আগুনে সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনের যেসব তলায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে বাংলাদেশ সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনে আগুনের ঘটনায় রীতিমতো হতভম্ব সবাই। দিনভর আলোচনার তুঙ্গে ছিলো এই আগুনের ঘটনা বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটে ভবনটিতে আগুন লাগে। ছয় ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস।

সচিবালয়ে আগুনের ঘটনা তদন্তে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব খালেদ রহীমকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুই কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

সচিবালয়ের মতো সুরক্ষিত স্থানে আগুনের এই ঘটনা সবাইকে উদ্বিগ্ন করেছে বলে জানালেন দুর্যোগ ও ত্রাণ উপদেষ্টা। আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে সাত নম্বর ভবনের ছয়, সাত ও আট তলার বেশিরভাগ কক্ষ। দিনভর বিচ্ছিন্ন ছিল সচিবালয়ের বেশ কটি ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ। এতে বিঘ্নিত হয়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।

fire-2

বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে সচিবালয়ে গিয়ে দেখা গেলো, পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সাত নম্বর ভবনটির আটতলার কক্ষগুলো। যেখানে ছিলো স্থানীয় সরকার, সড়ক পরিবহন, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর। মধ্যরাতের পর ছয়তলায় আগুনের সূত্রপাত হলেও ছড়িয়ে পড়ে ওপরের সাত ও আটতলায়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। আগুনে মূলত ছয়, সাত ও আটতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অফিসের নথিপত্র, কম্পিউটার, আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

সব সময় সচিবালয়ের ভেতরেই আগুনের নেভানোর একটি ইউনিট থাকায় ঘটনার প্রায় সাথে সাথেই কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। আগুনের ভয়াবহতা বাড়ায় একে একে যোগ দেয় ১৯টি ইউনিট। ফায়ারসার্ভিসের গাড়ি সহজে চলাচল করতে না পারায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লেগেছে বলে জানান দুর্যোগ ও ত্রাণ উপদেষ্টা। বলেন, প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে হঠাৎ এই আগুন উদ্বিগ্ন করেছে সবাইকে।

রাতের আগুনের পর সকাল থেকেই বন্ধ ছিলো সচিবালয়ের প্রবেশের পাঁচটি গেট। ১০টা নাগাদ একটি খুলে দেয়া হলেও, প্রবেশের অনুমতি পান শুধু কর্মকর্তা আর কর্মচারীরা। ভেতরে ঢুকতে না পেরে সচিবালয়ের সামনে অবস্থান করছেন তাঁরা। পরে এক এক করে ভেতরে ঢুকতে হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

নিরাপত্তার স্বার্থে সাত নম্বরসহ সচিবালয়ের কয়েকটি ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। এ সময় বন্ধ ছিল লিফটগুলোও। এতে ব্যাহত হয় প্রশাসনের প্রাণ কেন্দ্রের স্বাভাবিক দাপ্তরিক কাজ। দুপুরের পর বের হয়ে আসেন অনেকেই। এ সময় অফিস ছুটি দেয়ার দাবিও জানিয়েছিলেন অনেকে।

fire-6

সাত নম্বর ভবনে লাগা আগুন প্রায় ছয় ঘণ্টা পর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে এ সময় পুড়ে গেছে ভবনটির ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম তলা। এরমধ্যে সবার উপরে অষ্টম ও নবম তলায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথিপত্রই পুড়ে গেছে বলে ধারণার কথা জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল।

সচিবালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাত নম্বর ভবনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ও এই মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ; অর্থ মন্ত্রণালয় ও এর অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় ও এর স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও এর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দফতর রয়েছে।

ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে: ফায়ার সার্ভিস

fire-5

প্রায় ৬ ঘণ্টা জ্বলার পর বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এর আগে বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুনের খবর জানায় ফায়ার সার্ভিস। সংস্থাটি বলছে, খবর পেয়ে ১টা ৫৪ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

রাতভর জ্বলা আগুনে ভবনটির ছয়, সাত, আট ও ৯ তলা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালকের (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানান।

ডিজি জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণে তাদের ২০ ইউনিট ও ২১১ ফায়ারকর্মী কাজ করেছে। তবে জায়গা সংকটের কারণে ১০টি ইউনিটই সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পেরেছে। এখন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ভেতরের বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে।

মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, ছয় তলা ও সাত তলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া বেশিরভাগ তলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ লাইন দিয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। আগুনের উৎস এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানান, সর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে। তারপরও আমরা নিশ্চিত না হয়ে এ বিষয়ে কিছুই বলতে চাই না।

পানির কোনও সংকট ছিলো না, দাবি করে ডিজি বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগলেও পানির কোনও সংকট ছিল না। পাশেই ওসমানি মিলনায়তন থেকে পানি পেয়েছি। ওয়াসার গাড়ি পানি দিয়ে গেছে। কিন্তু সচিবালয়ের কক্ষগুলো আবদ্ধ ও গ্ল্যাস লাগানো থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লেগেছে।

সচিবালয়ে আগুন নাশকতা কিনা, আগেই বলা যাবে না: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

fire-4

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, সচিবালয়ের সাত নম্বর ভবনে আগুনের ঘটনাটি ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা, কিংবা এর পেছনে নাশকতা আছে কিনা; সেটা তদন্তের আগে বলা যাবে না। এ ঘটনা তদন্তের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সচিবালয়ের মতো এত সুরক্ষিত একটা জায়গায় কীভাবে আগুনের ঘটনা ঘটলো, এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, অ্যাক্সিডেন্ট (দুর্ঘটনা) তো সব জায়গায় হতে পারে। এজন্য তো এক্সিডেন্ট বলে। সচিবালয়ে হতে পারে বলেই তো ভেতরে তো (ফায়ার সার্ভিসের) গাড়ি রাখা হয়। প্রাথমিকভাবে নাশকতা মনে করছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে আমরা বলতে পারবো না। ইনভেস্টিগেশনের পরে বলতে পারবো।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে ১টা ৫০ মিনিটে ছয় তলায় আগুন লাগে। ১টা ৫২ মিনিটে খবর দেওয়া হয়। ১টা ৫৪ মিনিট থেকে ফায়ার সার্ভিস তাদের কাজ শুরু করে। সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে।

fire-3

আগুন অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্র: আসিফ মাহমুদ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ এবং সচিবালয়ের দুর্নীতির তথ্য নিশ্চিহ্ন করতে সচিবালয়ে আগুন দেওয়ার মাধ্যমে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে এক পোস্টে তিনি এই দাবি করেন।

আসিফ মাহমুদ লেখেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থলোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এখনও জানা যায়নি। আমাদেরকে ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না।

fire

অগ্নিকাণ্ডের কারণে তিনি তার উত্তরবঙ্গের কর্মসূচি স্থগিত করে সকালে ঢাকায় ফিরে আসার পর সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের স্থল পরিদর্শন করেন উপদেষ্টা।

ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, আমাদের ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে, তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থ লোপাট, দুর্নীতি নিয়ে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছিলেন। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল।

আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি উল্লেখ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও আগুনের কারণ খুঁজতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক তদন্ত কমিটির নির্দেশ দিয়েছেন উপদেষ্টা।