ডাকাতি চেষ্টার পেছনে তিন বন্ধুর আসল কারণ কী?

স্বচ্ছল পরিবার, তারপরও আইফোন কিনে দিতে চায়ননি বাবা-মা। কিন্তু ছেলে আইফোন লাগবেই। তাই, আইফোন কেনার প্রলোভন থেকেই কেরাণীগঞ্জে ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করে দুই কিশোর। গ্রেপ্তার সিফাত আর আরাফাতকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে এমন তথ্য। 

পুলিশ বলছে, দুই কিশোরই স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। অল্প বয়সেই তাদের স্মার্ট ফোন দিতে চায়নি পরিবার। আর সে কারনেই ব্যাংক ডাকাতির মতো দুর্ধর্ষ ঘটনায় জড়ায় তারা। একমাসে ধরে পরিকল্পনা আর ব্যাংক এলাকায় নজরদারির পর তারা জিনজিরার রপালী ব্যাংক ডাকাতি করতে যায়। 

ঢাকার উপকণ্ঠে কদমতলীর খালপাড় এলাকা। সেখানেই দেখা যায় পাশাপাশি পাঁচতলা বাসার দুটি সিফাত আর আরাফাতদের। যারা বৃহস্পতিবার কেরাণীগঞ্জের জিনজিরার রপালী ব্যাংক ডাকাতি ও প্রায় চারঘন্টার শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি ঘটনার নায়ক। শুক্রবারও ছুটির দিনও এই ঘটনা ছিলো তুমুল চর্চার বিষয়। 

আরাফাত ও সিফাতের পরিবার বলছে, মাসখানেক ধরেই আইন ফোন কেনার বায়না ধরেছিলো তারা। কিন্তু পরিবার এই বয়সেই সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিতে চায়নি। বড় হলে কেনার প্রতিশ্রুতিও দেন তারা। কিন্তু এ কারণে তারা ব্যাংক ডাকাতির মতো এমন ঘটনা ঘটাবে, এমনটা তাদের ভাবনারও অতীত। 

আরাফাতদের বাসার ভাড়াটিয়া বাইশ বছরের যুবক নিরব। প্রতিদিন আরাফাত আর সিফাতদের সাথে ফুটবল খেলতো। এলাকাবাসী বলছে নিরবের প্রলোভনেই হয়তো তারা এমনটা ঘটিয়েছে। আরাফাত ও সিফাতের থেকে বয়সে বড় নিরব, তাই তার কথাই শুনতো বেশি। নিরবকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যাবে। 

দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজাহারুল ইসলাম বলেন, যদিও তাদের বিরুদ্ধে অতীত কোন অপরাধের ইতিহাস নেই। তারপরও পুরো ঘটনা পরিকল্পিত। দীর্ঘ সময় নিয়ে পরিকল্পনা করে ব্যাংক এলাকায় রেকি করে তারপর তারা ডাকাতির চেষ্টা করেছে। যা সিনেমার গল্পও হার মানায়।  

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) আহম্মদ মঈদ বৃহস্পতিবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ চুনকুটিয়া জিনজিরা শাখার রূপালী ব্যাংকে ডাকাতির চেষ্টা করেন তিন কিশোর। আটক করার পর তাদের হাতে ১৮ লাখ নগদ টাকা ও চারটি খেলনা পিস্তল ও দুটি দেশীয় ছুরি পাওয়া যায়। ডাকাতরা মুভি দেখে এমন একটি অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে ডাকাতি করতে আসে বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।

তিনি বলেন, এক কিডনি রোগীকে সাহায্য করতে ১৫ লাখ টাকা প্রয়োজন ছিলো। এ কারণে তারা ব্যাংকে ডাকাতি করতে যায়। বাকি তিন লাখ টাকা দিয়ে আইফোন কেনার কথা জানায় তারা। তবে তারা যে রোগীর ঠিকানা দিয়েছে, সেটি যাচাই-বাছাই চলছে। আদৌ সত্য কি না, তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।

আটক তিন ডাকাত ছাড়া বাইরে তাদের কোনো সদস্য ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের তিনজন ছাড়া বাইরে কেউ ছিল না। তবে তারা প্রাথমিকভাবে আমাদের বলেছিলেন বাইরে তাদের লোক আছে। তারা পুলিশকে ভয় দেখানোর জন্য বলেছিলেন তাদের আরও লোক আছে।

আত্মসমর্পণের পর তাদের আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এই তিনজনের মধ্যে একজনের নাম লিয়ন মোল্লা নিরব (২২)। অন্য দুজন কিশোর আরাফাত ও সিফাত (১৬) । তিনজনই স্থানীয় বাসিন্দা। নিরবের কাছে পাওয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে জানা যায়, তার নিজ জেলা গোপালগঞ্জ।

বৃহস্পতিবার বেলা দুটার দিকে ব্যাংকের ভেতরে ডাকাত দল হানা দেয়ার খবর পেয়ে এলাকাবাসী জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে ব্যাংকে ডাকাত দলের প্রবেশের বিষয়টি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জানানো হয়।

এ সময় এলাকাবাসী ব্যাংকটির চারপাশ ঘেরাও করে প্রবেশের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। খবর পেয়ে প্রথমে পুলিশ, র‍্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে যায়। বিকেল ৪টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। তারা ব্যাংকটির আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে।

ব্যাংকে ডাকাত দলের হানা দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উৎসুক জনতা সেখানে ভিড় করে। নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যাংক-সংলগ্ন মূল সড়কের উভয় পাশের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে আত্মসমর্পণ করেন তিনজন। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।