রাজধানীতে নাশকতা ঘটতে পারে এমন গোয়েন্দা তথ্য র্যাবের কাছে ছিলো। কিন্তু কোথায় ঘটবে, তা নিশ্চিত করে জানা কঠিন ছিলো বলে জানিয়েছেন র্যাবের মহাপরিচালক এম. খুরশীদ হোসেন।
শুক্রবার রাজধানীল গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়ার নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাবে র্যাবের মহাপরিচালক খুরশীদ হোসেন এ কথা বলেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শনিবার রাজধানীর মিরপুর কলেজে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন র্যাবের মহাপরিচালক। পরে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে কলেজ মাঠে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিলো যে এ ধরনের নাশকতা হতে পারে। কিন্তু কোথায় নাশকতা ঘটানো হবে, তা নিশ্চিত করে জানা কঠিন ছিলো। নাশকতার জন্য বিএনপি-জামায়াত ভোট বর্জন করলেও মানুষ নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন। সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। গতকাল রাতে ট্রেনে কারা আগুন লাগিয়েছে, সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা যাবে না। এ বিষয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধান চলছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা গতকাল (শুক্রবার) তিনজনকে আটক করেছি। তাদের কাছে পেট্রোল বোমা পাওয়া গেছে ২৮টি, ককটেল পাওয়া গেছে ৩০টি। তাদের আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’
বিএনপি-জামায়াতসহ সমমনাদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল শুরুর আগের রাতে শুক্রবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গোপীবাগে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে দুই নারী, এক শিশুসহ অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে অনেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শুক্রবার রাতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ নবী উল্লাহ নবীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বেনাপোল এক্সপ্রেসের ওই আগুন যে পুরোটাই পরিকল্পিত তা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য কাজী মোহাম্মদ মনসুর আলম।
গোয়েন্দা পুলিশকে তিনি জানান, বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেওয়ার আগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনামের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি একটি বৈঠক হয়।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ১৭ মিনিটের ওই বৈঠক হয় শুক্রবার বিকেল ছয়টা ২ মিনিটে। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয় ট্রেনে আগুন দেওয়ার। সিদ্ধান্ত হওয়ার পর নাশকতার দায়িত্ব দেওয়া হয় একজনকে। এরপর রাত ৯টা ৫ মিনিটে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মহাপরিচালক বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন করার অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় করে র্যাব পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সবাই যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য র্যাব প্রস্তুত রয়েছে। ইতিমধ্যে সারা দেশে র্যাবের সব ইউনিট স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে টহল শুরু করেছে, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। গুজব প্রতিরোধে সাইবার জগতে নজর রাখছে র্যাব। র্যাবের সুইপিং দল, ডগ স্কোয়াড, বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট কাজ করছে। বিশেষ প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য র্যাবের হেলিকপ্টার প্রস্তুত রয়েছে। টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রস্তুত রয়েছে।
র্যাবের ডিজি আরও বলেন, র্যাবের ডিভাইস ‘ওআইভিএস’ ব্যবহার করা হচ্ছে। এক এলাকার ভোটার ব্যতীত অন্য এলাকার বহিরাগত আসতে চাইলে তাকে যেন আইডেন্টিফাই করা যায়। আমরা এ ব্যবস্থা রেখেছি যাতে করে বহিরাগতরা ভোট সেন্টারে প্রবেশ করতে না পারে।
তিনি বলেন, র্যাব তৎপর থাকবে, যাতে এক এলাকার মানুষ এলাকায় ভোট দিতে বা নাশকতা ঘটাতে না পারে। যৌক্তিক কোনো কারণ ছাড়া এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকায় যেতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন নেওয়া ব্যক্তিরাই শুধু মোটরসাইকেল চালাতে পারবেন।
তিনি আর্র বলেন, বিএনপি-জামায়াতসহ কিছু দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার রয়েছে ভোট দেওয়া কিংবা না দেওয়া। কিন্তু তারা যদি ভোট দিতে বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন, সেটা হবে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক। যারা এই বেআইনি কাজ করবেন, তাদের কঠোর হস্তে দমন করবে র্যাব।
র্যাবের মহাপরিচালক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে গত নির্বাচনের পর ক্যাপিটল বিল্ডিং হামলা হয়েছে, ভারতেও নির্বাচনের সময় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সহিংসতা হয়, লোক মারাও যায়।
২০১৪ ও ২০১৮ সালের তুলনায় এবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো বলে উল্লেখ করেন র্যাবের মহাপরিচালক।
র্যাবপ্রধান বলেন, র্যাব নির্বাচনে তিনটি পর্যায়ে (ফেজ) দায়িত্ব পালন করছে। নির্বাচন পূর্ববর্তী পর্যায় আজ শেষ হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগামীকাল ভোটকেন্দ্র ও কেন্দ্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; নিরাপদে ভোট দিয়ে মানুষ যাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা। তৃতীয় পর্যায় হলো নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। অনেক সময় বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সহিংসতা হয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে র্যাব।