অভিনেত্রী রাইমা শিমু হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত

২০২২ সালের অন্যতম আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিলো রাজধানীতে পরিচিত মডেল ও অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু হঠাৎ নিখোঁজ এবং পরে খন্ডিত মরদেহ উদ্ধার। এরপর গাড়ির মধ্যে ব্লিচিং পাউডার আর নাইলনের রশির সূত্র হত্যারহস্য উম্মোচন করে পুলিশ। হত্যার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন শিমুর স্বামী, আর তাকে এই কাজে সহায়তা দিয়েছেন তারই এক বন্ধু। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনী।

এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল বিনোদন জগৎ। অভিনেত্রীর মৃত্যুর কয়েক বছর পর ফের এই মর্মান্তিক ঘটনা নেটপাড়ার আলোচনায় উঠে এসেছে।

raima islam shimu 07
আদালতের কাঠগড়া থেকে শুরু করে রূপালী জগত- অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমু ছিলেন শোবিজের পরিচিত মুখ। তবে তাঁর জীবনের ট্র্যাজিক সমাপ্তি ঘটে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। নিখোঁজ হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকার উপকণ্ঠে মিলেছিল তাঁর দুই টুকরো খণ্ডিত মরদেহ।

শুটিংয়ের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার যে নাটক সাজানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা ঢাকা পড়ে যায় গাড়িতে থাকা ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ আর নাইলনের দড়ির সূত্রের কাছে।

রঙ্গমঞ্চ থেকে অভিনয় জীবন শুরু করেছিলেন শিমু। পরবর্তীতে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াতের নজরে এলে ১৯৯৮ সালে 'বর্তমান' সিনেমার মাধ্যমে রূপালী পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে। ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন এবং অর্ধশত নাটকে অংশ নেন। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'জামাই শ্বশুর' ছিল তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র।

raima islam shimu 05
অভিনয় জীবনেই ব্যবসায়ী সাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে প্রেম এবং ২০০৪ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিমু। বিয়ের পর চলচ্চিত্রে নিয়মিত না হলেও তিনি টেলিভিশনে কাজ চালিয়ে যান। নিজ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খোলার পাশাপাশি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের বিপণন বিভাগেও যুক্ত ছিলেন।

 গ্রিন রোডের বাসায় দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার ছিল তাঁদের। তবে, বাইরের এই আপাত শান্ত জীবনের নেপথ্যে ছিল দাম্পত্য কলহ ও শারীরিক নির্যাতন।

১৬ জানুয়ারি, ২০২২ (রোববার) সকাল ৭টা। স্বামী নোবেলের ভাষ্যমতে, শুটিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন শিমু। কিন্তু তিনি গন্তব্যে পৌঁছাননি।

raima islam shimu 08
সারাদিন শিমুর ফোন বন্ধ পেয়ে তাঁর বোন ফাতিমা নিশা দুশ্চিন্তায় পড়েন। স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নোবেল দাবি করেন, সকালে শুটিংয়ের কথা বলে বের হওয়ার পর থেকে শিমুর আর কোনো খোঁজ তিনিও পাচ্ছেন না। ১৭ জানুয়ারি সকালে স্বজনরা কলাবাগান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে নোবেল নিজেও থানায় গিয়ে পৃথক একটি নিখোঁজ ডায়েরি নথিভুক্ত করেন।

একই দিন কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ব্রিজের কাছে ঝোপের মধ্যে একটি সন্দেহজনক বস্তা পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বস্তাটি উদ্ধার করে। ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় দুই খণ্ডে বিভক্ত এক নারীর মরদেহ, যাতে ছিল একাধিক আঘাতের চিহ্ন।

স্যালিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে লাশ নেওয়া হলে শিমুর ভাই শহিদুল ইসলাম মরদেহটি শনাক্ত করেন। নিখোঁজ ডায়েরি মুহূর্তেই রূপান্তরিত হয় নৃসংশ হত্যা মামলায়।

raima islam shimu 04
প্রথমে চলচ্চিত্রের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যপদ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে চিত্রনায়ক জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তিনি জানান, প্রায় দুই বছর ধরে শিমুর সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। তদন্তে সেদিকে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি।

এরপরই তদন্তকারীদের চোখ পড়ে শিমুর পারিবারিক গাড়ির দিকে। পুলিশ যখন গাড়িটি পরীক্ষা করে, তখন ভেতরে তীব্র ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ পাওয়া যায়, যা অপরাধের আলামত মোছার চেষ্টার স্পষ্ট ইঙ্গিত। আরও তল্লাশি চালিয়ে গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় এক বান্ডিল নাইলনের দড়ি। কাকতালীয়ভাবে, যে বস্তায় শিমুর খণ্ডিত লাশ বাঁধা ছিল, সেটি সেলাই করতেও একই ধরনের নাইলনের দড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল।

গাড়ির আলামত ও পরিবারের বক্তব্য মিলিয়ে পুলিশ শিমুর স্বামী নোবেল ও তাঁর বন্ধু এসএমওয়াই আবদুল্লাহ ফারহাদসহ ৬ জনকে হেফাজতে নেয়। টানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ভেঙে পড়েন নোবেল এবং স্বীকার করেন যে, শিমু সেদিন শুটিংয়ের জন্য বাসা থেকে বের হননি।

raima islam shimu 03
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ১৬ জানুয়ারি সকাল ৭টার দিকে পারিবারিক কলহের জেরে শিমুর সঙ্গে নোবেলের তীব্র তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে নোবেল শিমুকে মারধর ও গলা টিপে হত্যা করেন। এরপর বন্ধু ফারহাদকে ডেকে এনে লাশ গুমের পরিকল্পনা করে। গৃহপরিচারিকাকে নাস্তা কিনতে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে দু’জনে মিলে লাশ দু’টুকরো করে বস্তাবন্দী করে এবং নাইলনের দড়ি দিয়ে সেলাই করে গাড়ির ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রাখেন।

প্রথম দফায় দিনের আলোতে লাশ ফেলার সাহস না পেয়ে ফিরে এলেও, ওই দিন রাত ৯টার দিকে কেরানীগঞ্জের নির্জন হযরতপুর ব্রিজের কাছে বস্তাটি ফেলে রেখে আসেন তাঁরা। পরদিন সকালে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে থানায় গিয়ে নিখোঁজের নাটক সাজান নোবেল।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক বিষণ্নতা ও চরম পরকীয়ার সন্দেহে শিমুর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন নোবেল। মহামারীর সময়ে ব্যবসায়িক লোকসান ও শিমুর উপার্জনের ওপর সংসারের নির্ভরতা তৈরি হলে এই কলহ আরও বৃদ্ধি পায়। মৃত্যুর কয়েক মাস আগেও স্বামীর বিরুদ্ধে গৃহস্থালি সহিংসতার অভিযোগ এনেছিলেন শিমু।

গ্রেপ্তারের পর পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় নোবেল তাঁর মেয়ের কাছে ফোন করে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন এবং স্ত্রীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। একটি ব্লিচিং পাউডারের গন্ধ ও দড়ির টুকরোই শেষ পর্যন্ত অপরাধীর সাজানো নাটক উন্মোচন করে দেয়।

raima islam shimu 02
মামলার বর্তমান অবস্থা:
আদালত সূত্রে জানা গেছে, অভিনেত্রী শিমু হত্যা মামলাটি বর্তমানে ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। শিমুর স্বামী সাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এস এম ফরহাদ বর্তমানে কারাগারে আছেন।

এই ঘটনায় শিমুর ভাই হারুনুর রশীদ বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেন। একই বছরের ২৯ আগস্ট পুলিশ চার্জশিট দাখিল করে এবং ২৯ নভেম্বর আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন।