দীর্ঘদিনের সঙ্কটে নিমজ্জিত পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত হলো রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’। এর নেতৃত্বে আসছেন অভিজ্ঞ আমলা ও খ্যাতিমান প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা ফেরানোর এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এক নতুন মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেয়। এর অংশ হিসেবে আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর আওতায় সংকটাপন্ন পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক—রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় আনা হয়।
এ পরিস্থিতিতে গত ৯ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এসব ব্যাংকের একীভূত রেজল্যুশনের মাধ্যমে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ নামে নতুন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে পাঁচ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক এই পাঁচ ব্যাংককে অকার্যকর ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ৯ নভেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অনাপত্তিপত্র ও লেটার অব ইনটেন্ট জারি করে। শর্ত অনুযায়ী ব্যাংকটি আরজেএসসি-তে নিবন্ধিত হয়। নতুন ব্যাংকের ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার ইতিমধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।
৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়। একই সঙ্গে সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আয়ুব মিয়াকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মূলধনের দিক থেকে এটি দেশের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। ডিপোজিট সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ১০০% সুরক্ষিত এবং একীভূতকরণ প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুতই পরিশোধ করা হবে। এছাড়া দুই লাখ টাকার বেশি আমানতের পরিশোধ পরিকল্পনা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
নতুন ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় তত্ত্বাবধানে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি একটি আধুনিক, গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই একীভূতকরণ দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও স্থিতিশীল, টেকসই ও জনগণের আস্থার জায়গা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
নতুন চেয়ারম্যানের পরিচিতি:
ড. মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া যাকাত ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, নীতি ও প্রশাসনিক সংস্কার, কৃষি, খাদ্য ও শিল্পনীতির সংস্কার, এসএমই উন্নয়ন, ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স পরিচালনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং দারিদ্র্য নিরসন কৌশল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
ড. মিয়া দীর্ঘ ৩০ বছর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে কর্মরত থেকে অত্যন্ত সফল ও বর্ণিল কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন। তিনি সরকারের ১৫টি মন্ত্রণালয় ও সংযুক্ত দপ্তরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অবসরের আগে তিনি খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।
তিনি ইউনিলিভার বাংলাদেশ, রেকিট অ্যান্ড বেঙ্কিজার, শিল্প ব্যাংক, অ্যাটলাস বাংলাদেশ, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ স্টিল মিলস করপোরেশন, বিএসসিআইসি এবং ট্রিপল সুপার ফসফেট কোম্পানিসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ডিরেক্টরসে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর তিনি গত ১২ বছর ধরে সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টের (সিজিএম) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সিজিএম একটি অলাভজনক দাতব্য সংস্থা, যা যাকাত প্রচার ও দারিদ্র্য নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক যাকাত বাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করে।
ড. মিয়া দ্য ইবনে সিনা পলিমার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড (দ্য ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালের ইন্ডাস্ট্রি পিএলসি-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান) পরিচালক এবং দ্য ইবনে সিনা ট্রাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
ড. মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং জন প্রশাসনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার থেকে অর্থনীতি ও সামাজিক গবেষণায় উচ্চতর ডিপ্লোমা লাভ করেন। পাশাপাশি বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সিভিল সার্ভিস কলেজ লন্ডনে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সুইজারল্যান্ড, চীন ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থার (ডব্লিউআইপিও) সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন।
ড. মোহাম্মদ আয়ুব মিয়া ১৯৫৪ সালের দুই ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন।