মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য আপত্তি ও প্রবল চাপ সত্ত্বেও সোমবার (৮ জুন) ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মতে, এই আকস্মিক হামলার নেপথ্যে রয়েছে এক জটিল ‘লেবানন সমীকরণ’। মার্কিন মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন-তেহরান সম্ভাব্য শান্তি চুক্তিতে যেন দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক স্বাধীনতা ও সেনা মোতায়েনের অধিকার খর্ব না হয়—তা নিশ্চিত করতেই ট্রাম্পকে অগ্রাহ্য করে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
গত এপ্রিল মাসে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই প্রথম ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি বিমান হামলা চালাল ইসরাইল। এই হামলার মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, ইসরাইলের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উপেক্ষা করে ইরানের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি সফল হতে দেওয়া হবে না।
হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামরিক ইতিহাসবিদ ড্যানি ওরবাখ বলেন, এই হামলার মাধ্যমে ইসরাইল মূলত মার্কিন প্রশাসনকে এই কড়া বার্তা দিয়েছে যে, তাদের বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। চুক্তিটি যদি ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার পরিপন্থী হয়, তবে তারা যেকোনো সময় হামলার মাধ্যমে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তবে এই আলোচনা প্রক্রিয়া থেকে তিনি ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখেছেন। এমনকি আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে—এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে নেতানিয়াহুকে প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প।
এদিকে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, লেবাননেও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হলে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো শান্তি চুক্তিতে সই করবে না।
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে এক উত্তপ্ত ফোনালাপের পর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে সাময়িকভাবে বিমান হামলা বন্ধ করে দেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প পরে গণমাধ্যমের কাছে বলেন যে, ফোনালাপের সময় তিনি ইসরাইলি নেতাকে ‘একেবারে পাগল’ বলেছিলেন।
আলোচনার টেবিলে কোনো আসন না পেয়েও কেবল মার্কিন আলোচনা টিকিয়ে রাখার জন্য ইসরাইলি সামরিক পদক্ষেপ সীমিত করায় অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু। বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। এই অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দিতেই মূলত ইরানে পাল্টা আঘাতের পথ বেছে নেয় ইসরাইল।
গত রোববার লেবাননে ইসরাইলের হামলা এবং এর জবাবে ইসরাইলের ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর ট্রাম্প মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে বলেছিলেন, ওরা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে মজা করেছে। ইসরাইল তার হামলা চালিয়েছে এবং ইরানও তার জবাব দিয়েছে। আমাদের আর কোনো হামলার প্রয়োজন নেই।
তবে ইসরাইলি নীতিনির্ধারকেরা ট্রাম্পের এই ধারণার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। ইসরাইলের একজন ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্স-কে বলেন, ইসরাইল এমন কোনো পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না যেখানে লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে একটি ন্যায্য বা স্বাভাবিক ‘পাল্টা জবাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দেওয়া হবে।
ইরানে হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু শীর্ষ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন, ইসরাইলের মূল লক্ষ্য হলো এটা নিশ্চিত করা যে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো চুক্তি হলেও দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানোর এবং সেখানে সেনা মোতায়েন রাখার ইসরাইলি অধিকার যেন কোনোভাবেই খর্ব না হয়।
