ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে ডলার সংকট কিছুটা কমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগের তুলনায় বেশি ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারছেন আমদানিকারকেরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই–নভেম্বর) ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা বেড়েছে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ। একই সময়ে শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি উভয়ই বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। আর মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি—৩২ শতাংশেরও বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা হয়েছিল ২৫৮ কোটি ২৬ লাখ ডলারের। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮৫ কোটি ৪৭ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা বেড়েছে ২৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলার।
তবে একই সময়ে ভোগ্যপণ্যের এলসি নিষ্পত্তি কিছুটা কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে যেখানে ২৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, সেখানে চলতি অর্থবছরে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৪১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের। অর্থাৎ ২ কোটি ৯ লাখ ডলার কম এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলার সংকট কমে আসায় ভোগ্যপণ্যের এলসি খোলা সহজ হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারেও পড়েছে। আমদানি বাড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রেও এলসি বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে শিল্পের কাঁচামালের এলসি খোলা হয়েছিল ১ হাজার ২৫ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৯ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ ৪ কোটি ২৯ লাখ ডলারের এলসি বেশি খোলা হয়েছে।
একই সময়ে শিল্পের কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তিও বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে যেখানে ৯৬৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল, চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬৯ কোটি ৪৩ লাখ ডলারে। অর্থাৎ ৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের এলসি বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলার ক্ষেত্রে। গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি খোলা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ কোটি ১০ লাখ ডলারে। এতে এক বছরে এলসি খোলা বেড়েছে ২২ কোটি ২ লাখ ডলার, যা শতাংশের হিসাবে ৩২ দশমিক ২২ শতাংশ।
তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে চিত্র উল্টো। গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ৮৯ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৭৪ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের। অর্থাৎ ১৫ কোটি ২ লাখ ডলারের এলসি কম নিষ্পত্তি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত সরকারের আমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় কম গুরুত্বপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যের আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। এখন প্রবাসী আয় বাড়ায় এবং ডলার সংকট কমে আসায় এলসি খোলার ক্ষেত্রে আরও ছাড় দেওয়া প্রয়োজন, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।