ঢাকা ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯

পদ্মা সেতুর বিরোধীদের বিচার সময়ই বলে দেবে: প্রধানমন্ত্রী

ফারজানা রূপা, একাত্তর
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২২ ২১:২৩:০২ আপডেট: ২৩ জুন ২০২২ ১০:০২:৫৪
পদ্মা সেতুর বিরোধীদের বিচার সময়ই বলে দেবে: প্রধানমন্ত্রী

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে কোন প্রমাণ ছাড়াই মনগড়া দুর্নীতির অভিযোগ এনে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ানোসহ বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন ভূমিকা নিয়ে বিচারের ভার সময়ের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

বহুল প্রত্যাশার পদ্মা সেতু উদ্বোধনের ঠিক দু’দিন আগে বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় তিনি আরও বলেন, যারা এই সেতুর বিরোধিতা করেছে তাদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের অভাব ছিলো। সে সঙ্গে পদ্মা সেতু নির্মাণে সহায়তার জন্য দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন সরকার প্রধান। 

সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখে আসার ২৪ ঘন্টার মাথায় সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। চলমান বন্যা পরিস্থিতি এবং ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শাপলা হলে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।  

সরকার প্রধান সংবাদ সম্মেলন শুরু করলেন বন্যা দুর্গত মানুষদের আশ্বস্ত থাকার বার্তা দিয়ে বললেন, বন্যা যতো ভয়াবহই হোক না কেনো সরকারের সব রকমের প্রস্তুতি আছে। তিনি বলেন, বন্যা শুরু হয়েছে, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্যার ঝুঁকিটা আমাদের থাকে, পানিটা নেমে আসবে দক্ষিণ অঞ্চলে। সেজন্য আগাম প্রস্তুতি আমাদের আছে।

সিলেট অঞ্চলে এবারের ভয়াবহ বন্যার কথা তুলে ধরে সেখানে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতার বিস্তারিত বিবরণ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি আগেই নির্দেশ দিয়েছিলাম, পানি যাতে দ্রুত নেমে যেতে পারে, প্রয়োজনে রাস্তা যেন কেটে দেয়।

সিলেট অঞ্চলে এবারের বন্যাকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু এটা আমাদের মোকাবেলা করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এটা তো আর মানুষ ঠেকাতে পারে না। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে মানুষের ক্ষতিটা যাতে না হয়, সেটা আমাদের দেখা দরকার।

তিনি বলেন, অনেক দিন এরকম বন্যা হয়নি, আবার বন্যা আসলো। সেইভাবে অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। বন্যার পর কৃষক যেন কৃষিকাজ করতে পারে, সেজন্য বীজ, সারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে জানিয়ে শেখ হাসিনা কষ্ট করে যারা বন্যার মধ্যে কাজ করেছেন, সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

বন্যার পরেই আসে পদ্মা সেতু প্রসঙ্গ। আর মাত্র দু'দিন পরেই যার উদ্বোধন। তবে, এই পথ ছিলো দীর্ঘ, ষড়যন্ত্রে, চক্রান্তে মোড়ানো। যাতে দেশের সাধারণ মানুষ আর প্রকৌশলীদের সমর্থন ভরসা হিসাবে কাজ করেছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণে পাশে থাকায় দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সব ষড়যন্ত্র-প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। মানুষের শক্তিতে তিনি সব সময় বিশ্বাস করেন। তাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই পদ্মা সেতু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, ২০১১ সালে এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করা হয়। এরপর শুরু হয় ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের পেছনে কে বা কারা ছিল, তা বহুবার বলেছি।

ব্যক্তিস্বার্থে বিশেষ এক ব্যক্তির উদ্যোগে ষড়যন্ত্র শুরু হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরে আরও কয়েকজন যুক্ত হয়েছে। দুর্নাম রটানো হয়, দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। ব্যাংকের একটি এমডি পদ একজনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয় কী করে! ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের জন্য দেশের মানুষের কেউ ক্ষতি করতে পারে; এটা সত্যিই কল্পনার বাইরে ছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই ষড়যন্ত্রকারীরা ছাড়াও বিশ্বব্যাংকের অভ্যন্তরে একটি গ্রুপ ছিল, যারা অন্যায্যভাবে কিছু কিছু বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। বিশ্বব্যাংক একটি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য করার লক্ষ্যে পরোক্ষ চাপ দিতে থাকে। রাজি হইনি। এর পর থেকেই তারা পদ্মা সেতুর কার্যক্রমে বাধা দিতে থাকে। দুদক তদন্ত করে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পায়নি। পরে কানাডার আদালতেও প্রমাণিত হয়, পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি।

ব্যয় বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০১০ সালের মধ্যে নকশা চূড়ান্ত হয়। পরের বছর জানুয়ারিতে সংশোধিত ডিপিপি দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সেতুর দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার করার কারণে ব্যয় বাড়ে। এরপর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ৩৭টি স্প্যানের নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলের সুযোগ রাখা হয়েছে। 

যুক্ত করা হয় রেল সংযোগ। কংক্রিটের বদলে ইস্পাত বা স্টিলের অবকাঠামো যুক্ত হয়। পাইলিংয়ের ক্ষেত্রেও গভীরতা বাড়ে। বাড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ব্যয়। ২০১৭ সাল থেকে সরকার জমি অধিগ্রহণে জমির দামের তিন গুণ অর্থ দেওয়া শুরু করে। ২০১৬ সালে সেতুর খরচ আবার বাড়ে। ওই সময় ডলারের বিপরীতে টাকার মান ৯ টাকা কমে যায়।

নদীশাসনে নতুন করে ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার যুক্ত হয়। সব মিলে ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়ে যায়। নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হয়। সব মিলে পদ্ম সেতুর প্রকল্প ব্যয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২১ জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২৭ হাজার ৭৩২ কোটি ৮ লাখ টাকা।

যারা বিরোধিতা করেছেন, এমন একটি সেতু তৈরি করতে পারে বাংলাদেশ- তা বিশ্বাসই করতে পারেননি শেখ হাসিনা তাদের সবাইকে পদ্মা সেতু পরিদর্শনের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।

পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে যাওয়া এবং দেশে যারা বিরোধিতা করেছে, তাদের ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সময় বলে দেবে তিনি কী করবেন। তবে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।

প্রায় দুই ঘন্টার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের জবাব দেন। বলেন, এখন কেবল সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময়। সামনের দিনে দক্ষিণে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি দেখা হচ্ছে। একেকটি সেতু দিয়ে সারাদেশে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা সময়ের ব্যাপার মাত্র বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 


একাত্তর/এআর

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছাদ খোলা অভিবাদন!

ছাদ খোলা অভিবাদন!

১০ দিন ১০ ঘন্টা আগে