ক্ষমা চাইলেন অনুতপ্ত ও লজ্জিত সাবেক আইজিপি মামুন

গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এজন্য গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। আদালত ও দেশবাসীর কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি। 

মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন মামুন।

আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক এই আইজিপি ট্রাইব্যুনালে বলেন, জুলাই-আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন করতে গিয়ে এতো ছাত্র-জনতা নিহত ও আহত হয়েছে। এজন্য আমি অনুতপ্ত ও লজ্জিত। 

তিনি আরও বলেন, চাকরির শেষ জীবনে এসে দায়িত্ব থাকার সময় এতো বড় গণহত্যা হয়েছে, তার দায় স্বীকার করছি। এই নৃশংস ঘটনা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে হয়েছে। এই ঘটনার জন্য সকল নিহত ও আহতের পরিবার এবং আদালত ও দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।

এদিন গণহত্যার নির্দেশ দেয়া ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন মামুন। ২০১৮ সালের নির্বাচনসহ নানা ইস্যুতে দেন চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

সাবেক আইজিপি বলেন, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগের রাতে ৫০ শতাংশ ভোট ব্যালট বাক্সে ভরে রাখতে শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ওই সময়ের আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী। পুলিশে গোপালগঞ্জ সিন্ডিকেট নিয়েও জবানবন্দি দেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

সাবেক আইজিপি বলেন, আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও ব্লক রেইডের সিদ্ধান্ত হয় রাজনৈতিকভাবে। মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনা এসেছিল হাসিনার কাছ থেকে। আর সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান হাবিব, ডিবির হারুন ছিলেন মারণাস্ত্র ব্যবহারে অতিউৎসাহী।

জবানবন্দিতে মামুন বলেন, র‌্যাব-১ এ টিআইএফ নামে গোপন বন্দিশালা ছিল। অন্যান্য র‌্যাবের ইউনিটে ছিল এমন বন্দিশালা। ভিন্নমত ও সরকারের জন্য হুমকি হয়- এমন মানুষদের ধরে আনা হতো এখানে। হাসিনার  দপ্তর থেকে আসতো এসব নির্দেশনা। কখনো নির্দেশনা দিতেন তারেক সিদ্দিকী। আর আয়নাঘরে আটক ও ক্রসফায়ারে হত্যার মতো কাজগুলো করতেন র‌্যাবের এডিসি অপারেশন্স ও গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক।

জবানবন্দিতে সাবেক এই আইজিপি বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর পুলিশে রাজনৈতিক প্রভাব আরও বেড়ে যায়। প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন কিছু কিছু কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এসব কর্মকর্তা প্রায় রাতেই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় বৈঠক করতেন। গোপন সেসব বৈঠক গভীর রাত পর্যন্ত চলত। 

সাবেক আইজিপি বলেন, বৈঠকে অংশ নেয়া কর্মকর্তারা হলেন- সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিবিপ্রধান হারুনুর রশীদ, এসবির মনিরুল ইসলাম, ঢাকার ডিআইজি নুরুল ইসলাম, অ্যাডিশনাল ডিআইজি বিপ্লব কুমার, এএসপি কাফী, ওসি মাজহার, ফোরকান অপূর্বসহ আরো অনেকে। এর মধ্যে কারও কারও সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি যোগাযোগ ছিল।

রাজসাক্ষী মামুন আরও বলেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় চেইন অব কমান্ড মানতেন না এসব কর্মকর্তা। আমি চাইতাম তারা (পুলিশ কর্মকর্তারা) পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুক। মূলত পুলিশ বাহিনীতে গড়ে তোলা দুটি গ্রুপই এসব কর্মকাণ্ড চালাত। এছাড়া দুই গ্রুপের নেতৃত্ব চাইতেন নিজস্ব বলয়ের লোকজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পোস্টিং পাক এবং ঢাকায় থাকুক।