ভালো কাজ করলেই মিলছে একবেলা খাবার!

আপনাদের অন্তত প্রতিদনি একটি ভালো কাজ করা লাগবে...একটি করে ভালো ভালো কাজ করবেন, তার বিনিময় আমরা একবেলা খবার দিবো এখান...আর যদি নাও করে থাকেন, তাহলে আপনারা খাওয়ার পরে একটা ভালো কাজ করবেন...এজন্য আপনারা দায়বদ্ধ থাকবেন’। 

হ্যাঁ! রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় এক স্বেচ্ছাসেবক হ্যান্ডমাইকে এভাবেই জানাচ্ছিলেন, ভালো কাজের পুরস্কার নগদেই পাওয়া যায়। আর তাদের ভালো কাজের পুরস্কার হলো, এক বেলা খাবার। একটু অভিনব শোনালেও, ভালো কাজের বিনিময়ে প্রতিদিন রাজধানীতে সহস্রাধিক মানুষের মুখে এক বেলার আহার তুলে দিচ্ছে ‘ভালো কাজের হোটেল’ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। 

ছবিতে যাদের দেখা যাচ্ছে তাদের কেউই স্বচ্ছল বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা নয়। তারা একে অপরকে চেনেনও না। তবে তাদের সবার একটা জায়গায় দারুণ মিল। তারা সবাই কম করে হলেও একটি ভালো কাজ করেছেন, কিংবা করবেন বলে কথা দিচ্ছেন। তার বিনিময়েই পাতে মিলছে বিনা টাকায় এক বেলার খাবার।  

দিনে একটি মাত্র ভালো কাজ করলেই প্রতিদিন নগরীর পাঁচ জায়গায় মিলছে দুপুরের খাবার। মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহ জোগাতে ২০১৯ সাল থেকে প্রতিদিন বারোশ’ থেকে তেরশ’ মানুষকে খাওয়ানো শুরু করেন একদল তরুণ। যদিও সাত বন্ধু মিলে ‘ভালো কাজের হোটেল’ উদ্যোগটির যাত্রা আর দশ বছর আগেই। 

রাজধানীতে প্রতিদিন দশটি জায়গায় ভালো কাজের বিনিময়ে খাবার দিচ্ছেন তারা। কাওরান বাজার, সাত রাস্তা মোড়, বনানী কড়াইল বস্তি, কমলাপুরসহ আরও কিছু স্থানে। বেলা ১২টার মধ্যেই আসতে শুরু করে খাবার খেতে আসা মানুষগুলো, দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যেই খাবার নিয়ে চলে আসে পিকআপ ভ্যান। 

তারপর সবার নাম নিবন্ধন এবং কে কি ভালো কাজ করেছে সেটাও লিখে রাখা হয়, পরে তাদেরকে খাবার দেয়া হয়। ভালো কাজ করলেও মিলছে খাবার। তবে এক্ষেত্রে কথা দিতে হবে ন্যুনতম একটি ভালো কাজ করতে হবে। ভালো কাজে মানুষকে অনুপ্রাণিত করতেই তৈরি হয়েছে এই 'ভালো কাজের হোটেল'।

এই হোটেলে খেতে আসা অতিথিদের তিথিদের কাছ থেকে পাওয়া গেলো বিচিত্র ভালো কাজের উদাহরণ। কেউ হয়তো ব্যাগ বহন করে দিয়েছেন, কেউ হয়তো রাস্তায় থাকা ময়লা কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলেছেন। এমনকি রাস্তায় পড়ে যাওয়া কোন বস্তুকে রিকশা বা যানবাহনের যাত্রীকে তুলে দিয়েছেন। 

শুধু কী তাই, কেউ হয়তো অসুস্থ ব্যক্তিকে রাস্তা পার করে দিয়েছেন, অচেনা ব্যক্তিকে পথ চিনিয়ে দিয়েছেন কিংবা গাড়ি ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিয়েছেন। আবার, টাকা পয়সা দিয়ে কাউকে সাহায্যও করেছেন। কেউ বা কথা দিচ্ছেন ভালো কাজ করাও। তবে সবাই এক বাক্য বললেন, খাবারের মান ভালো।

এসব ছিন্নমূল মানুষের ভালো কাজগুলোকে সাধারণ মনে হতেই পারে। কিন্তু এই সাধারণ কাজগুলোকে অসাধারণ করে তোলার মূল কারিগর আরিফুর রহমান। তিনি 'ভালো কাজের হোটেল'-এর মূল উদ্যোক্তা। আর তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ থেকে। 

অমর এই লেখকের 'সবুজছায়া' নাটকের একটি চরিত্র প্রতিদিন একটি ভালো কাজ করতেন। সেই চরিত্রে অভিনয় করতেন জাহিদ হাসান। ছোটবেলায় দেখা সেসব দৃশ্যে মনে গেঁথে রেখেছিলেন আরিফ। বড় হয়ে বন্ধুরা মিলে শুরু করে দিলেন ‘ভালো কাজের হোটেল’। 

তাদের সংগঠনের নাম ইয়ুথ ফর বাংলাদেশ। বন্ধুরা অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েই শুরু করেন ভালো কাজের হোটেল। এই হোটেলের খাবারের তালিকায় ডিম-খিচুড়ি, ভাত-সবজি-ডিম কিংবা মাছ থাকে। শুক্র এবং শনিবারে অতিথিদের পরিবেশন করা হয় মুরগির বিরিয়ানি।

পৃথিবীতে সবচেয়ে যন্ত্রণাকর হলো ক্ষুধার কষ্ট! এই ক্ষুধার যন্ত্রণার কারণে অসংখ্য মানুষ খারাপ পথ বেছে নেয়। এ বিশ্বাস নিয়েই চলছে সংগঠনটি। তাদের সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার ব্যাপার হলো সারাদিন পরিশ্রম শেষে যখন তাদের খাবার তৃপ্তি সহকারে খাওয়ার পর মানুষের হাসি মুখ।