ঢাকা ১৫ জুন ২০২১, ১ আষাঢ় ১৪২৮

ট্রোজান শিল্ড: কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার এক সফল অভিযান

একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২১ ১৮:৩৫:২২ আপডেট: ১১ জুন ২০২১ ১৬:২৭:২০
ট্রোজান শিল্ড: কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার এক সফল অভিযান

কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা বা চোর ধরতে চোরকে কাজে লাগানোর প্রবাদ আমরা অনেক শুনেছি। গল্প-সিনেমায় এমন ঘটনা অনেক দেখলেও, বাস্তবে হাতেগোনা। এবার এমনই এক সিনেম্যাটিক ঘটনা ঘটিয়ে দেখালো ফেডারেল ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স (এফবিআই)।  স্টিং অপারেশন চালিয়ে অপরাধীদের ব্যবহৃত ডিভাইসে বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ৮০০ জনের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে 'অপারেশন ট্রোজান শিল্ড' নামের অভিযানে। 

বিবিসি'র তথ্যমতে, 'ফেসবুক গ্যাংস্টার' খ্যাত হাকান আইক ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় কারাভোগের মেয়াদ কমিয়ে দেওয়ার শর্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহযোগিতা করতে এক সমঝোতায় রাজি হন। তুর্কি বংশোদ্ভূত আইক ছিলেন একজন স্মার্টফোন ডেভেলপার, যিনি মাদক পাচারের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এই সমঝোতা অনুযায়ী, এক লাখ ২০ হাজার ডলারের বেশি খরচ করে আইকের সহায়তায় এফবিআই গড়ে তোলে 'এএনওএম' নামের অ্যাপভিত্তিক একটি এনক্রিপ্টেড ডিভাইস। এতে কেবল অন্য 'এএনওএম' ডিভাইসে বার্তা পাঠানোর সুবিধা ছিলো, অন্য কোনো ইমেইল, ফোনকল বা জিপিএস সেবা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে এই নেটওয়ার্কের সেবা নিতে ছয় মাসে দিতে হতো এক হাজার ৭০০ ডলার। 


এরপর পরিকল্পিতভাবে দুই বছর ধরে অপরাধী চক্রের ব্যবহার করা দুটি এনক্রিপটেড ফোন নেটওয়ার্কে (এনক্রোচ্যাট ও স্কাইগ্লোবালে) নিয়মিত বিঘ্ন ঘটানো হয়। এ দুই যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হয়ে যাবার ফলে এনক্রিপটেড যোগাযোগের বাজারে এক বড় শূণ্যতা তৈরি হয়। এ শূণ্যতা ব্যবহার করে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এফবিআই 'এএনওএম' অ্যাপ সম্বলিত নিজস্ব এনক্রিপটেড ডিভাইস বাজারে ছড়িয়ে দেয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই মাফিয়া, এশিয়ান গ্যাং রিং, মাদক চক্র ও মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের হাতে এফবিআই-এর এনক্রিপটেড ডিভাইসটি পৌঁছে যায়।

আরও পড়ুন: বিশ্বকে নতুন একটি এন্টিবায়োটিক দিলো বাংলাদেশ

পরবর্তী তিন বছরে এফবিআই-এর এই 'অপারেশন ট্রোজান শিল্ড'-এ যুক্ত হয়েছেন বিশ্বের ১৭টি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় নয় হাজার সদস্য। তারা ১০০ দেশের ১২ হাজার ডিভাইস থেকে ২ কোটি ৭০ লাখ মেসেজে নজরদারি করেছেন। এর ফলে তিন শতের বেশি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়মিত অনুসরণ করা সম্ভব হয়েছে তাদের পক্ষে। 


জানা যায়, এফবিআই, ইউরোপোল ও অন্যান্য দেশের পুলিশ সংস্থা নজরদারির মাধ্যমে এই অপারেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় একশ হত্যাকাণ্ড রোধ করেছে। এছাড়াও ঠেকিয়েছে বেশ কয়েকটি বড় আকারের মাদক চোরাচালান।

এফবিআই-এর সহকারী পরিচালক কেলভিন শ্রিভার্স এই অ্যাপের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে বলেন, 'ফলাফল বিস্ময়কর। এটি চালু করার পরই অপরাধী চক্রের ওপর নজরদারি করার সুযোগ তৈরি হয়। আমরা ফল শিপমেন্টের আড়ালে, মুখবন্ধ ক্যানে করে শত শত টন কোকেন পাঠানোর ছবি দেখতে পাই।' 

এফবিআই একশর বেশি দেশে গত দেড় বছর ধরে অপরাধী চক্রের হাতে এই ডিভাইস পৌঁছে দিয়েছে, যাতে তাদের যোগাযোগ কার্যক্রমে নজরদারি করা যায়, বলেন শ্রিভার্স। অপরাধীদের মধ্যে এই ডিভাইস ছড়িয়ে দিতে ও আস্থা অর্জনে অস্ট্রেলিয়ার এজেন্সি এফবিআই'কে সহায়তা করে বলেও জানান তিনি। 


ইউরোপিয় ইউনিয়নের পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল জানায়, সারা বিশ্বে প্রায় ১২ হাজার বিশেষায়িত এই ডিভাইসটি ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ১৬টি দেশের পুলিশ এই ডিভাইস থেকে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে। 

ইউরোপোলের অপারেশন বিভাগের উপ-পরিচালক জন ফিলিপ লেকুফি বলেন, এই ডিভাইসটি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক'শ অপারেশন চালানো হয়। নিউজিল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, সবখানেই সফল অভিযান চালানো গেছে। এসব অভিযানে ৮ শ'র বেশি সন্দেহভাজনকে আটক, ৭ শ'র বেশি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে ৮ টনের বেশি কোকেন, ১২ টন গাঁজা, ২ টন সিনথেটিক মাদক, আড়াইশ আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৫টি বিলাস বহুল যানবাহন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে আট কোটি ৮০ লাখ ডলারের বেশি উদ্ধার করা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়াতে এই অপারেশনে ২২৪ জনের বিরুদ্ধে ৫ শটির বেশি অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়াও বন্ধ করা হয়েছে ছয়টি নকল ওষুধের কারখানা। নিউজিল্যান্ডের পুলিশ জানিয়েছে, ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দেশটিতে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রেসিডেন্ট স্কট মরিসন বলেন, 'এ অভিযান সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে শুধু দেশেই প্রচণ্ড আঘাত হানবে না, বিশ্বজুড়েই এর প্রতিফলন ঘটবে।' 


আদালতের নথি এবং অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশের বক্তব্যে জানা যায়, আদালতে জমা দেওয়া নথিপত্রের মধ্যে একটি ছবিতে দেখা গেছে অবৈধ মাদকের বিপুল চালান যাচ্ছে একটি কূটনৈতিক ব্যাগে, যা ফ্রান্সের বলে শনাক্ত করা হয়েছে। কলাম্বিয়া থেকে ওই ব্যাগে করে কোকেনের চালান আসছিলো। নথিতে অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যের পরিচয়ও উঠে এসেছে।

আদালতের নথি থেকে আরও জানা গেছে, অপরাধী চক্রগুলোকে কেউ একজন আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছিলো যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে যাচ্ছে। এছাড়াও গত মার্চে একজন ব্লগার 'এএনওএম' অ্যাপটির নিরাপত্তা ত্রুটির কথা তুলে ধরেন।  ডিভাইসটি অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ ফাইভ আইস ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলে তথ্য প্রকাশ করেন তিনি। পরে তিনি অবশ্য পোস্টটি মুছেও ফেলেন।

জানা গেছে, যার সহযোগিতায় এতো কিছু, সেই হাকান আইক কারাদণ্ড মওকুফের পর তার ডাচ স্ত্রীকে নিয়ে তুরস্কে বসবাস করছেন। ইতিমধ্যেই তাকে পুলিশের নিরাপত্তা হেফাজতে চলে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন অনেকেই। এফবিআইকে সহযোগিতা করার কারণে এখন তার জীবন বিপন্ন হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।


একাত্তর/জো 

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন