সবার উপর মানুষ। আর মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার আকুতিই হচ্ছে প্রকৃত সার্থকতা। কিন্তু সেই ‘আকাঙ্ক্ষা’ ও ‘সাহস’ কী সবার থাকে! নিউইয়র্কে নিজের একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানে জীবনের জয়গান গেয়ে তেমনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শিল্পী জি এইচ আরজু।
শনিবার সন্ধ্যায় উউসাইডের একটি স্কুল মিলনায়তনে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘পড়শী কাব্য’।
কোভিডের সময় নিউইয়র্কে কবি এইচ বি রিতা চলে গিয়েছিলেন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। জীবনের সব আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। অথচ তিনি বেঁচে উঠলেন অন্য একজনের অঙ্গ নিয়ে। মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়া অচেনা-অজানা একজন মানুষের অঙ্গ নিয়ে পৃথিবীর আলো বাতাসে বেঁচে আছেন এই স্কুল শিক্ষক ও কবি।
তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই শিল্পী জি এইচ আরজু নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করে দিয়েছেন মানবতার জন্য। আবৃত্তি অনুষ্ঠানে সেই অচেনা অঙ্গদানকারীর উদ্দেশ্যে লেখা এইচ বি রিতার চিঠি ‘অচিন্ত’ পাঠ করার পর সবার সামনে নিজের অঙ্গ দান করে দেয়ার ঘোষণা দেন শিল্পী।
অনুষ্ঠানে শিল্পী আরজু জানান, কবি রিতার ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্ত্রী সিসিলিয়া মোড়েলের সঙ্গে আলোচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তখন সেখানে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
এছাড়া তার আবৃত্তি অনুষ্ঠানে এমনিতেও ছিল ভিন্নতা। মিলনায়তন ভর্তি দর্শকের সামনে শিল্পী এবার আবৃত্তি করলেন নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলা ভাষার ১৪ জন কৃতি কবি, ছড়াকারের লেখা। এইচ বি রিতা ছাড়া অন্যরা হলেন তাজুল ইমাম, তমিজউদ্দিন লোদী, কাজী আতিক, শামস আল মোমিন, মনজুর কাদের, খালেদ শরফুদ্দিন, মৃদুল আহমেদ, সোনিয়া কাদের, আনোয়ার সেলিম, মিশুক সেলিম, বেনজির শিকদার, আহমেদ ছহুল এবং মামুন জামিল।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস-বিপার আয়োজনে অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সুপ্রিয়া চৌধুরী। মঞ্চসজ্জায় ছিলেন খ্যাতিমান ভাস্কর আকতার আহমেদ রাশা, তবলায় পিনাক পানি গোস্বামী, কিবোর্ডে মাসুদুর রহমান এবং বাঁশিতে ছিলেন সৌগত সরকার হিল্লোল। নিবিড়ের শব্দ ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাবিনা নীহার নীরু।
শিল্পী জি এইচ আরজু বলেন, ‘নিউইয়র্ক আমাদের প্রাণের শহর। এই শহরে আছেন অনেক মেধাবী ও কীর্তিমান বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিক। এবার আমি কেবল তাদের লেখা থেকেই পাঠ করেছি। যে কারণে অনুষ্ঠানের নাম দেয়া হয়েছিল ‘পড়শী কাব্য’। এই অনুষ্ঠানটিতে কথা, কবিতা ও গানে ভিন্নতা রয়েছে। সবার ভালো লেগেছে জেনে আমরাও আনন্দ হচ্ছে’।
একই সঙ্গে শিল্পী নিজের অঙ্গ দান করার প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। শিল্পী জানান, তার ইচ্ছা আছে মৃত্যুর পর তার গোটা দেহই দান করে দেয়ার। এ বিষয়ে তিনি খোঁজ খবরও নিচ্ছেন বলে জানান।
এদিকে অনুষ্ঠান শেষে শিল্পীদের হাতে ফুলেল শুভেচ্ছা তুলে দেন বিপার অন্যতম দুই উদ্যোক্তা এ্যানি ফেরদৌস ও সেলিমা আশরাফ। পরে সেলিমা আশরাফ উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, নিউইয়র্কে বাংলা শিল্প সংস্কৃতি চর্চা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তা আমাকে আশাবাদী করে। এমনকি কবিতার অনুষ্ঠানেও উপচে পড়া দর্শকদের উপস্থিতি দেখে মনে হয়, যেকোনো ভালো উদ্যোগে আমরা অনেক মানুষকে সঙ্গে পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও পাবো।
একাত্তর/এসজে