকম আমাদের কষ্ট হয়েছে এখন সেরকম কষ্ট হচ্ছে। এটা শুধু আমাদের না সারা পৃথিবীরই হচ্ছে। কাজেই এটা ফেস করার জন্য এই কৃচ্ছতা সাধন করতেই হবে। এটাই রাইট ডিসিশন। এই ডিসিশন না নিলে সরকারের হয়তো ভুল ডিসিশন হতো। 

আরও পড়ুন: দেশের বাজারে আবারও বাড়লো স্বর্ণের দাম

জুলিয়া আলম: ক্যাপাসিটি চার্জ সহ নানাভাবে বিদ্যুৎ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা নিয়ে বেশ সমালোচনা হয় নানা ফোরামে। এ নিয়ে আপনার অভিমত কি?

মুহাম্মদ আজিজ খান: এই কস্ট বা খরচকে ফিক্সড কস্ট  বলা হয়। ধরেন আপনি একটা বাসা ভাড়া নিয়েছেন সে বাসায় আপনি না থেকে বিদেশে এক মাসের জন্য বেড়াতে গেলেন- বাসাটা খালি। আপনি কি এসে বলতে পারবেন যে ভাড়া আমি দিবো না, আমিতো ছিলাম না। ক্যাপাসিটি পেমেন্ট অর্থনীতির ভাষায় ফিক্সড কস্ট । এটা ক্যাপাসিটির উপর দেয়া হয় বলে এটাকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বলা হয়। আসলে ফিক্সড কস্ট আপনাকে দিতেই হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র চলুক আর না চলুক। আমার দোষে না চলুক বা বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের ভুলে না চলুক। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দরকার নাই বলে না চালাক, আমিতো প্রস্তুত। আমিতো বাসাটা তৈরি করে রেখেছি। এই ফিক্সড চার্জতো দিতেই হবে। ইটস নোন এজ কস্ট অফ মানি কস্ট অফ ক্যাপিটাল। ধরেন আমরা বিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছি ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। তারপর আপনি লোডশেডিংই বলেন কিংবা দরকার নেই বলেন আমারতো ৫ হাজার কোটি টাকা লেগেছে। আমাকে ১০ পারসেন্ট ইন্টারেস্ট রেট হলে ৫০০ কোটি টাকা দিতে হচ্ছে ব্যাংককে। এই ৫০০ কোটিইতো ক্যাপাসিটি পেমেন্ট। সারা পৃথিবীতেইতো তাই। ইউনিকোর জার্মানির সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎউৎপাদক তাকে ১৫ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে জার্মান সরকার। সাবসিডির টাকা না দিতে পারলে তাদের শেয়ারে কনভার্ট করবে সরকার ।

জুলিয়া আলম: সরকার বলছে, এখনো প্রচুর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে আর জনগন বলছে বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদক হিসেবে আপনি কি বলবেন?

আজিজ খান: দেখেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ হলো আমি যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো করতে পেরেছি। আজকে বাংলাদেশে যে ১৭ কোটি লোক সবাই বিদ্যুৎ পেতে পারে। বৈশ্বিক কারণে হয়তো এখন পাচ্ছে না কিন্ত ক্ষমতাতো আছে। বাংলাদেশের ক্ষমতায়ন হয়েছে তার ১৭ কোটি লোককে বিদ্যুৎ দেবার। একটা ডেভেলপিং কান্ট্রি তে এটা যে কতো বড় পাওয়া, কতো বড় সক্ষমতা! দেশের ৫৫ হাজার বর্গমাইলে পৃথিবীর প্রায় সবচেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ দিচ্ছে সরকার। গ্লাস অর্ধেক খালি আপনি বলতেই পারেন একচ্যুয়ালি গ্লাসটা ফুল। 

আমি সিংগাপুরে থাকি সেদেশে দরকার ৪ হাজার মেগাওয়াট কিন্তু তাদের উৎপাদন ক্ষমতা ৮ হাজার মেগাওয়াট। তারা বেশি ক্ষমতা রেখেছে কোনো অসুবিধা হলে যেনো তাদের বিদ্যুতের অভাব না হয়, লোডশেডিং না হয়। প্রতি কিলো ঘন্টার দাম ওখানে বাংলাদেশি টাকায় ৩০ টাকা। আমি সেই ৩০ টাকা দিয়েও খুশি হচ্ছি বাহবা দিচ্ছি বলছি কখনো বিদ্যুৎ যায়না। লোডশেডিং হয়না। কিন্তু দিচ্ছিতো ৩০ টাকা! আমাদের এখানে ৭ টাকা। আমরা যারা বড় কনজ্যুমার তাদের দিতে হয় এই দাম প্রতি কিলো ঘন্টার জন্য। আমিতো মনে করি আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি।  

জুলিয়া আলম: বিশ্ববাজারে বেশি দামের কারণে গ্যাস আমদানি করতে পারছে না সরকার। আপনাদের সামিট মেঘনাঘাট-২  বিদ্যুৎকেন্দ্র সহ আরো এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। তাহলে এগুলোর জ্বালানীর ভবিষ্যৎ কি?

মুহাম্মদ আজিজ খান:  দেখুন, প্রথম কথা হলো যেটাই উপরে উঠে সেটাই নিচে পরে। দি ইজ থিউরি অফ গ্রাভিটি। গ্যাসের দাম ছিল ৩ থেকে ৪ ডলার পার এমএমবিটিউ। সেটা এখন উঠেছে ৪০ ডলারে। যেটা এতো তাড়াতাড়ি উলম্ফন করে সেটা ততো তাড়াতাড়িই পরে যায়। তাই এনিয়ে লং টার্মে আমি বেশি চিন্তিত নই। পৃথিবীতে অনেক বেশি গ্যাস আছে। আমরা সবাই বলছি ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার কমাতে হবে। নতুন নতুন টেকনোলজি আসছে, গ্রীন টেকনোলজি আসছে সো ফসিল ফুয়েলের ডিমান্ড কমছে। গ্যাসের লিকুইডিফিকেশন ক্যাপাসিটি আমেরিকাতে বাড়ানো হচ্ছে, কাতার, অষ্ট্রেলিয়া সব জায়গাতেই বাড়ানো হচ্ছে। 

অন্যদিকে চায়নাতে এ বছর প্রথম গত বছরের থেকে কম গ্যাস লাগছে। আমেরিকা রিসিশন চাচ্ছে। ইন্টারেস্ট রেট বাড়াচ্ছে। ইউরোপ ইন্টারেস্ট রেট বাড়াচ্ছে- তারা তাদের ইকোনোমিতে স্লো ডাউন চাচ্ছে। তাদের অর্থনীতির গতি কমলে তখন গ্যাস কোথায় যাবে আর তেল কোথায় যাবে? গ্যাস তেল সবকিছু ডিমান্ড সাপ্লাই নির্ভর দামও ডিমান্ড সাপ্লাই নির্ভর। বর্তমানে সাপ্লাই প্রবলেম হচ্ছে ডিমান্ড বাড়ে নাই সাপ্লাই কনস্ট্রেন্টে ডিমান্ড কমছে। তবে সাপ্লাই কনস্ট্রেন্টে সে খাতে ইনভেস্টমেন্ট যাচ্ছে তাই সাপ্লাই বাড়বে। তবে ডিমান্ড কমে যাচ্ছে তাই প্রাইস পয়েন্ট নিচে যাবেই। আগামীতে দাম কমে যাবে।

আপনি মেঘনাঘাট-২ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা বলছিলেন সেটি নিয়ে এবার একটু বলি। বাংলাদেশে আমরা আমেরিকার সর্বাধুনিক জিই মেশিনে ৫৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছি। আমরা টাকা নিয়েছি সুইস এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সির মাধ্যমে সাড়ে ৩ পার্সেন্ট সুদে ১৭ বছরের জন্য। ৫৫ কোটি ডলার বিনিয়োগে আমরা তৈরি করেছি পৃথিবীর সবচেয়ে ইফিসিয়েন্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। গ্যাসের মূল্য পৃথিবীতে যখন সবচেয়ে বেশি হবে তখন আপনি কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালাবেন? যেটা বেশি এফিসিয়েন্ট। বাংলাদেশ সরকার যদি ম্যারিট অর্ডার দেখে যে কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালালে সবচেয়ে কম খরচ হবে। সেটি সামিট মেঘনাঘাট-২ কোম্পানী লিমিটেড। 

জুলিয়া আলম:  যুদ্ধের কারণেই বিশ্বে জ্বালানীর সংকট। এই পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে দেখছেন? 

মুহাম্মদ আজিজ খান: এই যে যুদ্ধ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি লাভবান কে! লাভবান আমেরিকা ও  রাশিয়া। রাশিয়ার রুবলে পারে নাই তাই তাদের গ্যাস বিক্রি করছে জার্মানির কাছে ৩৮ ডলার পার এমএমবিটিউ। জার্মানরা  কিনছে তাদের আছে তাই  আমাদের কিনতে দিচ্ছে না। আমেরিকাও বিক্রি করছে ইউরোপের কাছে ২,০২৫ ডলার পার এমএমবিটিউ। আপনি শেল বা  এক্সন মোবিল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম এর স্টক প্রাইস দেখেন আর বার্ষিক প্রতিবেদন দেখেন তাদের জীবনে এতো টাকা কামায় নাই যতো টাকা এখন কামাচ্ছে। তারা যুদ্ধ চালায় রাখতে চাচ্ছে তারাতো যুদ্ধের  মাধ্যমে ইনকাম করছে। সার্ভিস বলেন আর যুদ্ধ বলেন সব দিয়েই তারা টাকা কামাতে চায়। অবশ্য এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ইউরোপের তারপর আমাদের মতোন দেশের। 

জুলিয়া আলম: এই যুদ্ধ ও জ্বালানীর সংকটে বিশ্বে নতুন মেরুকরণ হচ্ছে। এখন কি করবে বাংলাদেশ? নীতি ব্যবস্থাপনায় কোন পরিবর্তনের প্রয়ো্জন আছে কি?    

মুহাম্মদ আজিজ খান: পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল। তাই প্রথমে ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন দরকার। ইউক্রেন দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটে গেছে পৃথিবীতে। ব্যবস্থাপনা বদলাতে হবে না! সরকারের ব্যবস্থাপনা বদলানোর প্রথম ধাপই কৃচ্ছতা। যে সরকার বলেছে আমরা ১০ পার্সেন্ট  জিডিপি গ্রোথে যাবো সেইতো আবার এখন বলছে ২০ পারসেন্ট খরচ কমান। চেঞ্জ ইজ অনলি কনস্টেন্ট। শুনেন পৃথিবীতে কোন সংকট নাই, সংকটতো তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এ থেকে  শিখছে। পৃথিবী আমাদের শিক্ষা দেয়, সমাজ শিক্ষা দেয় আর সময় আমাদেরকে শিক্ষা দেয়। বর্তমান  যুগে বিশ্বের বড় বড় পাওয়ার-আমেরিকা, রাশিয়া, চায়না, ইউরোপ, ইন্ডিয়াও ঘুরে যাচ্ছে, এদের আন্তঃসম্পর্কে পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তনশীল এই সময়ে আমরা কিভাবে চলবো সেই  শিক্ষা হচ্ছে। এই শিক্ষায় ভালো হবে আগামীতে। আমরা শিখছি বিদ্যুতের  উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও বন্ধ করে রাখা দরকার। বাংলাদেশের জনগন শিখছে কিভাবে তাদের কনজামশন কন্ট্রোলে রাখতে হবে। ছোটকালে আমরা শিখেছি অপচয়কারী শয়তানের ভাই। এখন আমরা শয়তানের ভাই থেকে একটু বেটার হবো, অপচয় বন্ধ করবো। আমার মতে এ শিক্ষা দরকার ছিল। যেভাবে আমরা ২০০৭-৮ সন থেকে দৌড়াচ্ছিলাম যেভাবে ডেভেলপমেন্ট করছিলাম, না থামলে আমরা হাঁপিয়ে যেতাম, বসে যেতাম। চায়নাও কভিডের কথা বলে লকডাউন দিয়েছে, যেনো লোকজন কাজ কম করে,  কারন ওদেরও ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল করা দরকার। আমেরিকা কন্ট্রোল করছে ইন্টারেস্ট রেট বাড়িয়েছে ইউরোপতো গরীবই হয়ে যাচ্ছে।

জুলিয়া আলম: জ্বালানির বিশ্ববাজার অস্থির। আমাদের গ্যাসের মজুদও কমে গেছে এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এখন কেমন হওয়া প্রয়োজন? 

মুহাম্মদ আজিজ খান: দেখুন, ম্যানেজমেন্টে দুটি দিক সাপ্লাই ও ডিমান্ড। এখন আমরা ম্যানেজ করছি সাপ্লাই সাইড দিয়ে। সাপ্লাই কমিয়ে দেয়া হয়েছে জোর করে ডিমান্ড কমানোর জন্য। এরকম সব জায়গায় যারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে সারা পৃথিবীর ৭’শ  ৪০ কোটি লোকই এখন ভুক্তভো্গী । আমেরিকাতে তেলের মূল্য ৫-৬ ডলার গ্যালন। যারা পৃথিবীর সেকেন্ড হাইয়েস্ট তেল উৎপাদক, সেকেন্ড হাইয়েস্ট গ্যাস উৎপাদক। সৌদি আরব রাশিয়া থেকে তেল ইমপোর্ট করছে। 

জার্মান সরকার বলছে জনগণকে বলছে  এখন থেকেই গ্যাস ব্যবহার কম করেন, ফ্রান্সে বলছে। আমি দৃঢভাবে বিশ্বাস করি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যা একচ্যুয়ালি ওভার-কনজামশন। আমেরিকা এতো অপচয় করে যে ওয়ার্ল্ড ফুড অর্গানাইজেশন বলছে, পৃথিবীতে খাবার টেবিলেই ৪০ পার্সেন্ট খাবার নষ্ট হয়। আর আমাদের মতো দেশেও উৎপাদন থেকে টেবিল পর্যন্ত ল্যাক অফ প্রিজারভেশনে ৪০ পার্সেন্ট খাদ্য নষ্ট হয়। মানে ৪০ পার্সেন্ট ফুড আপনি ধংস করছেন যেটি দরকার ছিলো না। এই ৪০ পার্সেন্ট ফুডের জন্য কতো ফার্টিলাইজার ব্যবহার হচ্ছে, কতো পানি ব্যবহার করা হয়েছে? এই পৃথিবীতে যে কনজামশন উপরে ওঠানো হয়েছে ইন অর্ডার টু মেক প্রফিট। কনজামশন কমানো দরকার। পৃথিবীতে আমরা প্রচুর অপচয়  করি। মে বি দিজ ইজ ওয়ে অফ নেচার টেলিং আস্ টু বি স্লো। এই যে হিট ওয়েবে আগুন লাগছে ইউরোপে জায়গায় জায়গায় মানে নেচার টেলিং আস্ ডিক্রিজ ইউর কনজামশন। এই যে মানুষ যুদ্ধে চলে গেছে মে বি নেচার টেলিং আস্ অর আল্লাহ টেলিং আস্, ডিক্রিজ ইউর কনজামশন। বাংলাদেশেও ক্যান্টনমেন্টে যান বা দোকানে যান বাতির দরকার ১০০ কিলোওয়াট, জ্বালিয়ে রাখে ১ হাজার কিলোওয়াট। এগুলো কমানো দরকার।  ডিমান্ড সাইড ম্যানেজ করে ওয়েস্টেজ কমাতে হবে।

জুলিয়া আলম: আমাদের অভ্যন্তরিণ জ্বালানি উৎপাদন ও সংগ্রহ নিয়ে আমরা কি করতে পারি?

মুহাম্মদ আজিজ খান: আমাদের দেশেতো কয়লা আছে কিন্তু এখন নিতে যাই তাহলে দেখবেন বিশেষজ্ঞরা বলবে এটাতো ফসিল ফুয়েল কার্বন হবে। আবার আরেক পক্ষ বলবে যে, উত্তর থেকে পানি আসে আমাদের দেশে, মানে হিমালয় পর্বত থেকে পানি আসে। সেই পানিটা নদীর মাধ্যমেও আসে, আমাদের মাটির নিচেও পানি আছে। ওখানে যদি এতো গর্ত করে কয়লা সব ওপেন পিট মাইনিংয়ে বের করে নেন তাহলেতো পানিটা আসা বন্ধ হয়ে যাবে। সেখানে ফ্লাড হবে। এই এনভায়রেন্টমেন্টাল চেঞ্জের  মূল্য কতো? কয়লা দিয়ে কতটুকু স্বনির্ভর হবেন সেটিও ব্যালেন্স করতে হবে। এই ব্যালেন্স নিয়েই তখন সরকার মনে করেছে যে আকুয়াটিক রিজার্ভ অর আকুয়াটিক ফ্লো বন্ধ করা ঠিক হবে না। আমি নিজেও মনে করি সেটিই কারেক্ট। কারণ আপনি ওখানে ন্যাচারের বিরুদ্ধে ফাইট করবেন। হিমালয় থেকে পানি এসে বে অব বেঙ্গলে যেতে হবে ওটাতো আর বন্ধ করতে পারছেন না। 

অনেকে বলেন, ওপেন মাইন অষ্ট্রেলিযাতে হয়েছে আমাদের এখানে হতে পারেনা কেনো। আরে ভাই অষ্ট্রেলিয়ায়তো আর হিমালয় পর্বত নাই। অষ্ট্রেলিয়াতো পৃথিবীর সবচে বড় ব-দ্বীপ নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পানি আমাদের ভেতর দিয়ে যায় বে অব বেঙ্গলে, অষ্ট্রেলিয়া দিয়ে নয়। বলা হয় সমুদ্র জয় করেছি আমরা কেনো গ্যাস জয় করতে পারলাম না। ডিপ সি’তে বা গভীর সমুদ্রে যখন গ্যাস সন্ধান করবেন খরচ বেশি হবে। লোকজন তখনই বলেছিলো ৭-৮ ডলারের কমে তারা গ্যাস উত্তোলন করতে পারবে না যখন বাজার ছিলো ৩-৪ ডলারে। তখন যদি বাংলাদেশ সরকার ৭-৮ ডলারে সাইন করতো তাহলে এখন  যে বিশেষজ্ঞরা নানা কথা বলছে, তারাই বলতো ৩-৪ ডলারে পাওয়া যায় কাতারে আপনি কেনো ৮ ডলার আমেরিকান কোম্পানিকে দিচ্ছেন। তখনতো গনমাধ্যমই নেতিবাচক ভাবে তুলে ধরতো এ খবর। এখন না হয় ৩০ ডলার হয়ে গেছে বলে বলছেন ৮ ডলার দিয়ে কেনো করেন নাই তখন। 

যখন একটা কিছু ঘটে যায় এ্ররপরেতো সবাই মাতব্বর, সবাই উত্তর জানে। এখন ডিপ সি গ্যাস ৭ ডলারে কিনতে চাচ্ছেন কিন্তু এখনতো আমেরিকান কোম্পানি বলবে ওখানে গিয়ে আমার লাভ কি। আমিতো আমেরিকাতেই গ্যাস ২০-৩০ ডলারে বিক্রি করি। বড় বড় কোম্পানিগুলোও এখন কৃচ্ছতা করছে, ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট কম করছে। তাই এখন সময় লাগবে ধৈর্য্য লাগবে আবার তাদের আনতে।

জুলিয়া আলম: ডিজেল, ফারনেস অয়েল ও এলএনজিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল,  পরিবেশবান্ধবও নয়। সৌর বিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ সহ পরিবেশবান্ধব বিকল্প বিদু্ৎ নিয়ে সামিটের পরিকল্পনা কি? এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভবিষৎ কি দেখেন?

মুহাম্মদ আজিজ খান: দেখুন, মনিষীরা বলেছেন “যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে দুনিয়া থেকে মুছে যাবে তোমার চিহ্ন”। বর্তমান যুগ কনভেনশনাল ফসিল ফুয়েল থেকে মুভ করে গ্রীন এনার্জিতে যেতে চায়। সেখানেও সামিট এগিয়ে থাকতে চায়। সেজন্য প্রথমে আমরা সোলার ভিলেজ করছি সিএসআর হিসেবে। দ্বিতীয়ত কোপেনহেগেন পার্টনার্স নামে এক কোম্পানির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে পুরো বাংলাদেশে  খুঁজছি কোথায় উইন্ড বেশি, কোথায় সোলার বেশি যাতে একযোগে কমার্শিয়ালি ভায়াবল বিদ্যুৎ পাবো। কিন্তু দেখেন, বাংলাদেশে ১৭ কোটি লোক, বাসস্থান প্রত্যেক দিন বাড়ছে। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের জন্যও জমি দরকার। তাই এখন সোলার প্যানেল লাগানোর জায়গা নাই। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ এরপর বর্ষাকাল আছে, বৃষ্টি আছে। এখানে সৌরবিদ্যুৎ বেশি দেয়া যাবে না। 

সামিট থেকে আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে অ্যাপিল করেছি, আমরা ইন্ডিয়ান একটা কোম্পানির সাথে মিলে রাজস্থানের মরুভূমিতে গ্রীন এনার্জি করবো, উইন্ড এনার্জি করবো। বাংলাদেশ সরকার যদি রিনিউবেল এনার্জি চায় তাহলে ইন্ডিয়া ইজ রাইট সোর্স। তবে আরো ভাল সোর্স ভুটান এবং নেপালের জলবিদ্যুৎ কিন্তু ভারত হয়ে আসতে হয় সেজন্য জিওপলিটিক্যালি কমপ্লিকেটেড। তাই আমাদের কোম্পানি ইন্ডিয়াতে ইনভেস্টমেন্ট করছে বিদ্যুত খাতে ও পোর্টে। 

দেশে আমরা যে নতুন যে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছি সামিট মেঘনা ঘাট-২, এটা হাইড্রোজেনেও চলে। যখন গ্রীন হাইড্রোজেন হবে এবং রিজেনেবল দাম পাওয়া যাবে তখন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটা হাইড্রোজেনে চালাতে পারবো তখন কোন কার্বন নিঃস্বরন হবে না। 

আসলে নতুন নতুন উদ্ভাবন করতেই হবে। কিন্তু উদ্ভাবনতো আবার আমেরিকা ও ইউরোপ নিয়ে গেছে। আমরা প্রোডিউসার ন্যাশন, তারা উদ্ভাবক ন্যাশন। দেখেন, আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় দুই সম্পদের একটি  হলো ১৭ কোটি লোকের ৩৪ কোটি হাত কাজ করতে চায়। অন্য দেশে  লোক বসে বসে খেতে চায়। এই ডিফারেন্ট মাইন্ডসেটই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাদের দ্বিতীয় সম্পদ পানি। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মিষ্টি পানি হিমালয় পর্বত থেকে আমাদের দেশের উপর দিয়ে বয়ে যায়। আজ থেকে ২০-৩০ বছর পরে পৃথিবীতে সবচেয়ে অভাব হবে পানির আর তখন সবচেয়ে ধনী দেশ হবো আমরা। এটা ন্যাচারাল। যেরকম মিডল ইস্ট বড়লোক হয়ে গেছে। এক সময় তারা মাছ ধরতো,  শামুক, মুক্তা কুঁড়াতো-আমরা তাদের বেদুইন বলতাম। এখন দুবাইতে গেলে লোকজনের মাথা খারাপ হয়ে যায় তাদের উন্নয়ন আর সৌন্দর্য দেখে। মাত্র ৪০ বছরে তারা এতো বড়লোক হয়েছে। মিষ্টি পানির যখন গ্লোবাল ডিমান্ড হবে বাংলাদেশও তেমন বড়লোক হবে। 

জুলিয়া আলম: বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে এখন আপনি আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা। এ নিয়ে আপনার উপলব্ধি কি?

মুহাম্মদ আজিজ খান: আমি বলবো পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে ভাল কাজ হলো উদ্যোক্তা হওয়া। কারণ পৃথিবীটাই এখন ব্যবসা। এই যে আপনাদের টেলিভিশন, প্রাইভেট কলেজ, হার্ভাড ইউনিভার্সিটি সবই ব্যবসা, এখানকার যতো ভালো হাসপাতাল পৃথিবীর যতো ভালো হাসপাতাল সেগুলো ব্যবসা। সরকার বড় বড় মহাসড়ক করছে, সেতু করছে সেগুলোতেও ব্যবসা হয়। এর চেয়ে ভাল কাজ আর কি করবেন আপনি? এটা এতো ভালো যে আমি আমার তিন মেয়েকে এন্টারপ্রেনার বানিয়েছি যদিও তারা লেখাপড়া করেছে নানান ফিল্ডে। তবে সবাইকে বলেছি যে ব্যবসা করো। 

তবে আপনি যদি বলেন,  আমি ধনী লোক সেখানে আমার কিছু বলার আছে। আমি কার সাথে ধনী? আমি কি বিল গেটস এর চেয়ে ধনী, আম্বানির চেয়ে ধনী।

জুলিয়া আলম: আপনার কোম্পানী এখন সিঙ্গাপুর বেজড বলা যায়। সেখান থেকে ব্যবসা পরিচালনা করে  বাংলাদেশকে বাড়তি কি দিতে পারছেন?

মুহাম্মদ আজিজ খান:  জ্ঞানের চেয়ে বড় কিছু নাই। হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) বলে গেছেন তোমরা জ্ঞান আহরন করতে প্রয়োজনে চীনে যাও। আমিতো শুধু সিংগাপুর গেছি- ফরিদপুর টু সিংগাপুর। দেখেন, সাউথ ইস্ট এশিয়ার ইকোনোমিক ক্যাপিটাল হয়ে গেছে সিংগাপুর । প্রত্যেকটা কোম্পানির এশিয়ান হেড অফিস নাউ ইন সিংগাপুর নট ইন জাপান। অনেক জাপানির হেড অফিস সিংগাপুরে। এখন আমি জেরা’র প্রেসিডেন্ট, মিতসুবিশির প্রেসিডেন্ট, জিই এশিয়া’র প্রেসিডেন্টদের সাথে বসে কথা বলতে পারি।

দেখেন, এমন সফল মানুষদের উপলব্ধি, তাদের ইচ্ছা তাদের কথার মাঝে একটা কথা থাকে, লেখার ফাঁকে আরেকটা লেখা থাকে সবচেয়ে ভালো করার জন্য সেটাই জানাটা সবচেয়ে বেশি দরকার। আমি সেটি  জানতে পারছি। 

সিংগাপুর ইজ ট্রিপল এ রেটেড। বাংলাদেশ ইজ বি বি মাইনাস ওয়ার্ল্ড রেটিং-এ তাই আমি সিংগাপুর হেড অফিস নিয়ে সিংগাপুরিয়ান কোম্পানি হিসেবে ট্রিপল “এ রেটে টাকা পাই। আমাদের মেঘনাঘাট-২বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য সাড়ে ৩ পারসেন্ট ইন্টারেস্টে  টাকা পেয়েছি। এটা আরো সম্ভব হয়েছে কারণ আমাদের কোম্পানির মালিকানায় অংশিদার জেরা, মিতসুবিশি  জিই, আইএফসি, তাইও লাইফ ইন্সুরেন্স। এরা কি বাংলাদেশে অতো্ কমফোর্টেবল হতে পারতো?  ওনারা গুড কর্পোরেট গর্ভনেন্স চায়। আমাদের বাংলাদেশে একজন লোক ইন্তেকাল হয়ে গেলে তার কোম্পানি আর চলে না। কেনো চলে না? কারন ইনস্টিটিউশনালাইজড করা যায় না। ম্যানেজমেন্টকে ওভাবে বড় করা যায় না। যেটা সিংগাপুর সবচেয়ে ভাল করছে। কর্পোরেট গর্ভনেন্সে সিংগাপুর পৃথিবীর প্রথম তিনের ভেতরে। ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি বলেন ফাইনান্সিয়াল প্রোগ্রেস বলেন আমাদের দেশের লোকজন ইন্টারন্যাশনালাইজড হতে পারে না কেনো! 

আপনি সারা পৃথিবীর সাথে কম্পিটিশন না করলে সারা পৃথিবীর তুলনায় ভাল হবেন কিভাবে। মুরগির খোপের ভেতরে একটা মুরগি আর বনে গেলে বাঘ হওয়া যায়। আমরা ইন্ডিয়াতে পোর্ট করেছি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র করেছি। ইন্ডিয়ানরা আমাদের এখানে আসছে। সারা পৃথিবী কি বলছে, জাপানিজ গর্ভমেন্ট  বলছে বিদেশে ইনভেস্ট  করো, আমেরিকা বলছে বিদেশে ইনভেস্ট করো। আমেরিকা থেকে আপনি এখানে টাকা চাচ্ছেন আমাদেরওতো কিছু দেবার আছে তাদের। আমরা ম্যানপাওয়ার দিচ্ছি, গারমেন্টস দিচ্ছি। আমি সিংগাপুর গিয়েছি কিভাবে বুদ্ধি নেয়া যায়, টেকনোলজি ট্রান্সফার করা যায়। এখন যে ৫টি কোম্পানি আমাদের  ইনভেস্ট করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টারবাইন ম্যানুফ্যাকচারার ইজ জিই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইউটিলিটি কোম্পানি জেরা, জাপানের সবচেয়ে বড় কর্পোরেশন মিতসুবিশি। জাপানের বড়  লাইফ ইন্সুরেনস তাইও লাইফ। এরা আমাদের পার্টনার। আমার আশা একদিন যেনো বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি মিতসুবিশি হতে পারে, জিই কর্পোরেশন হতে পারে। মন ছোট রেখে লাভ কি?।

জুলিয়া আলম: আপনার মূল ব্যবসার বাইরে বাংলাদেশের শিল্প বাণিজ্যের বড় বড় খাত এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলো নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষন কি, পরামর্শ কি? সামিটের ব্যবসা সম্প্রসারন পরিকল্পনায় নতুন কি কি আছে?

মুহাম্মদ আজিজ খান:  আমার মতে, বাংলাদেশের দুটো খাত খুব ভাল করবে। একটা ইনফ্রাস্টাকচার মানে ভৌত অবকাঠামো। আরেকটা কনজ্যুমার প্রোডাক্টস। কারন কনজামশন বাড়ছে লোকজন বড় লোক হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ পার ক্যাপিটা কনজামশন এখনো কম। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম। ফেল করা শ্রীলংকারও  অর্ধেক পার ক্যাপিটা বিদ্যুৎ খরচ করি আমরা। এখানে অনেক অপরচ্যুনিটি তবে গ্যাস লাগবে বাংলাদেশে। আমরা চাচ্ছি এখন গ্যাস ফিল্ড ও লিকুডিফিকেশন প্লান্ট কিনতে কিংবা ইনভেস্ট করতে। যেনো কম মূল্যে বাংলাদেশে গ্যাস আনতে পারি। লিকুডিফিকেশন প্লান্টের জন্য আমেরিকাতে, কানাডাতে আলাপ আলোচনা করছি। ইন্ডিয়া থেকে, নেপাল ও ভুটান গ্রীণ এনার্জি বাংলাদেশে আনতে সেখানে ইনভেস্ট  করার চেষ্টা করছি। এখানে টারমিনাল করছি এলএনজির জন্য। এই খাতগুলো শেষ হওয়ার পর আমার নেক্সট জেনারেশন নিশ্চয় আরো নতুন কিছু চিন্তা করবে। কারন বাংলাদেশ অনেক দিন ধরে উন্নতি করবে। আরো ৪০-৫০ বছর বাংলাদেশ শুধু উন্নতিই করবে। যতো কঠিন অবস্থাই হোক তবু উন্নতি করবে। কাজেই এখানে অনেক কাজ হবে। আমি পর্যন্ত শুধু এ খাতেই থাকতে চাচ্ছি। 

জুলিয়া আলম: করোনাকাল এবং ইউক্রেণ-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের সাথে তুলনা করলে দেশে এখন অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন?  অনেকেই বলছেন রপ্তানীমুখী খাত ছাড়া কোন খাতেই তেমন বিনিয়োগ হচ্ছেনা। আপনি কি দেখছেন?  

মুহাম্মদ আজিজ খান: বিদেশী কোম্পানি টাকা আয় করার জন্য ফরেন ডিরেকট ইনভেস্টমেন্টের কথা বলে। এফডিআই যেভাবে আসে সেভাবে চলে যায়। ইন্ডিয়া থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার চলে গেছে গত ৩ মাসেই। শ্রীলংকা ডুবে গেছে তাই এফডিআই চলে গেছে। আপনি এফডিআই আনেন তাহলেতো সেটা আবার চলে যেতে পারে। ক্যাপিটাল মার্কেট থেকেও ক্যাশ আউট হতে পারে। ১৯৯৭ সনে এশিয়ান ইকোনোমিক ক্রাইসিসের কারণ বিদেশী বিনিয়োগকারিরা হঠাৎ করে তাদের ফেরত নিয়ে গেছে। আপনিতো ফেরত নেয়া বন্ধ করতে পারেন না। সেখানে যদি নিজস্ব লোক বিনিয়োগ করতে পারে বাংলাদেশের সেভিংস যদি এনাফ হয়। লোকজন বলতেছে ঋণ বাড়ছে কিসের ঋণ বাড়ছে উই আর দ্য লিস্ট ইনিডেবেটেড কান্ট্রি। আমরা সব করি নিজেদের পয়সায়। শুধু পদ্মা ব্রিজ না যে খাবার আমরা খাই তার বেশিরভাগই আমাদের কৃষক ভায়েরা উৎপাদন করে। আমাদের গার্মেন্ট কারখানায় আমাদের বাংগালিরা ইনভেস্ট করে। দেশে  ৫-৬ হাজার গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে সহযোগী শিল্প মিলে ধরেন মালিক আছে ৫০ হাজার কেনো হঠাৎ বিদেশী সিএন্ডএ, মার্কস এন্ড স্পেন্সার এসে তাদেরকে কিনে নিলে আমাদের কি লাভ হবে? আমি বুঝিনা লোকজন কেনো্ শুধু এফডিআই্ নিয়ে কথা বলে। আমি  ওপেন ডিবেট করতে রাজি আছি।  যেসব দেশে এফডিআই হয়েছে আমেরিকাতো আমেরিকার টাকা ইনভেস্ট করলে বের করে নিয়ে আসতে পারবে  কিন্তু আপনি ইউরোপে গেলেও তা পারবেন না। 

জুলিয়া আলম: দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ কি?

মুহাম্মদ আজিজ খান: একটা গ্লাসে পানি অর্ধেক থাকলে কেউ বলে খালি কেউ বলে অর্ধেক ভরা। আমি অর্ধেক পানি ভরা দেখার পক্ষে, ইংরেজীতে যাদের বলে অপটিমিস্ট।  বাংলাদেশ যে গার্মেন্টস তৈরি করছে তা পৃথিবীর সবচেয়ে কম দামে ভালো গার্মেন্টস। তাই সেটা আমেরিকা যাচ্ছে। আমেরিকানরা অ্যাপেল তৈরি করছে আপনি গার্মেন্টস তৈরি করছেন। এই যে গ্লোবাল ভিলেজ এখানে সেখানে গ্লোবাল ট্রেড বেড়ে বিশ্বের অনেকে বড়লোক হয়ে গেলো। চায়নার ১.৪ বিলিয়ন পিপল বড়লোক হয়ে গেল। মাত্র  ২০-২৫ বছরে এর চেয়ে ভালো পৃথিবী কখনো ছিল না। বাংলাদেশ পার ক্যাপিটা ইনকাম ২ হাজার ৮০০ ডলার। যে দেশ থেকে স্বাধীন হয়েছি সেই পাকিস্তানের এখন ২৫০ রুপি সমান ১ ডলার। আমাদের ১০০ হইছে তাই মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ১৯৭১ সনে ইস্ট পাকিস্তানের পার ক্যাপিটা ইনকাম ছিল ৪০ ডলার আজকে এটা ২৮০০ ডলার। ইন্ডিয়ার ছিল ৭০ ডলার সেটা এখন প্রায় ২৫০০ ডলার। ওয়েস্ট পাকিস্তানের ছিল ৮০  সেটা এখন ১৮০০ ডলার। আমাদের দেশ সবচেয়ে ভালো করলো। আমিতো কোনো দুঃখ দেখিনা। ৩০ টার উপরে টিভি চ্যানেল আছে। ৬০ টা ব্যাংক। সেসময় ৭ কোটি লোকের খাবার হয়নি তাই  ফ্যামিন হয়েছে এখন ১৭ কোটি লোক  খাবার খাচ্ছে। গড় আয়ু ৪৫ বছর থেকে বেড়ে ৭৪ হয়েছে। আর কি চাই! আমাদের রাজনীতিতে একটা স্থিতিশীলতা আসছে এটা বড় পসিবিলিটি। পৃথিবী অস্থির তবু আমি মনে করি আমাদের গার্মেন্টস রপ্তানি বাড়বে। রেমিটেন্স বাড়বে। সিংগাপুর সরকার চায় বাংলাদেশ থেকে আরো লোক যাক, সৌদি সরকার চায় বাংলাদেশ থেকে লোক আসুক, ইউএই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াও চায়। তাই রেমিটেন্স বাড়বে। এ বছর কম, বিশ্ব পরিস্থিতির জন্য। ২০২৩/২৪ এ দেখবেন আমাদের ডাবল ডিজিট গ্রোথ হচ্ছে রেমিটেন্সে। বর্তমানে এক জলট আসছে- এটা বাংলাদেশ তৈরি করে নাই। বাংলাদেশ সরকারও তৈরি করে নাই, আপনি, আমি সাধারণ জনগন কেউই তা তৈরি করে নাই। আমাদের ক্যাপাসিটি পেমেন্টর জন্যও এটা তৈরি হয় নাই। 

দেখেন আমিতো সবসময় এটার পক্ষে বলি নিজের টাকা নিজে না নিতে পারলে সে টাকার কি দাম আছে নাকি। বেগমপাড়াতে কয় টাকা গেছে? ৫০০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি আমদের অন্যান্য দেশতো জিডিপির ২-৩ পারসেন্ট খরচ করে ফর এন্টারটেইনমেন্ট। যুদ্ধের জন্য খরচ করে ৩-৪ পারসেন্ট । আমি সিংগাপুর থাকি আমাকে দেখে সে দেশের সরকার বাংলাদেশ থেকে আরো ব্যবসায়ী নিতে চায়, জার্মানি চায়। পৃথিবীতে বাংলাদেশের রেসপেক্ট বাড়ছে। আমরা গরীব ছিলাম। ১৯৭১ সনে আমাদের পার ক্যাপিটা ইনকাম পশ্চিম পাকিস্তানের অর্ধেক ছিলো এখন সেটা তাদের প্রায় ডাবল হইছে। এর থেকে বেশি কি সাকসেস চান!  ইংল্যান্ড থেকে স্বাধীনতা নিয়েছে ইন্ডিয়া তারাও তো ৮০ বছরে ইংল্যান্ডের চেয়ে বড় হতে পারে নাই পার ক্যাপিটা ইনকামে । আমরা তা পেরেছি জাস্ট ইন ফিফটি ইয়ারস।

জুলিয়া আলম: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মুহাম্মদ আজিজ খান: আপনাকেও অনেক ধন্যাবাদ। 


একাত্তর/এআর

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

বাতাস যখন ভয়ঙ্কর-২

বাতাস যখন ভয়ঙ্কর-২

১ মাস ১৮ দিন আগে