ঢাকা ১৯ সেপ্টেম্বার ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮

'অপরাধ না করেও যদি শাস্তি পাই, মাথা পেতে নেবো'

সোহাগ আহমেদ, যাত্রাবাড়ী
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বার ২০২১ ২০:৫৫:৩৭ আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বার ২০২১ ২৩:৪৬:১৫
'অপরাধ না করেও যদি শাস্তি পাই, মাথা পেতে নেবো'

আটাত্তর বছরের বৃদ্ধ আব্দুল রশিদ, গত বছর ধরে বেঁচে আছেন কাঁধে অপহরণ মামলার প্রধান আসামীর দায় নিয়ে। ২০১২ সালে হবিগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হন জোহরা খাতুন ওরফে ফাতেমা শিমু। তার নিখোঁজের জের ধরে মৌলভীবাজার জেলার হবিগঞ্জ থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়। মামলার মূল আসামী করা হয় তখন সত্তুর বছর বয়সী আব্দুল রশিদসহ মোট চারজনকে। মামলা নং ২০(১১)২০১২।

অপহরণের ঘটনার দুইবছর পর ২০১৪ সালে, তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটির চুড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করেন। তদন্তে প্রকাশ উঠে আসে শিমুর নিখোঁজ হওয়ার সাথে মামলার আসামীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবুও বাদীর নারাজীর পরিপ্রেক্ষিতে হবিগঞ্জের ওসিকে মামলাটির পূনঃতদন্তের নির্দেশ দেন বিজ্ঞ আদালত।

২০১৬ সালে হবিগঞ্জের ওসি মামলাটির চুড়ান্ত রিপোর্ট দেন। এতেও পাওয়া যায় না আসামীদের কোনো সম্পৃক্ততা। এরপরেও বাদী নারাজী আবেদন করলে, আদালত একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্টেটকে নির্দেশ দেন জুডিশিয়াল তদন্তের। তদন্তে আব্দুল রশিদসহ দুই আসামীকে শনাক্ত করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। পরে আসামীরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হন। এভাবেই কেটে যায় আট বছর। মামলা চলতে থাকে। কিন্তু সুরহা মেলে না। ততদিনেও মেলে না নিখোঁজ জোহরার কোনো সন্ধান।

এরইমধ্যে গত ১১আগস্ট শিমুকে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে দেখা গেছে মর্মে কদমতলী থানায় একটি জিডি করেন মামলার প্রধান আসামী আটাত্তর বছর বয়সী আব্দুল রশিদ। তথ্য একাত্তরকে জানায় কদমতলী থানার অফিসার ইনচার্জ জামাল উদ্দিন মীর।

জিডির জের ধরে কদমতলী থানার ওসি সজীব (তদন্ত) দে' নেতৃত্বে সোমবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে উদ্ধারও হয় জোহরা খাতুন ফাতেমা ওরফে শিমু। কদমতলী থানাধীন ৩৫০/, হাজী আব্দুল গনি রোডের একটি বাসা থেকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

জানা যায়, বিয়ে করে দীর্ঘদিন ধরে জোহরা এই বাসাটিতে আত্নগোপন করেছিল। জীবিকার প্রয়োজনে নারায়ণগঞ্জ একটি গার্মেন্টসে চাকরী করতেন জোহরা। এখানেই শুরু হয় মামলার সত্যতা নিয়ে জটিলতা মেলা।

একাত্তরের সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে স্থানীয় দুইপক্ষের জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলাকালে প্রেমের টানে ধরে বাড়ি ছাড়েন শিমু। তবে বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের নামে মামলা ঠুকে দেয় শিমুর পরিবার। একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদনে আসামীদের বিরুদ্ধে আনা অপহরণের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া না গেলেও প্রতিবেদনে নারাজী জানায় বাদীপক্ষ। একপর্যায়ে জেল হাজতেও প্রেরণ করা হয় মামলার একাধিক আসামীকে। এদিকে, বাড়ি থেকে পালিয়ে রাজধানীতে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছিলেন নিখোঁজ শিমু।

উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাবার পর মামলার জটিলতা সামাজিক লজ্জার থেকে পরিত্রাণ পেতে আসামীরা নানান মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে শুরু করেন শিমুর সন্ধান। নানান জায়গায় খোঁজার পর অবশেষে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন ৩৫০/, হাজী আব্দুল গনি রোডের একটি বাসায় শিমুর সন্ধান পেয়ে জিডির মাধ্যমে পুলিশকে সেটা অবহিত করে মামলার মূল আসামী আব্দুল রশিদ।

মুঠোফোনে কথা হলে আব্দুল রশিদ একাত্তরকে জানায়, মিথ্যে মামলা কাঁধে করে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ক্লান্ত। এখন পর্যন্ত তিনি জানেন না, কেনই বা তাকে এই মামলার আসামী করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এই মামলার জন্য জেলে যেতে হয়েছে তাকে। গত আট বছরে চারজন আসামীর খরচ হয়ে গেছে ২০ লাখ টাকা। সামাজিক পারিবারিক মণ্ডলে মুখ দেখানোর মতো পরিস্থিতিও তাদের আর নেই।

আরও পড়ুন: চীনের একটি বিদ্যালয় থেকে নতুন করে ছড়িয়েছে করোনা 

নিখোঁজ শিমু উদ্ধার হবার ব্যাপারে তিনি বলেন, মায়ের মেয়ে মায়ের বুকে ফিরে আসছে, মায়ের কান্না আর দেখতে হবে না।

মামলা প্রসঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, আইন তো আইনের মতো চলছে। কোনো অপরাধ না করার পরেও যদি আদালত আমাকে দোষী মনে করে, এই মরার বয়সে মিথ্যে অভিযোগে শাস্তি দেয়, মাথা পেতে নেবো।


একাত্তর/এসএ

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন