ঢাকা ২৫ মে ২০২২, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

স্বস্তির পেয়ালা

নভেরা কাজী
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২১ ১৪:৪৬:৩৫ আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩:৫৯:২৬
স্বস্তির পেয়ালা

একজন নারীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড। দিনের হিসেবে, গড়পড়তা এক নারীকে তার জীবনের সাড়ে তিন হাজার দিন বা ১০ বছর কাটাতে হয় পিরিয়ডের সঙ্গে। নারীর স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের বহু দিক তার পিরিয়ডের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।

অথচ, নারীর জীবনের এই সময়টিকে সহজ আর আরামদায়ক করতে গত প্রায় একশ’ বছরেও তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

পিরিয়ড ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পণ্য স্যানিটারি প্যাড আবিষ্কৃত হয় ১৮৯৬ সালে। আরেক পণ্য ট্যাম্পন, তাও আবিস্কার হয় প্রায় ৮৮ বছর আগে, ১৯৩৩ সালে।

পিরিয়ডের সময় ব্যবহারের জন্য আরও আরামদায়ক কিছু আবিষ্কার করতে তখন থেকে আজ পর্যন্ত কিছু কিছু গবেষণা হলেও, প্যাড আর ট্যাম্পনের মতো বহুল ব্যবহৃত আর কোন কিছুই কেউ বানাতে পারেননি।

তবে, সাম্প্রতিক সময়ে পিরিয়ড ব্যবস্থাপনায় নতুন এক পণ্য আবিষ্কৃত হয়েছে, যার নাম 'পিরিয়ড কাপ' বা 'মেন্সট্রুয়াল কাপ'। আর সবকিছুর মতো প্রথম প্রথম উন্নত দেশের নারীরা ব্যবহার করলেও, আজকাল বাংলাদেশের নারীরাও এর নাগাল পেতে শুরু করেছেন।

তুলনামূলক কম দাম আর পরিবেশবান্ধব পিরিয়ড কাপ হতে পারে পিরিয়ড ব্যবস্থাপনায় নারীর জন্য আদর্শ সমাধান। জেনে নিন কেন প্যাড বা ট্যাম্পন বাদ দিয়ে পিরিয়ড কাপ বেছে নেবেন:

লম্বা সময় ধরে ব্যবহার

পিরিয়ডের সময় একজন নারীকে দিনে গড়ে চার থেকে পাঁচবার প্যাড বদল করতে হয়। পড়াশোনা বা চাকরির কাজে যাদের সারাদিন বাইরে থাকতে হয়, কেবল তারাই জানেন এটি কত বড় বিড়ম্বনা। সেই সঙ্গে কাপড়ে দাগ লাগার চিন্তা তো সারাক্ষণ লেগে আছেই।

কিন্তু মেন্সট্রুয়াল কাপ টানা আট থেকে দশ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। এত লম্বা সময় ব্যবহারেও এতে নেই ইনফেকশনের ভয়। শুধু প্রত্যেকবার ব্যবহারের পর পানি দিয়ে ধুয়ে নিলেই হলো। আর প্রতি পিরিয়ড শেষে গরম পানিতে ভালো করে ফোটাতে হবে। এটি ঠিকমতো ব্যবহার করলে দাগ লাগার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

সাশ্রয়ী দাম

প্যাডের পেছনে একজন নারীর মাসে খরচ হয় গড়ে একশ’ থেকে তিনশ’ টাকা, ক্ষেত্র বিশেষে তারও বেশি। সে হিসেবে বছরে খরচ গড়ে বারোশ’ থেকে চার হাজার টাকা। একজন নারীর যদি চল্লিশ বছর বয়সে মেনোপজ হয় বলেও ধরা হয়, প্যাডের পেছনে জীবনে তার খরচ হবে নূন্যতম ত্রিশ হাজার টাকা।

অন্যদিকে একটি পিরিয়ড কাপের দাম ব্র্যান্ডভেদে পাঁচশ’ থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে। কিন্তু এই একটি কাপই পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। ফলে, অন্তত পাঁচ বছরের জন্য প্রতি মাসে প্যাডের পেছনে খরচ থেকে বেঁচে যাবেন।

আরামদায়ক

পিরিয়ড কাপ এমন এক জিনিস, যা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে কখনো মনেই হবে না যে আপনি কোন কিছু আপনার শরীরের ভেতরে ব্যবহার করছেন। বরং মনে হবে এটি আপনার শরীরেরই একটি অংশ। প্যাড বা ট্যাম্পন ব্যবহারের অস্বস্তি এতে নেই।

কাপ ব্যবহারের সময় আপনি যে কোন ভারী কাজ করতে পারবেন, এমনকি যে কোন অবস্থানে ঘুমাতে পারবেন কাপড়ে দাগ লাগার ভয় ছাড়াই। যাদের এটি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আছে তারা অনেকেই বলেন, পিরিয়ডের সময় তলপেটের ব্যথা কমাতেও কাজ করে পিরিয়ড কাপ।

পরিবেশবান্ধব

স্যানিটারি প্যাড আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮৯৬ সালে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী তার জীবনে গড়ে পাঁচ থেকে পনেরো হাজার স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন। আর একেকটি প্যাড পচে মাটির সাথে মিশে যেতে সময় লাগে প্রায় পাঁচশ থেকে আটশ’ বছর। বোঝাই যাচ্ছে, আজ পর্যন্ত শুধু স্যানিটারি প্যাড ব্যবহারের ফলে পরিবেশের কতটা ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব করতে কাগজ কলমের প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে, একজন নারী একটি পিরিয়ড কাপ অনায়াসে পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারেন। ভেবে দেখুন, আপনি একা একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিবেশকে কতটা ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারেন!

ব্যবহার পদ্ধতি

পিরিয়ড কাপ তৈরি হয় নরম মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকন দিয়ে, ফলে সহজেই ভাঁজ করা যায়। এটি ভাঁজ করার কয়েক ধরনের পদ্ধতি আছে। যে কোনো একটি পদ্ধতি অনুযায়ী ভাঁজ করে একে সাবধানে যোনির ভেতর প্রবেশ করাতে হয়। ভেতরে গেলে ভাঁজ খুলে গিয়ে কাপটি স্থির হয়ে সারভিক্সের ঠিক নিচে বসে থাকে।

 

ছয় থেকে আট ঘণ্টা পরপর কাপটি বের করে শুধু পানি দিয়ে ধুয়ে আবার একই পদ্ধতিতে প্রবেশ করাতে হয়। তবে, ভুলেও এটিকে সাবান বা শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়া যাবে না। প্রতি ঋতুচক্রের শেষে ফুটন্ত গরম পানিতে ৭/৮ মিনিট ফুটিয়ে নিলেই যথেষ্ট। আবার পরের বার পিরিয়ড শুরু হলে ব্যবহার করার আগে একইভাবে ফুটিয়ে নিতে হবে।

কাপটি প্রবেশ করানো আর বের করার কাজটি প্রথমে কিছুটা জটিল বা ভীতিজনক মনে হতে পারে। ভয় না পেয়ে এবং ধৈর্য ধরে কয়েকবার চর্চা করলেই পুরো প্রক্রিয়াটি আয়ত্তে চলে আসবে।

কারা ব্যবহার করতে পারবেন

যেকোনো বয়সের নারী পিরিয়ড কাপ ব্যবহার করতে পারেন। বাজারে সাধারণত দুই আকারের পিরিয়ড কাপ পাওয়া যায়- ছোট এবং বড়। যাদের বয়স ২৫ বছরের নিচে, সন্তান জন্মদানের অভিজ্ঞতা বা যৌন অভিজ্ঞতা নেই তাদের জন্য ছোটটি সবচেয়ে ভালো।

আর যাদের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সন্তান জন্মদানের অভিজ্ঞতা আছে তারা বড়টি ব্যবহার করতে পারবেন। তবে এটি ব্যবহারের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের শরীরকে বোঝা ও জানা।

শেষ কথা

আমাদের দেশে বেশিরভাগ নারীরই যেখানে ট্যাম্পন ব্যবহারেরও অভিজ্ঞতা নেই, সেখানে পিরিয়ড কাপ দেখলে কিছুটা অবিশ্বাস, এমনকি ভয় হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু যারা এটি ব্যবহার করেছেন তারা বলেন, একবার পিরিয়ড কাপ ব্যবহার করলে কোন নারীই আর প্যাড বা ট্যাম্পনে ফিরে যেতে চাইবেন না।

একথা সত্যি যে, এর ব্যবহার রপ্ত করতে বা ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু নিজের স্বাস্থ্য আর পরিবেশকে ভালো রাখতে এতটুকু চেষ্টা খুব একটা কষ্টকর মনে হবে না।

পিরিয়ড কাপ এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ যা হতে পারে একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্তগুলোর একটি। তবে, সবার আগে নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে হবে, একে ভালোমতো বুঝতে হবে এবং সাহস করে এটি ব্যবহারের জন্য মনস্থির করতে হবে।


একাত্তর/এসজে

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন