ঢাকা ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

চাইলেই তেলের দাম বাড়ানো এড়ানো যেতো: সিপিডি

কাবেরী মৈত্রেয়, একাত্তর
প্রকাশ: ১০ আগষ্ট ২০২২ ১৯:১৬:২৫ আপডেট: ১১ আগষ্ট ২০২২ ০৮:৪২:৩৩
চাইলেই তেলের দাম বাড়ানো এড়ানো যেতো: সিপিডি

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে প্রতি বিঘায় ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে কমপক্ষে এক হাজার টাকা। এর প্রভাবে চালের উৎপাদন খরচ কেজিতে বাড়বে পাঁচ টাকা। 

গত আট বছরে সরকারী সংস্থা বিপিসির লাভের খতিয়ান তুলে ধরে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি জানিয়েছে, দুর্নীতি, চুরি আর অব্যবস্থাপনা কমিয়ে আনা গেলে এই মুহূর্তে তেলের দাম এক লাফে এতো বাড়ানোর দরকার হতো না। 

আট বছরে (২০১৫-২১) বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৪৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা লাভ করেছে। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে। বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল, সেই প্রশ্নও রেখেছে সিপিডি। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০১৫ থেকে ২০২১ অর্থবছরে বিপিসি মুনাফা করেছে প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে। 

গেলো অর্থবছরের মে পর্যন্ত নিট মুনাফাও কম নয়। যদিও এ বছরের ফেব্রয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত লোকসান গুনেছে আট হাজার ১৫ কোটি টাকা।

ডিজেল আর কেরোসিন কিনতে প্রায় ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত কর দেয় সাধারণ মানুষ, যেখান থেকে সরকারের লাভও কম নয়। 

বুধবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এখন এড়ানো যেত কি?’ শীর্ষক আলোচনায় বিপিসির লাভের ৩৬ হাজার কোটি টাকা কোথায় গেলো সেই প্রশ্ন তোলেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। 

তিনি, বলেন, ২০১৫ সালে ৪ হাজার ১২৬ কোটি, ২০১৬ সালে ৯ হাজার ৪০ কেটি, ২০১৭ সালে ৮ হাজার ৬৫৩ কোটি, ২০১৮ সালে ৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা লাভ করেছে বিপিসি। 

এছাড়া ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৭৬৮, ২০২০ সালে ৫ হাজার ৬৭ এবং ২০২১ সালে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৯ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা লাভ করেছে। 

আমরা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য পেয়েছি। বিপিসি সব সময় জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করেছে। তাহলে এখন কেন ভর্তুকি তুলে নেওয়া হলো, এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি। 

গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাকি ৩৬ হাজার কোটি টাকা কোথায়? ১০ হাজার কোটি টাকা সরকার নিয়েছে। বিপিসির বাকি টাকা কোথায় গেল? 

শুনেছি প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু টাকা খরচ করছে। আমরা দেখছি বিপিসি নাকি সবচেয়ে ধনী গ্রাহক। বিপিসির ২৫ হাজার কোটি টাকা অ্যাকাউন্টে রাখা হয়েছে। 

তাহলে এসব টাকা কার? বিপিসি চাইলে এই সংকট সময়ে জ্বালানি তেলের ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে পারতো বলে মনে করেন সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগের এই গবেষক। 

সিপিডি বলছে, বিপিসির দূর্নীতি, চুরি, অব্যবস্থাপনা শুরু থেকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে এই মূহূর্তে এক লাফে বাড়াতে হতো না দাম, মূল্যস্ফীতির যাতাঁকলে আরেক দফা পিষ্ঠ হতো না মানুষকে। 

আরও পড়ুন: সুইস ব্যাংকে নির্দিষ্ট করে কারো তথ্য চায়নি বাংলাদেশ

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় সিপিডির নিবার্হী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিপণ্য উৎপাদনের খরচ বাড়বে। অনেকে কৃষিকাজ ছাড়বে। 

এতে আমদানি বাড়বে। শিল্পের উৎপাদন খরচও বাড়বে। ব্যবসার লভ্যাংশ কমবে। অর্থাৎ ধাপে ধাপে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে জীবনযাত্রায়। বড় ধাক্কা আসবে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্রদের ওপর। এ কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্বিবেচনা জরুরি।

তিনি বলেন, করোনা মহামারির প্রভাবে অনেক মানুষ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে অনেকে। তাদের স্বস্তি না দিয়ে উল্টো চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

প্রায় ৩৫০ যাত্রী ও ১২টি দূরপাল্লার বাস কাউন্টারে গিয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতা বিনিময় করে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দিনে শহরে যাতায়াত খরচ বেড়েছে গড়ে ৭০ থেকে ২০০ টাকা। 

আর দূরপাল্লার বাসে খরচ বেড়েছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। শহরে প্রতি কিলোমিটারে আড়াই টাকা নির্ধারণ করা হলেও তিন থেকে সাত টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে বিভিন্ন পরিবহন।

সরকারের সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, একবারে এত বেশি দাম বাড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এখনো আসেনি। ধান চাষে প্রতি বিঘা জমিতে এক হাজার টাকা খরচ বাড়বে কৃষকের। এ খাতে ১৫ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয়, যার ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। 

এখানে অন্তত আগের দামে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে হবে। কৃষিতে ভর্তুকি তুলে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ধানের উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশ বড় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে বলেও সতর্ক করে দেন সাবেক এই কৃষি সচিব। 

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ভর্তুকি প্রত্যাহার সমর্থন করি কিন্তু যেভাবে করা হয়েছে, এটাকে সমর্থন করি না। দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ সময়ে সরকার জ্বালানি তেলের কর তুলে দিতেই পারে। 

বরং দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা ভয়ংকর বৈষম্যমূলক। ধনীর কিছু হবে না, গরিব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে যোগ করেন তিনি। 

এ সময়ে মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো গেলে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সহায়ক হতো বলে মনে করছেন বিকেএমইএ সহসভাপতি ফজলে শামীম এহসান। 

তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ডিজেলের ব্যবহার বেড়েছে কারখানায়। নতুন দামে কিনে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। দুই মাস আগেই দাম কমিয়েছে ক্রেতারা। এদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির কারণে সামনে শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো লাগতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। বলেছে, মূল্যবৃদ্ধি পুনর্বিবেচনা করে এটি কমিয়ে আনা। খোলাবাজারে কম দামে সরকারের পণ্য বিক্রি বাড়ানো। 

রেশন কার্ডের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ানো। শুধু দরিদ্র নয়, নিম্ন আয়ের মানুষদেরও দিতে হবে। আর এটা যাঁর প্রয়োজন, তাঁকে দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা। 

মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করতে দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। 


একাত্তর/এআর


মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

Nagad Ads
ছাদ খোলা অভিবাদন!

ছাদ খোলা অভিবাদন!

২ মাস ৮ দিন আগে