ঢাকা ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

নর্ডস্ট্রিমে ছিদ্র রহস্য: কাকে দোষারোপ করা হচ্ছে এবং কেন?

একাত্তর অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:২৯:৫৭ আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৭:৩০:৩৫
নর্ডস্ট্রিমে ছিদ্র রহস্য: কাকে দোষারোপ করা হচ্ছে এবং কেন?

রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ করা নর্ডস্ট্রিম পাইপলাইনে এখন পর্যন্ত চারটি ছিদ্র পাওয়া গেছে। এ ছিদ্র কীভাবে হলো, আর কে করলো তা নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা চলছে। এ নিয়ে একে অপরের ওপর অভিযোগের আঙ্গুল তুলছে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্ব। 

কাকে দোষারোপ করা হচ্ছে? 

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও দিকে স্পষ্টভাবে অভিযোগের আঙ্গুল তোলেনি কেউ, তবে বিভিন্নভাবে বিভিন্নজনের দিকে ইশারা-ইঙ্গিত করা হচ্ছে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে, নর্ডস্ট্রিমের ছিদ্র নাশকতার ফল। তবে নির্দিষ্ট কারও নামে অভিযোগ করেনি তারা। 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল বলেছেন, এটি 'খুবই স্পষ্ট' যে কে এর পেছনে রয়েছে। তবে তিনিও কারও নাম নেননি। 

রাশিয়াকে দোষারোপ করার ব্যাপারে ক্রেমলিন বলছে, রাশিয়ার ঘাড়ে দোষ চাপানো 'বোকামি'। উল্টো ওয়াশিংটনের দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়ে তারা বলছে, নর্ডস্ট্রিমে ছিদ্র হলে ইউরোপে আরও বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র। 

এদিকে, এ ঘটনাকে 'অভূতপূর্ব নাশকতা' ও 'আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস' আখ্যা দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। 

আর রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সের্গেই নারিশকিন বলছেন, অপরাধীদের লুকাতে যা যা সম্ভব তার সবকিছুই করছে পশ্চিমারা। 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউজ। 

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন জানিয়েছেন, পূর্ণ তদন্ত না করে অভিযোগের আঙ্গুল তোলার সময় এখনও আসেনি। হামলার সম্ভাবনা বা পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে নানা ধরনের জল্পনাকল্পনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। 

পাইপলাইনে হামলা কেন করা হতে পারে? 

নর্ডস্ট্রিম পাইপলাইনে প্রথম ছিদ্র আবিষ্কার হওয়ার দিনে জার্মান নৌ প্রধান ক্রিস্টিয়ান কাক বলেন, পানির গভীরে রাশিয়া যথেষ্ট সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। বাল্টিক সাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের নিচে পাইপলাইন ও সাবমেরিন ক্যাবলের অবকাঠামো রয়েছে। 

রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে নরওয়ে ও পোল্যান্ডের মধ্যেও একটি নতুন পাইপলাইন তৈরি করা হয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলটি ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

জার্মান মার্শাল ফান্ডের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টিন বারজিনা বলেন, হামলার মাধ্যমে রাশিয়া ইউরোপীয়দের ভয় দেখাতে পারে। কারণ, তারা যদি বাল্টিক সাগরের এই পাইপলাইনে ছিদ্র করতে পারে, তাহলে নতুন পাইপলাইনটিতেও তা করতে পারবে। 

তবে, সত্যি যদি নর্ডস্ট্রিমে হামলা হয়ে থাকে, তাহলে ক্রেমলিন নিয়ন্ত্রিত গ্যাজপ্রম ও এর ইউরোপীয় অংশীদারদের বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত পাইপলাইনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এর ফলে ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হারাবে রাশিয়া।  

তবে দায়ী যেই হোক, এতে ইউক্রেনের লাভ হতে পারে। রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি কিনা বন্ধ করতে অনেক আগে থেকেই ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি আহবান জানিয়ে আসছে কিয়েভ। নর্ডস্ট্রিম পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারলে তা কিয়েভের সেই দাবিকে বাস্তবের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবে। 

নর্ডস্ট্রিমে কীভাবে ক্ষতি করা হয়ে থাকতে পারে? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতির আকার ও চারটি ছিদ্রের দুরত্ব থেকে ধারণা করা যায় এগুলো ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। 

ডেনমার্ক ও সুইডেনের ভূকম্পবিদরা বলছেন, সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ছিদ্রের কাছাকাছি পানির গভীরে দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তবে এগুলো পানির ভেতরে হয়েছিলো, সমুদ্রের তলদেশে নয়। 

স্কাই নিউজকে এক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সূত্র জানায়, পূর্বপরিকল্পনা করে পানির নিচে মাইন বা অন্য কোনো বিস্ফোরক দূর থেকে বিস্ফোরিত করা হয়েছে। 

গোয়েন্দা বিশ্লেষক অলিভার বলেন, 'বড় কিছুর মাধ্যমে ওই বিস্ফোরণগুলো হয়েছে...রাশিয়া সেটি ঘটিয়ে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও সেটি করে থাকতে পারে কিন্তু আমি তাদের সেটি করার কোনো কারণ দেখছি না।' 

তিনি বলেন, রাশিয়ান গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে অনেকদিন থেকেই আহবান জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যেহেতু নর্ডস্ট্রিম কিছুদিন ধরে গ্যাস সরবরাহ করছে না তাই এখন এই কাজ করার কোনো মানে হয় না। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাণিজ্যিক বাজারে প্রাপ্য যন্ত্রপাতি দিয়ে এ হামলা হয়ে থাকতে পারে। তবে বিস্ফোরণের আকার ও নির্ভুলতা থেকে ধারণা করা যায়, যে নেই কাজ করেছে তার কাছে আরও জটিল প্রযুক্তি ছিল। 

রাশিয়া বলছে, এ ঘটনায় কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যক্তির হাত রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। 

ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ বলেন, এটা কল্পনা করা কঠিন যে কোণ রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করা হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি আর সত্বর এর তদন্ত করা প্রয়োজন। 

এদিকে, তিনটি সূত্রের কথা উল্লেখ করে মাকিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, নর্ডস্ট্রিমের যেসব স্থানে ছিদ্র হয়েছে তার আশেপাশে রাশিয়ান নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। তবে এ ব্যাপারে পেসকোভকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ওই এলাকায় ন্যাটর উপস্থিতি আরও অনেক বেশি। 

সামনে কী হতে পারে? 

রাশিয়ার অনুরোধে পাইপলাইনের ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করতে শুক্রবার বৈঠকে বসছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ইউরোপীয় দেশগুলোও নিজেদের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। 

তবে এই মুহূর্তে রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে একে অপরকে দোষারোপ করা চলতে থাকলে তা দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করেন পোলিশ থিঙ্কট্যাংক পলিটিকা ইনসাইটের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মারেক সুইরজিনস্কি। 


একাত্তর/এসজে 

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন

Nagad Ads
ছাদ খোলা অভিবাদন!

ছাদ খোলা অভিবাদন!

২ মাস ৯ দিন আগে