আগামীকাল শনিবার (২ অক্টোবর) অহিংসা নীতির পুরোধা মহাত্মা গান্ধীর ১৫২ তম জন্মবার্ষিকী ও আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস। মহাত্মা গান্ধী আমৃত্যু মানুষের মধ্যে শান্তি ও অহিংসার বাণী প্রচার করে গেছেন। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট মানুষের মধ্যে তার রেখে যাওয়া দর্শন ফেরি করছে। পাশাপাশি ১৫২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফিরে দেখা
ব্রিটিশ শাসনামলের শেষের দিকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানের মতো নোয়াখালীতেও হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সেই দুঃসময়ে শান্তি মিশন নিয়ে নোয়াখালী ছুটে আসেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত নোয়াখালী অবস্থানকালে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্ব স্থাপনসহ সেবামূলক বিভিন্ন কাজে হাত দেন। এভাবে ১৯৪৭ সালের সালের ২৯ জানুয়ারি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার জয়াগ গ্রামে গান্ধীর আগমন ঘটে।
জয়াগের তৎকালীন জমিদার ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষ নিজ জমিদারির সব সম্পত্তি মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য গান্ধীকে দিয়ে দেন। এরপর জমিদার বাড়িতে গড়ে ওঠে গান্ধী শান্তি ক্যাম্প। বাড়ির পাশে একটি কারিগরি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন গান্ধী। যা পরে গান্ধী মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে জাতীয়করণ করা হয়। যেখানে কর্মমুখী শিক্ষার পাশাপাশি গান্ধীর সাতটি অহিংস নীতি-নীতিহীন রাজনীতি, নৈতিকতাহীন বাণিজ্য,পরিশ্রমহীন সম্পদ, চরিত্রহীন শিক্ষা, মানবতাহীন বিজ্ঞান, বিবেকবর্জিত আনন্দ ও ত্যাগহীন অর্চনা জীবন দর্শন সম্পর্কে আগামী প্রজন্মদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তারাও জানতে পারছে মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে।
গান্ধী মেমোরিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরি মজুমদার জানান, তাদের বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ছোট হলেও পাঠ্যবইয়ের লেখা পড়ার পাশাপাশি তারা শিশুদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহাত্মা গান্ধীর ছবি দেখিয়ে তাদের জীবন কর্ম নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের ছোট বেলায় থেকে ধারনা দেয়া এ দুজন কীর্তিমান মহান মানুষের মানবিকগুলো সম্পর্কে।
১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ‘গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট’ অর্ডিন্যান্স গঠনের মধ্যদিয়ে মানুষের মধ্যে গান্ধীর জীবন দর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজ শুরু করা হয়।
ঘুরছে জীবনের চাকা
আর্থসামাজিক উন্নয়নে নানা মুখী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি গান্ধীর স্মৃতিগুলো ধরে রাখার চলে সকলের সম্মিলিত প্রয়াস। এখানে কর্মমুখী নারীদের দ্বারা হস্তচালিত চরকা ও তাঁতে বুননে নানা ধরনের জামা কাপড় তৈরি হয়। গান্ধীজী নিজেও চরকা দিয়ে তুলা থেকে সুতা ও কাপড় তৈরি করে জামা পরেছিলেন। তার সে স্মৃতি রক্ষার্থে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টেও এখনো চরকা দিয়ে সুতা ও তাঁতে কাপড় তৈরি করা হয়। স্থানীয় নারীরা এ কাজে অংশগ্রহণ করে নিজেদের পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে আনছে। এখনকার খাদি কাপড়সহ অন্য দেশীয় কাপড়ের তৈরি পোশাক ও বিভিন্ন সামগ্রী জেলার বাইরে বিভিন্ন নামিদামি কোম্পানির শো রুমে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় জয়াগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আকবর পলাশ জানান, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট জয়াগে হওয়াতে আমরা গর্বিত। এটি শুধু জয়াগের নয়। এটিকে আমরা দেখি ভারত ও বাংলাদেশের সেতুবন্ধন। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট এখানে নয়, সারাদেশে অসাম্প্রাদায়িক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষে কাজ করছে। এছাড়া জীবন মান উন্নয়ন, শিক্ষার মান উন্নয়নসহ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট কাজ করে যাচ্ছে। মানুষের মাঝে শান্তি, সম্প্রীতি ও অহিংস চেতনা জাগ্রত করার পাশাপাশি গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট মানবিক ও সু শাসন তৈরির ক্ষেত্রে বড়ো ধরনের ভূমিকা রেখে চলছে। যদিও এটি কিছু সময় ধরে বন্ধ। তার দাবি আগের মতো গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট আবারও এলাকায় সুশাসন তৈরি কর্মসূচি চালু করা হোক।
স্থানীয়রা জানান, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট মানব সেবায় সব সময় নিয়োজিত। অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে ও যে কোন দুর্যোগ দুর্বিপাকে ও অসহায় মানুষের পাশে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট মানুষের পাশে থাকে। এলাকার সচেতন মানুষও গান্ধী আশ্রমকে নানাভাবে সহযোগিতা করে।
গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের পরিচালক রাহা নব কুমার জানান, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট শুরু থেকেই এলাকার আর্থ সামাজিক উন্নয়নে নানাবিধ কাজ করে আসছেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের একটি অর্ডিন্যান্স ঘোষণার পর ’৭৫ এর পরবর্তীতে আইনগত একটি ভিত্তি লাভ করার পর মূলত ৮০ দশকের পর থেকে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট এখানে গান্ধীজীর আদর্শের চর্চাগুলো শুরু হয়। শুধু আদর্শের চর্চা নয়। মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা, হত দরিদ্রের সহায়তা করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করাসহ নানাভাবে কাজ করে আসছে। এছাড়া ফেনী, নোয়াখালীতে টানা ১৫ বছর গান্ধী আশ্রম করার পর বিশাল জনগোষ্ঠীকে শতভাগ স্যানিটেশন কার্যক্রমের আওতায় আনতে পেরেছে। নিরাপদ পানি ব্যবহারে গান্ধী আশ্রম কাজ করেছে।
২০০০ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ আশ্রমের মূল ভবনে গান্ধী স্মৃতি যাদুঘরটি উদ্বোধন করেছেন ছিলেন। কিন্তু সে জরাজীর্ণ ভবনটির জায়গায় নতুন আঙ্গিকে তৈরি হয়েছে ‘গান্ধী স্মৃতি যাদুঘর’। শনিবার বিকেলে মহাত্মা গান্ধীর ১৫২ তম জন্মদিন ও আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবসে এ যাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এতে উপস্থিত থাকবেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক,পররাষ্ট্র মন্ত্রী আবদুল মোমেন, ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী, আসাদুজ্জামান নুর এমপি, অ্যারোমা দত্ত এমপি, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকার ও ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধিসহ গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট বোর্ডের অন্য সদস্যরা।
তিনি আরও জানান, যাদুঘরে রক্ষিত গান্ধীর বিভিন্ন ছবি, ব্যবহার্য সামগ্রী ও বইপত্র নোয়াখালীতে তার আগমন- এ অঞ্চলের নতুন প্রজন্মের কাছে এক আদর্শ হিসেবে থাকবে গান্ধী মেমোরিয়াল মিউজিয়ামটি ।
আনন্দোৎসব উদযাপনে প্রস্তুত গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট
সরেজমিন গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে মহাত্মা গান্ধীর ১৫২তম জন্মদিন উপলক্ষে পুরো গান্ধী আশ্রমে চলছে সাজ সাজ রব পড়েছে। অতিথিদের বরণ করতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রশাসনর পক্ষ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে । ভাঙা সড়কগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। গান্ধী মেমোরিয়াল ইনস্টিটিউট মাঠে বিশাল প্যান্ডেল করা হয়েছে।মূলত সেখানে আলোচনা সভা ও শেষ স্থানীয় ও ঢাকা থেকে আগত একদল শিল্পীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
মহাত্মা গান্ধীর অহিংস ও শান্তি ফেরী করে চলা গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব কৃষ্ণ দাস গুপ্ত মনু গুপ্ত জানালেন, ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের ভালোবাসার জায়গা জয়াগের গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নে গড়া। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তার নির্দেশে একটি অর্ডিন্যান্সরে মাধ্যমে ট্রাস্ট গঠনের প্রাতিষ্ঠানিক আইনগত ভিত্তি দিয়ে যান। দুর্ভাগ্য তিনি সে অর্ডিন্যান্সে স্বাক্ষর করে যেতে পারেননি। দীর্ঘদিন পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে অর্ডিন্যান্স জাতীয় সংসদে পাশ করে দেন। তিনি সে সময় তিনি এ উদ্যোগ না নিলে গান্ধী আশ্রমের ইতিহাস অন্যভাবে হতো।
একাত্তর/এসি