ঢাকা ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

ছবির জন্য ইন্সটাগ্রাম, বইয়ের জন্য বুক্সটাগ্রাম

নভেরা কাজী
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২১ ১৪:৩৫:৩০ আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩:৫৯:৫৬
ছবির জন্য ইন্সটাগ্রাম, বইয়ের জন্য বুক্সটাগ্রাম

ছবি শেয়ার করার জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামের নাম তো অনেকেই শুনেছেন। কিন্তু বুক্সটাগ্রামের কথা শুনেছেন কি কখনো? ইন্সটাগ্রাম ব্যবহার না করলে বুক্সটাগ্রাম সম্পর্কে ধারণা থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে বইপ্রেমি হলে কিংবা ছবি তোলার শিল্পে আগ্রহী হলে এই জগতে একবার যে ডুব দেবে সে আর সহজে উঠতে চাইবে না। 

নাম দেখেই হয়তো বোঝা যাচ্ছে বই আর ইন্সটাগ্রাম সম্পর্কীয় কোন একটা জিনিস এই বুক্সটাগ্রাম। ঠিক তাই। বইপাগলা কিছু মানুষ আছেন যারা সামাজিক যোগাযোগের এই অ্যাপটি ব্যবহার করেন কেবল বইয়ের ছবি শেয়ার করতে, বই নিয়ে আলোচনা করতে আর নতুন নতুন বইয়ের খোঁজ জানাতে। তাদেরকে নিয়ে বিশাল ইন্টারনেটের এই ছোট্ট কোণাটিকেই ভালোবেসে তারা নাম দিয়েছেন 'বুক্সটাগ্রাম'।

বই আর বইপড়ুয়াদের নিয়ে মোটামুটি সবারই যা ধারণা তা হলো- খুব বুদ্ধিমান আর চিন্তাশীল মানুষই আনন্দের জন্য বই পড়েন। খটমট, কঠিন ভাষায় লেখা বই নিয়ে এরা চিন্তার জগতে ডুবে থাকেন। এরা হন কিছুটা অন্তর্মুখী, কিছুটা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। মানুষের চেয়ে এককাপ চা কিংবা কফি নিয়ে বইয়ের সান্নিধ্যে সময় কাটাতেই তারা বেশি পছন্দ করেন। কথাগুলো খুব একটা মিথ্যে নয়, কিন্তু বইপোকাদের চিন্তা-ভাবনা যে কেবল কালো কালিতে লেখা শব্দের মধ্যে ঘুরপাক খায় না তা বুঝতে হলে দেখতে হবে বুক্সটাগ্রামারদের প্রোফাইল। বই নিয়ে যে মানুষের এত সৃষ্টিশীলতা, এত চিন্তা আর এত ভালোবাসা থাকতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস হবে না। বুক্সটাগ্রামারদের কাছে বই কেবল সময় কাটানোর উপলক্ষ্য নয়, বইকে তারা বানিয়ে ফেলেছেন জীবনযাপনের উপলক্ষ্য। বলা যেতে পারে বই তাদের জীবনের কেন্দ্র, আর বইকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের বাকি সব কাজকর্ম। সময়ের অভাবে বই পড়তে পারেন না বলে যারা অভিযোগ করেন তারা অনুপ্রাণিত হতে পারেন বুক্সটাগ্রামারদের দেখে। মেডিকেলের পড়াশুনা, কর্পোরেট চাকরি, ব্যবসা কিংবা ঘর-সংসার সামলে এরা দিব্যি কীভাবে বই পড়ার জন্য সময় বের করেন তা দেখলে বিশ্বাস হবে, কোন কিছুকে ভালোবাসলে তার জন্য সময় করা খুব একটা কঠিন নয়, দরকার শুধু কোনটাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি সেটা ঠিক করা। 


পৃথিবীর অনেক দেশেই গড়ে উঠেছে আলাদা আলাদা বুক্সটাগ্রাম কমিউনিটি। তাদের নিজেদের মধ্যে বন্ধুত্বেরও শেষ নেই। বাংলাদেশেও একটু একটু করে একটা বিশাল বুক্সটাগ্রাম কমিউনিটি তৈরি হয়েছে। এদের সবার মধ্যে সহযোগিতা আর বন্ধুত্ব দেখলে মনেই হবে না যে বইপোকারা 'অসামাজিক' হওয়ার জন্য কিছুটা কুখ্যাত! বুক্সটাগ্রাম থেকেই অনেকে পেয়ে গেছে আজীবনের ভালো বন্ধু। আর এই বন্ধুত্ব যে কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ তা নয়, নিয়মিত তাদের মধ্যে চলে বইয়ের উপহার আদান-প্রদান, কিংবা সবাই মিলে একসাথে আড্ডা। যদিও মহামারীর কারণে এই দেখাসাক্ষাৎ থেমে আছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। 


তবে বুক্সটাগ্রামাররা যে কেবল বই নিয়েই পড়ে থাকেন তা ভাবলে ভুল হবে। আজকাল তারা নিজেদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছেন বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে কিংবা বইয়ের সাথে জীবনযাপনের অন্যান্য দিক কীভাবে খাপ খায় তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে। সবারই চেষ্টা থাকে নিজের ভালোলাগার জায়গাগুলোকে একসাথে এনে নিজেকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরার। 

যেমন @readingwhileipoop নামে পরিচিত জাইমা হামিদ যোয়া গত বছর থেকে শুরু করেছেন 'পাশে আছি ইনিশিয়েটিভ'। করোনা মহামারিতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নীলক্ষেতের বই ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে শুরু করলেও এখন এর মাধ্যমে তিনি সাহায্য করছেন বিভিন্ন হারিয়ে যেতে বসা শিল্পের ছোট ছোট ব্যাবসায়ীদের। 

আজকালকার ছেলেমেয়েরা বই পড়ে না ভেবে যারা হতাশ হন তাদের জন্য আশা জাগাবে বুক্সটাগ্রামের আদুরে জগত। সময়টা পাল্টে ডিজিটাল হয়ে গেলেও বইয়ের জন্য ভালোবাসা যে শাশ্বত তার প্রমাণ তরুণ এই বুক্সটাগ্রামাররা।   


একাত্তর/এসজে 

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন