জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা বাড়ার কারণেও বাড়ছে ডলার সঙ্কট। এমনটিই বলছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি। সংস্থাটি আরো বলছে, দেশে গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলেও উত্তোলনে পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রগতি নেই। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনেও নেই প্রত্যাশিত অগ্রগতি।
২০২৫ সালের মধ্যে ৪৬টি গ্যাস কূপ খননের সরকারি সিদ্ধান্ন্তের পর এখন পর্যন্ত মাত্র ৮টি কূপ খনন হয়েছে। এমন অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ ঠিক রাখতে গ্যাস আমদানিকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। অপরদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার আমদানিও বাড়ছে। এসব কারণে ডলার সংকট বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে ত্রৈমাসিক সংবাদ সম্মেলনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ-সিপিডি।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, বলেন, আমরা ঋণ করে এলএনজি আমদানি করছি ছয় মাসের জন্য। এমনিতেই আগের পেমেন্ট দিতে পারছি না। তার ওপর উচ্চহারে সুদ নিয়ে নতুন করে ঋণ। সেগুলোর পেমেন্টের আর্ডেন আগেরগুলোর ওপর যুক্ত হবে। আগে নিয়েছি। আবার ঋণ নিচ্ছি। তার উপর সুদ বাড়ছে। চাপ বেড়েই চলছে। এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হচ্ছে অভ্যন্তরীণ গ্যাসকূপ খনন করা।
এদিকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি আমদানির চাপ না থাকলেও এই খাতের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। এই বিদ্যুৎ গ্রিডে নিতে সঞ্চালন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন জরুরি বলেও জানান তিনি।
সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া দেশে নবায়ন যোগ্য জ্বালানির এই যে বিপুল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আমরা দেখতে পাচ্ছি, এখান থেকে ফসল তুলে আনা অসম্ভব হতে পারে।
আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি তুলে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে দাম নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয়ার আহবানও জানান তিনি।
সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহকারীদের কাছে ৯৭ কোটি মার্কিন ডলার বকেয়া পড়েছে বাংলাদেশের। জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি বাবদ বিপিসি ও পেট্রোবাংলার কাছে এই অর্থ পাবে বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উপর প্রতিবেদন ‘পরিবর্তনের পথে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাত’ প্রকাশ উপলক্ষে ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েটস হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমদানি প্রবণতার কারণে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বকেয়া বাড়ছে। পেট্রোবাংলা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইটিএফসি) কাছে ছয় মাসের জন্য ৫০ কোটি ডলার সিন্ডিকেট ঋণ নিচ্ছে। সিন্ডিকেট ঋণ সাময়িক সময়ের জন্য স্বস্তি মনে হলেও বিপদ বাড়াবে। কারণ তখন সুদও দিতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এক সময় উদ্বৃত্ত ছিল, এখন বাহুল্য হয়ে গেছে। ৫১ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বেকার পড়ে থাকছে যা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। পাশাপাশি পুরাতন বিদ্যুৎকেন্দ্রর চুক্তি নবায়ন করা উচিত হবে না। বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। কার্যক্রমের অগ্রগতি ধীর।
সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে এলএনজি আমদানি নীতি সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির চুক্তি করা হয়েছে। আরও দু’টি এফএসআরইউ (ফ্লোটিং গ্যাস রি-গ্যাসিফিকেশন ইউনিট) স্থাপনের চুক্তি করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য নতুন করে ২০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দিকে জোর দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ সংক্রান্ত রিপোর্টে বলা হয়, বিদ্যুতের সবচেয়ে কম ব্যবহার হচ্ছে ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলে। তবে গত ৩ মাসে এসব অঞ্চলেই বেশি লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ঘাটতি নয়, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণেও লোডশেডিং বেড়েছে। গত জুনে সঞ্চালন সমস্যার কারণে প্রায় ২৪১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন থাকে। আগস্টে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিলো ৫০১৬ ঘণ্টা।