দক্ষিণ এশিয়ায় চাকরির লোভ দেখিয়ে সাইবার স্ক্যামে বাধ্য করার ঘটনা বাড়ছে

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে পাচারের পর সাইবার স্ক্যাম বা অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে। প্রতারণামূলক অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনানুষ্ঠানিক দালালের মাধ্যমে লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের আটকে রেখে অনলাইন স্ক্যাম ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ধরনের মানবপাচার মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) যৌথভাবে প্রকাশিত এক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

9885

প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এটি সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। জোরপূর্বক অপরাধে জড়ানোর উদ্দেশ্যে মানবপাচারের ঘটনায় জাতীয় নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও কার্যক্রমের অগ্রাধিকার আরও শক্তিশালী করতে এই প্রতিবেদনের বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ সহায়ক হবে।’

বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজের ১০৩ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়। গত ২ থেকে ৪ জুন শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক যাচাই কর্মশালায় পাঁচ দেশের প্রতিনিধিরা প্রতিবেদনের খসড়া পর্যালোচনা করে মতামত দেন।

9880

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ক্যাম কার্যক্রমে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উৎস হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। একই সঙ্গে সংগঠিত অপরাধী চক্র দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন স্থানেও স্ক্যাম কার্যক্রম ছড়িয়ে দিচ্ছে। অপরাধীরা নতুন জায়গায় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি তাদের পুরোনো পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় শনাক্ত হওয়া স্ক্যাম কার্যক্রমে বড় কম্পাউন্ডের পরিবর্তে ছোট ও বিচ্ছিন্ন স্থাপনা ব্যবহার করা হচ্ছে। ভিলা, হোটেল, ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট ও অফিসে এসব কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব বড় কম্পাউন্ডকে স্ক্যাম কার্যক্রমের সঙ্গে সাধারণত যুক্ত করা হয়, এসব স্থাপনা তার চেয়ে আলাদা। ফলে অপরাধী চক্র শনাক্ত করা এবং সেখানে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

9882

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অপরাধের তদন্তে সংগঠিত অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা, ডিজিটাল ও আর্থিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ভুক্তভোগী শনাক্ত করা এবং তাদের সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণামূলক নিয়োগ বন্ধ করা, তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা নিশ্চিত করাও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে স্ক্যাম কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে সরাসরি অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, পাচারের শিকার অনেক ব্যক্তিকে প্রতারণা করে, ভয় দেখিয়ে বা জোরপূর্বক অনলাইন অপরাধে যুক্ত করা হতে পারে। বাইরে থেকে তাদের অপরাধী মনে হলেও তারা একই সঙ্গে মানবপাচারের ভুক্তভোগী হতে পারেন।

9883

এ কারণে স্ক্যাম কার্যক্রম থেকে উদ্ধার বা শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তারা কীভাবে সেখানে পৌঁছেছেন এবং কী পরিস্থিতিতে অপরাধে যুক্ত হয়েছেন, তা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করার পর তাদের যথাযথ সেবা ও সুরক্ষার আওতায় আনার পাশাপাশি পাচারের সরাসরি পরিণতিতে বাধ্য হয়ে করা বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের শাস্তি না দেওয়ার নীতির প্রয়োগের কথাও বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে মানবপাচার মোকাবেলায় তিনটি বিষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত হিসেবে দেখানো হয়েছে—অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং পাচার প্রতিরোধ। এর মধ্যে সংগঠিত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি ডিজিটাল ও আর্থিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

9884

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে ইউএনওডিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি ক্রিস্টিয়ান হোলগে বলেন, প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য ও সুপারিশকে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করা প্রয়োজন।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও স্পেশাল রেসপন্স ইউনিটের প্রধান রেজাউল করিম এবং পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ব্যারিস্টার মোশাররফ হোসেন এ ধরনের মানবপাচার ও জোরপূর্বক অপরাধে জড়ানোর ঘটনায় তদন্তসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

9878

বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেজনিয়াক বলেন, মানবপাচারের ঘটনায় মানবাধিকারভিত্তিক ও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। ইউএনওডিসির সদর দপ্তরের মানবপাচার ও অভিবাসী পাচারবিষয়ক বিভাগের উপপ্রকল্প সমন্বয়কারী ও আইন ও নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা জি এই লি প্রতিবেদনের পদ্ধতি, ফলাফল ও সুপারিশ তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রিভেন্টিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং ট্রাফিকিং ইন হিউম্যান বিইংস অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্র্যান্টস ইন সাউথ এশিয়া (২০২৪–২০২৭)’ প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে মানবপাচার ও অভিবাসী পাচার মোকাবেলায় কার্যকর ও মানবাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা করা হচ্ছে।