ঢাকা ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বুকে লুকিয়ে থাকা আগমনীর সুরে এলো মহালয়া

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী, একাত্তর
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২২:০৯:৪৯ আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ ২২:৩৭:৫৯
বুকে লুকিয়ে থাকা আগমনীর সুরে এলো মহালয়া

এখন শরৎকাল। কাচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশ, কাশবনে শুভ্র কাশফুলের দোল, গাছের তলায় পড়ে থাকা শিউলি, ছাতিম আর ঘাসের ডগায় শিশির কণা ইতিমধ্যে জানান দিয়েছে উমা আসছেন।

শনিবার দিবাগত রাত শেষে ভোরের আলো ফুটতেই বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সেই জলদগম্ভীর কণ্ঠে ভেসে আসবে আনন্দিতা শ্যামলী মাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আহবান। কৃষ্ণপক্ষের অবসান এবং শুক্লপক্ষ বা দেবীপক্ষের সূচনা আজ, আজ মহালয়া।

পুরাণ এবং শাস্ত্রের বেশ কিছু তথ্য এবং ব্যাসদেব রচিত মহাভারতে এই দিনটিকে পিতৃপক্ষের সমাপ্তি এবং দেবীপক্ষের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই দিনটিকে কেন ‘মহালয়া’ বলা হয়ে থাকে, তা নিয়ে অবশ্য ‘নানা মুনির নানা মত’।

পুরাণে মহালয়া

মহালয় প্রসঙ্গে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে, যে ক্ষণে পরমাত্মায় অর্থাৎ পরব্রহ্মে লয় প্রাপ্তি ঘটে সেটিই হল মহালয়। কেননা, পরমাত্মাই হল পরব্রহ্ম। আর নিরাকার ব্রহ্মের আশ্রয়ই হল মহালয়।

শ্রী শ্রী চণ্ডিতে মহালয়া

শ্রী শ্রী চণ্ডিতে মহালয় হচ্ছে পুজো বা উৎসবের আলয়। এখানে আলয় শব্দটির একটি অর্থ হচ্ছে আশ্রয়। চণ্ডিতে তাই ‘মহালয়’ বলতে ‘পিতৃলোককে’ বোঝানো হয়েছে। পিতৃলোককে স্মরণের ক্ষণকেই বলা হয়েছে মহালয়া। এই সন্ধিক্ষণটিকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ ধরে ব্যাখ্যাও করা হয়েছে। বলা হয়, মহালয়া হয় অমাবস্যা তিথিতে যা উত্তরায়ণের শেষ সময়। এরপরই সূর্যের দক্ষিণায়ণ গতি শুরু হয়। যা শুভ বলে বিবেচিত নয়। কৃষ্ণপক্ষে কালিমার ক্রমশ লয় হতে হতে অমাবস্যা তিথিতে সে লয় পূর্ণতা পায়। তাই একে বলে মহালয়া।

সন্ধি বিশ্লেষণে মহালয়া

এদিকে, ‘মহালয়া’ শব্দের সন্ধি বিশ্লেষণ করলে যেমন আরেকরকম অর্থ পাওয়া যায়, তেমনই অভিধান থেকে জানা যায়, ‘মহ’ শব্দের দুটি অর্থ রয়েছে। এক, ‘মহ’ বলতে বোঝায় পুজো বা উৎসব। তা থেকে ব্যুৎপত্তি করলে হয়  মহ+আলয় = মহালয় অর্থাৎ পুজো বা উৎসবের আলয় বা আশ্রয়। আবার ‘মহ’ শব্দের আরেক অর্থ ‘প্রেত’। অর্থাৎ প্রেতের আলয় (আশ্রয়)।  সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রয়াত আত্মাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয় তাহাকে মহালয় বলা হয়। সেই মহালয় থেকে মহালয়া।

মহাভারতে মহালয়া

এবার আসা যাক মহাভারত প্রসঙ্গে। পিতামহ ভীষ্মের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে প্রাণ ত্যাগ থেকে কর্ণের মৃত্যু ও ফের পৃথিবীতে এসে পিতৃপুরুষকে অন্ন-জলের নিবেদনের কাহিনীতে এর অর্থ আলাদা। ব্যাসদেবের লিখনিতে ‘মহালয়’ বলতে ‘পিতৃলোক’কে বোঝানো হয়েছে। যেখানে বিদেহী পিতৃপুরুষের অবস্থান। সেক্ষেত্রে পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই হল মহালয়া।

শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে

শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে পিতৃপক্ষের অবসানে, অমাবস্যার অন্ধকার পেরিয়ে আমরা আলোকোজ্জ্বল দেবীপক্ষকে আগমন করি, তাই সেই মহা লগ্ন আমাদের জীবনে ‘মহালয়া’। এক্ষেত্রে দেবী দুর্গাকেই সেই মহান আশ্রয় বলা হয়ে থাকে এবং আঁধার থেকে আলোকে উত্তরণের লগ্নটিকে বলা হয় মহালয়া।


পাণ্ডিত্য শেষ। এবার আসা যাক দেশের পাড়া-মহল্লার পূজা মণ্ডপগুলোর প্রস্তুতি কেমন সেদিকটাতে। ইতিমধ্যেই সেখানে লেগেছে আনন্দের আমেজ। প্রাণে প্রাণে জ্বলছে খুশির তারা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে জম্পেশ আড্ডা। প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানোর কাজে শশব্যস্ত কারিগর ও বারোয়ারী পূজা মণ্ডপ গুলো। বলা যায়, আজ রাত থেকেই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু। ইতিমধ্যে মণ্ডপে আটচালার কাজ প্রায় শেষে হয়েছে, কাঠামে তোলা হয়েছে প্রতিমাও। 

বাঙালির স্মৃতি মেদুরতা একটি দিন

এই দিনটিতে সনাতন ধর্মের মানুষ কম-বেশি প্রায় সবাই স্মৃতি রোমন্থন করেন। হাতড়ে বেড়ান সেই শৈশব, কৈশোর, যৌবনের পুজোর দিনগুলো। আর বড়োরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন পার্বণের নাড়ু-মোয়া নিয়ে। বাড়ির মেয়েদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে তিলের নাড়ু। এবারের তিলের নাড়ু কী দাঁত ভাঙার মতো শক্ত হবে নাকি মুখে দিতেই চোখে জল চলে আসবে তা অবশ্য নির্ভর করে বাজারের গুড় বিক্রেতাটির ওপর। ভালো হলো দুর্গা দুর্গা। আর মন্দ হলে বাড়িতে বসে ওই গুড়ওয়ালার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার। 

ষষ্ঠীর সকাল থেকে শুরু করে বহু প্রতীক্ষিত অষ্টমির অঞ্জলি, মহানবমীর উচ্ছলতা আর বিজয়া দশমীর বিসর্জনের বাজনার সেই স্মৃতিগুলো আজ থেকেই দোদুল দুল খেলবে হৃদয়ে।

আর দূরের স্বজন ঘরে ফিরবে অথবা এবারেও ফেরা হবে না, মনে করিয়ে দেওয়ার দিন আজ। 


মহালয়া ও বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র

১৯৩১ সাল। একটি ভোরে আকাশবাণী কলকাতায় এক বিস্ময় ঘটে গেলো। একটি প্রভাতী সংগীতালেখ্য হয়ে উঠলো একটি জাতিসত্তার ঐতিহ্য। শুধু তাই নয়, ২০২২ সালেও যখন আকাশ সংস্কৃতি রমরমা, যখন  এ যুগে এসেও মানুষের চিন্তা-চেতনা ও রুচিবোধের বিস্তর প্রভেদ ঘটে গেছে তখনও সেই প্রাচীন যন্ত্রে রেকর্ডিং করা একটি আলেখ্যের জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং বেড়েছে। আর এই বিস্ময়টি সেদিন ‍যিনি ঘটিয়ে ছিলেন তার নাম শ্রী বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। তার জলদ গম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডিপাঠ সেই যে বাঙালি মনে আস্তানা গেঁড়েছে, আজও তা একটুও নড়চড় হয়নি। 

বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি বেতার সম্প্রচারক, নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক। পঙ্কজকুমার মল্লিক ও কাজী নজরুল ইসলামের সমসাময়িক ছিলেন তিনি।  


শেষ কথা

যে নদীর ঘাটে আগের বছর বিসর্জন দিয়ে ফিরে আসা একটি বছরের প্রতীক্ষা নিয়ে সেই ঘাটেই পিতৃ তর্পণের মাধ্যমে দেবীর আগমনী। দেবী নদীর কোল থেকে বেরিয়ে নদীর কোলে ফিরে যান। বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা আগমনীর কোনো এক হারানো সুর বার বার ফিরে আসে শরতের শিশির ভেজা শিউলি আর ছাতিম হয়ে, ফিরে আসে আশ্বিনের শারদ প্রাতে। মহালয়া যে কী পরিমাণ নস্টালজিক ব্যাপার সেটা বোধ হয় বাঙালি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। এই নস্টালজিয়া বেঁচে থাক অনন্তকাল।

এবারে এক অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এবার সারাদেশে ৩২ হাজার ১৬৮টি মণ্ডপে দুর্গপূজা উদযাপন হবে। পাঁচ অক্টোবর দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।  

দুর্গাপূজা মূলত পাঁচদিন ব্যাপ্তির পূজা হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উৎসবের সূচনা ও কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় তার সমাপ্তি হয়।


একাত্তর/এসি

মন্তব্য

নির্মল সরকার

দারুন লেখনি। অসাধারন বাচনভংগি লেখনিতে ফুটে উঠেছে।আমি তার মংগল কামনা করি। শুভ মহালয়া।

অন্তর চন্দ্র দাস

খুবই কৌতুহলমুলক এবং অসাধারন সব বিষয়বলি তুলে ধরা হয়েছে। ধন্যবাদ ৭১ টিভি কে।

Alak Bhattacharjee

তথ‍্যবহুল লেখনির জন্য লেখককে ধন‍্যবাদ।
সেই সাথে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

Nagad Ads
ছাদ খোলা অভিবাদন!

ছাদ খোলা অভিবাদন!

২ মাস ৫ দিন আগে