কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে চীনা চক্রের অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে পড়ে ‘সাইবার দাসত্ব’ ও অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়া আরও ৫৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে দেশে ফিরেছেন। এর আগে শুক্রবার (১২ জুন) দিবাগত রাতে ফিরেছিলেন আরও ৩৭ জন। এ নিয়ে গত দুই দিনে কম্বোডিয়া থেকে মুক্ত হয়ে মোট ৯১ জন বাংলাদেশি দেশের মাটিতে পা রাখলেন।
শনিবার দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ৫৪ জনের দলটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। আর শুক্রবার দিবাগত রাত একটা ২৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়েজেরই অন্য একটি ফ্লাইটে এসেছিলেন ৩৭ জন।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ফেরত আসা এই ৯১ জন ভুক্তভোগীকে বিমানবন্দরে জরুরি সহায়তা এবং বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ ছাড়পত্র ও স্মার্টকার্ড দিয়েই তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্র তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বা ‘অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রে’ বিক্রি করে দেয়।
ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী তার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে ২০২৫ সালের পাঁচ ডিসেম্বর তিনি কম্বোডিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। মালয়েশিয়ায় দুদিনের ট্রানজিট শেষে সাত ডিসেম্বর কম্বোডিয়া বিমানবন্দরে পৌঁছালে রবিন শেখ নামের এক প্রবাসী বাংলাদেশি দালাল তাকে রিসিভ করে নিজের বাসায় নিয়ে যান। কিছুদিন পর ২৩ ডিসেম্বর কম্পিউটারের কাজের কথা বলে তাকে একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি বলেন, পরদিন কাজে যোগ দিয়ে বুঝতে পারি এটি একটি স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অনলাইনের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। আমি এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে টেনডার (চাইনিজ বস) বলে—তুমি টাকা দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে চলে যাও। আমি টাকার অঙ্ক জানতে চাইলে সে বলে, তোমার দালাল রবিন শেখ তোমাকে আমার কাছে দুই হাজার ৮৫ ডলারে বিক্রি করে দিয়েছে! এই টাকা না দিলে এখানেই কাজ করতে হবে।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, কম্বোডিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে থাকা এক বাংলাদেশি দালাল তাকে একটি সুপারশপে ৪০০ ডলার বেতনের চাকরির কথা বলে নিয়ে যান। সেখানে পাঁচ মাস কাজ করানোর পর একদিন ভালো চাকরির কথা বলে একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেন।
ভুক্তভোগীরা আরও জানান, এসব কম্পাউন্ডে অস্ত্রের মুখে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরকরে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে এই সাইবার স্ক্যামগুলো পরিচালিত হতো। নির্ধারিত ‘টার্গেট’ বা লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর চলত অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। সম্প্রতি কম্বোদিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে এই বাংলাদেশিরা উদ্ধার হন।
কম্বোডিয়া ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশ থেকেও এভাবে প্রতারিত হয়ে বাংলাদেশিরা ফিরছেন। এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আট জন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেন। তাদেরও থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা ‘মায়েসট’ হয়ে জোর করে মিয়ানমারে প্রবেশ করিয়ে পাসপোর্ট ও মোবাইল কেড়ে নিয়ে জিম্মি করা হয়েছিলো।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, পরপর দুদিনে ৯১ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ এভাবে ভয়াবহ প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সাইবার স্ক্যাম মূলত মানবপাচারের একটি আধুনিক ও বিপজ্জনক রূপ।
তিনি আরও জানান, কম্পিউটার বা কলসেন্টার অপারেটর পদে আকর্ষণীয় বেতনের লোভ দেখিয়ে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম বা ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই চক্র ফাঁদ পাতে। সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে অস্ত্রের মুখে তাদের জিম্মি করা হয়।
শরিফুল হাসান বলেন, এ কারণেই সরকার ও ব্র্যাকের পক্ষ থেকে একাধিকবার থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সরকারেরও উচিত এসব দেশে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন দেওয়ার আগে আরও ভালো করে যাচাই-বাছাই করা। বিশেষ করে বিদেশগামী কর্মীদের চাকরির সত্যতা যাচাই, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ এবং সাইবার স্ক্যাম বন্ধে আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।