একটি স্বাস্থ্য কার্ড চান জুলাইয়ে পা হারানো শাহ আলম

গত বছরের ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় পায়ে গুলিবিদ্ধ হন রাজধানীর শনির আখড়ার টাইলস মিস্ত্রি শাহ আলম। বাম পায়ের হাঁটুতে লাগা গুলিটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়। কয়েক হাসপাতাল ঘুরে এবং অভিভাবকের সিদ্ধান্ত নিতে পারায় ব্যাহত হয় চিকিৎসা। পরে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাকে নেওয়া হলো, ততোক্ষণ পায়ে পচন ধরে। ২১ জুলাই কেটে ফেলা হয় সেই পা। সরকারি সহায়তা হিসেবে পেয়েছেন মাত্র এক লাখ টাকা। কর্ম ক্ষমতা হারানো শাহ আলম একটি ছেলে মুদি দোকানে লাগিয়েছেন সাত হাজার টাকার বেতনে। অন্য ছেলের দায়িত্ব নিয়েছেন মামা।

অবস্থা যখন এমন দুর্বিষহ, তখন এগিয়ে এসেছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য কর্মসূচির লিম্ব অ্যান্ড ব্রেস সেন্টার থেকে তাকে একটি কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানটি খরচ করেছে সাড়ে আট লাখ টাকা। 

চাঁদপুরের শাহ আলম গাজী ঢাকায় এসে জীবীকার প্রয়োজনে শিখেছিলেন টাইলসের কাজ। দৈনিক এক হাজার টাকা হাজিরার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রিদের সরদারি করে রোজগার ছিলো মাসে ৫০-৬০ হাজার টাকা। ভালোই চলছিলো সংসার আর ছেলেদের পড়াশোনা। গত বছরের জুলাই মাসেও কাজে যেতেন। তখন লোকমুখে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের গল্প শুনেছেন। কিন্তু এতে কান দেওয়ার ফুরসত ছিলো না তার। প্রতিদিনের মতো ১৯ জুলাইও বেরিয়েছিলেন কাজে। 

বাসায় ফেরার পথেই রায়েরবাগে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। বাম পায়ের হাঁটুতে লাগা গুলিটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়। এরপর স্থানীয়রা ধরাধরি করে তাকে প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতাল, পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক)  হাসপাতালে নেন। কিন্তু সঙ্গে কোনো অভিভাবক না থাকায় পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি চিকিৎসকরা। পরদিন শুরু হয় চিকিৎসা। ততক্ষণে তার পায়ে পচন ধরেছে। ২১ জুলাই ঢামেক হাসপাতালে কেটে ফেলা হয় তার পা। 

নিজের সঞ্চয় আর সবার সাহায্যে পাওয়া প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে চিকিৎসায়। সাড়ে আট লাখ টাকা মূল্যের একটি কৃত্রিম পা বিনামূল্যে দিয়েছে ব্র্যাক লিম্ব অ্যান্ড ব্রেস সেন্টার। কৃত্রিম পায়ে এখন মোটামুটি হাঁটাচলা করতে পারেন শাহ আলম। তবে সামর্থ্য হারিয়েছেন ভারী কাজের। স্ত্রী-সন্তানসহ চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন শাহ আলম গাজী। তার আহত হওয়ার পর ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের পড়ালেখা বন্ধ। এখন একটা মুদি দোকানে কাজে দিয়েছেন। সাত হাজার টাকা বেতন। ছোট ছেলেটাকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন তার মামা। 

শাহ আলমের অভিযোগ, ক্ষমতার অংশীদার হয়ে সবাই ভুলে গেছে আহতদের। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকা পেলেও দ্বিতীয় বার কাগজ জমা দিলেও অগ্রগতি নাই। স্বাস্থ্য কার্ডের কথা শুনেছি। কিন্তু স্বাস্থ্য কার্ড হয়নি। ভবিষ্যতে চিকিৎসা সহায়তার জন্য তার দাবি, একটি স্বাস্থ্য কার্ড। পাশাপাশি অল্প পুঁজি পেলে একটি দোকান দিয়ে পরিবারের ভারও নিতে চান তিনি।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে ব্র্যাক লিম্ব অ্যান্ড ব্রেস সেন্টার (বিএলবিসি)। ঢামেক হাসপাতাল, নিটোরসহ দেশের ১৪টির বেশি হাসপাতালে আহতদের শনাক্ত করে সেখান থেকে রোগীদের নিয়ে এসে কাজ করছে বিএলবিসি। এ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নতমানের কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন করা হয়েছে ৩৪ জনের শরীরে, চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে আরও ১৮৪ জনকে।

ব্র্যাকের স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রধান ডা. শাহিনুল হক রিপন বলেন, আগামী পাঁচ বছর বিনামূল্যে এই সেবা দেবে বিএলবিসি। শুধু কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা ব্রেস দেওয়াই নয়, ২৫০ জন আহতকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সহায়তাও দেবে বিএলবিসি। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ৪১৬ জনকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

ডা. রিপন বলেন, এ সহায়তা কর্মসূচি আগস্ট ২০২৯ পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যে যে কেউ এই কর্মসূচির অংশ হতে পারবেন।