নারীর বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-চালিত সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্যে ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এর আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনলাইনে নারীদের হয়রানি, মানহানি ও বিপন্ন করার মতো উদীয়মান হুমকি মোকাবিলায় আইনি, কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ পর্যালোচনার জন্য এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ‘ঢাকা ডায়ালগ’-কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে অনলাইনে নারীদের দৈনন্দিন নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের ২০ এপ্রিল আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত দশম ডাকার আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা ফোরামে ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এর সূচনা হয়। অভিন্ন সংজ্ঞা, রাজনৈতিক মনোযোগ, আইনি ও কারিগরি সক্ষমতা, তথ্য-প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি মোকাবিলাই এর লক্ষ্য।
এই সংলাপের মাধ্যমে প্রতিরোধ, তদন্ত ও প্রতিকারের বিষয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের জন্য অভিন্ন পরিভাষা, মানদণ্ড ও স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এমন অভিন্ন সংজ্ঞা ও শ্রেণিবিন্যাস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে, যার মাধ্যমে দেশগুলো বিভিন্ন ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি ও তুলনা করতে পারবে।
প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর অধিকতর জবাবদিহিতার জন্যও মাপকাঠি নির্ধারণের লক্ষ্য রয়েছে এ উদ্যোগের। এর মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা, লেবেলিং এবং সিন্থেটিক মিডিয়ার উৎস বা উৎপত্তি শনাক্তকরণ।
বিবৃতিতে বলা হয়, নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং সরকারপ্রধান, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘পলিটিক্যাল চ্যাম্পিয়ন’ বা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় সমর্থকদের একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নারীর বিরুদ্ধে এআই-সহায়তাপ্রাপ্ত সহিংসতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় গুরুত্বের সঙ্গে ধরে রাখাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এতে আরও বলা হয়, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর আইন প্রণয়ন ও পর্যালোচনার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ডিজিটাল প্রমাণ ও এআই ফরেনসিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশ, সরকারি কৌঁসুলি ও বিচারকদের প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ উদ্যোগের আওতায় ভুক্তভোগীদের সহায়তা-সংক্রান্ত হেল্পলাইন শক্তিশালী করা এবং ক্ষতিকর সিন্থেটিক কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে সক্ষম প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গোপনীয়তা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হবে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, নির্যাতন ক্রমেই ভৌত পরিসর থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ায় তা মোকাবিলায় জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিদ্যমান আইন ও প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থায় থাকা ঘাটতিগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশেষ করে কারসাজি করা ছবি বা কণ্ঠস্বর ব্যবহারের ক্ষেত্রে এআই-সক্ষম নির্যাতনের তদন্ত ও বিচার কঠিন হয়ে পড়ে।
সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জহরাত আদিব চৌধুরী বলেন, ক্ষতি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত নকশা তৈরির পর্যায় থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা। তিনি সিন্থেটিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাকে একটি ন্যূনতম প্রত্যাশা হিসেবে প্রতিষ্ঠারও আহ্বান জানান।
সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সঞ্জিদা ইসলাম তুলি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যারা নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর মুহূর্ত থেকেই ভুক্তভোগীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে তিনি সুসংহত হেল্পলাইন ও অভিযোগ জানানোর এমন ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেন, যাতে ভুক্তভোগীদের এক অফিস থেকে অন্য অফিসে যেতে না হয়।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন এবং উদ্যোগটি যে পাঁচটি স্তরে পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা তুলে ধরেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা আইনগত ঘাটতি, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিতা, সিন্থেটিক কনটেন্ট ব্যবস্থাপনা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তায় বিভিন্ন দেশের গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
বিবৃতি অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরবর্তী সময়ে আগ্রহী জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি দলকে ‘ফ্রেন্ডস অব দ্য ডায়ালগ’ হিসেবে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানাবে।
অভিন্ন সংজ্ঞা ও মানদণ্ড সম্বলিত প্রথম রেফারেন্স নথির খসড়া তৈরির জন্য একটি কারিগরি কর্মদলও গঠন করা হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নথিটি গ্রহণ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহত্তর এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সরকার, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, প্রযুক্তি কোম্পানি, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ এবং ভুক্তভোগীদের নেটওয়ার্ককে একত্রিত করা। পাশাপাশি এআই ডেভেলপার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্বেচ্ছামূলক ‘সেফটি-বাই-ডিজাইন’ অঙ্গীকার গ্রহণে উৎসাহিত করা।