ঢাকা ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯

বঙ্গমাতা বিশ্বের সব নারীর জন্য দৃষ্টান্ত: প্রধানমন্ত্রী

ফারজানা রূপা, একাত্তর
প্রকাশ: ০৭ আগষ্ট ২০২২ ২১:৩৮:৫৩ আপডেট: ০৭ আগষ্ট ২০২২ ২২:০৮:২৬
 বঙ্গমাতা বিশ্বের সব নারীর জন্য দৃষ্টান্ত: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মহিয়সী নারী বঙ্গমাতার জীবন থেকে শুধু আমাদের দেশেরই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের নারীরাও এই শিক্ষা নিতে পারে যে, কিভাবে একটি দেশ ও দেশের মানুষের জন্য তিনি জীবনের সবকিছু ত্যাগ করেছেন।

রোববার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গমাতা: এ প্যারাগন অব ওমেন্স লিডারশিপ এন্ড ন্যাশন বিল্ডিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব একথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী।

৮ আগস্ট বঙ্গমাতার জন্মদিনকে সামনে রেখে বঙ্গমাতার অবদান এবং জীবন দর্শন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা সেন্টার ফর জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমমেন্ট স্টাডিজ’ দুই দিন ব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

৪৫ বছরের জীবনের প্রথম আট বছর বাদে অর্থাৎ জীবন শুরুরও আগে থেকে মরণ পর্যন্ত শেখ মুজিবের সাথে ছিলেন তার প্রিয় রেনু। এ কেবল গত শতকের শুরুর দিকে গতানুগতিক নারী পুরুষের দাম্পত্য ছিল না, শ্রদ্ধা–ভালোবাসার রসায়নে যুক্ত হয়েছিল নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার উদারতাও। যার রূপ এখনও গবেষকদের কাছে ধরা দেয় নানা উদাহরণে।


সিনেট ভবনের অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সভাপতি ও কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, তিনি আমাদের এই সময়ে খনা, এই সময়ের বেগম রোকেয়া, এই সময়ের চন্দ্রাবতী। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব জেন্ডার সমতার ইতিহাসে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব বলে মনে তিনি। 

বলেন, ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে দূরদর্শী চিন্তার বার্তা দিয়েছিলেন বেগম শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার সাহসী বার্তা তাকে ইতিহাসের মানুষ করেছে। জেন্ডার সমতার ইতিহাসে তিনি আমাদের অনুকরণীয় দৃষ্টান্তের মানুষ।

সেলিনা হোসেন বলেন, ব্যক্তি থেকে রাজনৈতিক জীবনে তিনি জেন্ডার সমতার বলয় তৈরি করেছিলেন। সবক্ষেত্রেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দুজনের পরিশীলিত জীবনের কোথাও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যে তৈরি হয়নি। 

মায়ের সাথে ১৬ বছরের ব্যবধান বড় মেয়ে শেখ হাসিনার। জন্ম থেকে মাত্র ২৯ বছর মাকে পেয়েছেন যে সন্তান, তার কাছে মায়ের মৃত্যুর ক্ষণ আবগের, স্মরণের। আর সেই চলে যাওয়ার মুহুর্ততেও সারা জীবেনর আপোষহীন, ভয়-জয় করা মাকে নিয়ে তাই গৌরবও কম নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব যে ত্যাগ ও সাহসের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা দেশ-বিদেশের বহু নারীর জন্য ‘অনুসরণীয়’।

তিনি বলেন, আমার বাবার পাশে থেকে থেকে যেভাবে তিনি (বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব) সাহস দেখিয়েছেন, আমি মনে করি আমাদের দেশের মেয়েরা শুধু না, পৃথিবীর অনেক মেয়েরাই তার জীবনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারবে, যে একজন মানুষ তার জীবনের সব কিছু ত্যাগ করেছেন একটি জাতির স্বাধীনতার জন্য, একটি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য।


১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট তখনকার রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার স্ত্রীসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে একদল ঘাতক। সে সময় বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান কেবল শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঘাতক কারা? এরা তো আমাদের বাসায় অহরহ যেত। আমার মা সবাইকে আপ্যায়ন করত। তারা ঘাতক হয়ে এল।

বঙ্গমাতার সাহসিকতা ও ত্যাগের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, যখন আমার আব্বাকে গুলি করল, আমার মা কিন্তু জীবন ভিক্ষা চায়নি। এই পরিস্থিতিতে সাধারণত মানুষ নিজের জীবন ভিক্ষা চায়। আমার মা ভিক্ষা চায়নি। মা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, উনাকে যখন হত্যা করেছ, আমাকেও হত্যা কর। তখন ঘাতকের বুলেট তাকে কেড়ে নেয়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে বঙ্গমাতার ভূমিকার কথা তুলে ধরে তাদের মেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সংসারের ব্যাপারে, রাজনীতির ব্যাপারে, প্রতিটি ব্যাপারে তিনি যে সিদ্ধান্ত যখন দিয়েছেন, সেটা যে আমাদের দেশের জন্য কতটা সঠিক, আর শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনটাও দিয়ে গেলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মায়ের জীবনে কোনো চাওয়া পাওয়া ছিল না। তিনি নিজের জন্য কোনোদিন কিছু চাননি। আমরা শুনিনি আমার আম্মা কোনো আবদার করেছেন।

দেশের জন্য সংগ্রাম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু তার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। সেই সময়টায় সংসার সামলানোর পাশাপাশি দলের আওয়ামী লীগের অনেক বিষয়েও ভূমিকা রাখতেন শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। 

ওই পুরোটা সময় যে মনোবল তিনি দেখিয়েছেন, তা তুলে ধরে তার মেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যখন বন্দি করে নিয়ে গেল সেই ১৮ নম্বর রোড বর্তমানে যেটা ৯/এ, ২৬ নম্বর বাড়ি একতলা একটা বাড়ি তার মধ্যে বন্দি করে রেখেছিল। মাটিতে আমাদের থাকতে হত, ফ্লোরে কোনো কম্বল ছিল না। কোন কিছু ছিল না। ২৪ ঘণ্টা আমরা কোনো খাবার পাইনি। আমার মাকে কোনদিন আমরা ভেঙে পড়তে দেখিনি।

সংগ্রামে এবং জাতির ক্রান্তিকালে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তাকে সাহস ও পরামর্শ যোগানোর ভূমিকাতেও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব অবিচল ছিলেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশ ও স্বাধীনতার জন্য আমার বাবার যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের সারথি ছিলেন আমার মা। সবসময় আমার মা সাহস যুগিয়েছেন। তবে দেশ ও মানুষের জন্য আমার মায়ের যে আত্মত্যাগ, তা খুব কমই উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের জন্য বাবা বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকলেও কখনই বিরক্ত করতেন না। মা বলতেন, আমি দেখবো তুমি চিন্তা করো না। সংসার সামলানোর পাশাপাশি জাতির পিতার অনেক সময়োচিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও বঙ্গমাতার পরামর্শ নিতেন। এতে আন্দোলন-সংগ্রামে গতির সঞ্চার করেছিল।

তিনি বলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকাকালে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বা মুচলেকা দিয়ে আইয়ুব খানের ডাকা গোলটেবিলে যোগ দেয়া সর্ম্পকিত দলের কতিপয় নেতার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বঙ্গবন্ধুর কাছে বার্তা পাঠিয়ে অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন বঙ্গমাতা।

‘তাঁর কথা ছিল মামলা প্রত্যাহার করতে হবে, সকল আসামীকে মুক্তি দিতে হবে, মুক্ত মানুষ হিসেবেই শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্টের (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান) সঙ্গে কথা বলতে যাবেন, বন্দি হিসেবে যাবেন না, তাঁর মায়ের এই উদ্ধৃতি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, তাঁর মা সে সময় তাঁকেই ডিক্টেশন দিয়ে জাতির পিতার কাছে (ক্যান্টনমেন্টের কারাগারে) পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁর ইশারায় বাবা কাছে এলে মা’র সেই বার্তা পৌঁছে দেন তিনি। এজন্য সে সময়ের আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতাদের থেকে তাঁর মা’ এবং তাঁকে দোষারোপ করা হয় কিন্তু তাঁর মা’র মধ্যে তখন তিনি যে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস দেখেছিলেন তা বাংলার মুক্তির সংগ্রামকে অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

৬ দফা ঘোষণার পর জাতির পিতা কারাগারে গেলে দাবী ৮ দফা করার জন্যও দলের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর মা’ ৬ দফাতেই অটল ছিলেন, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, যে ভাষণ আজকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে ইউনেস্কোর প্রামান্য দলিলে স্থান করে নিয়েছে এবং বাঙালি তাঁর মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই ভাষণ প্রদানের সময়ও তাঁর মা’র সুচিন্তিত পরামর্শ এবং জাতির পিতাকে আস্থা ও ভরসা প্রদানের উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তাঁর মা সে সময় তাঁর বাবাকে বলেছিলেন,‘তুমি সারা জীবন সংগ্রাম করেছ, এদেশের মানুষ কি চায় তুমি জান, কাজেই তোমার মনে যেটা আসে তুমি সেটাই বলবা। কারো কথা শুনতে হবে না,’ উল্লেখ করেন সরকার প্রধান ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশকে আরও ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিলো বিশ্বব্যাংক

নবগঠিত বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ উদ্বোধন করে শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার মায়ের জন্য যে সিদ্ধান্তটা নিয়েছে, সেজন্য আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের এ উদ্যোগ সফল হোক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সামাদ এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। 

বিশিষ্ট কথা সহিত্যিক এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি ড. সেলিনা হোসেন অনুষ্ঠানে ‘জেন্ডার প্রেক্ষিতে বঙ্গমাতার জীবন দর্শন’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা সেন্টার ফর জেন্ডার এন্ড ডেভেলপমমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ড. তানিয়া হক স্বাগত বক্তৃতা করেন।


একাত্তর/আরবিএস  

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছাদ খোলা অভিবাদন!

ছাদ খোলা অভিবাদন!

৪ দিন ১০ ঘন্টা আগে