দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পাঁচ বছর পর স্মৃতি ফিরে পেল আশিষ

এ যেন কোনো সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হয়েছিলেন নিরুদ্দেশ। পরিবার থেকে পাঁচ বছর বিচ্ছিন্ন থেকে পথে পথে ঘুরে রীতিমতো ভবঘুরের জীবন-যাপন। তারপর সড়ক দুর্ঘটনায় ফিরে এলো স্মৃতিশক্তি। এমন ঘটনাই ঘটেছে মৌলভীবাজারের যুবক আশিষের সাথে।

নেত্রকোণার দুর্গাপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে স্মৃতিশক্তি ফিরে পেয়েছেন আশিষ নামের মানসিক ভারসাম্যহীন এক যুবক। স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সহায়তায় পাঁচ বছর পর খুঁজে পেয়েছেন তার পরিবারকেও। দীর্ঘদিন পর সন্তানকে কাছে পেয়ে আবেগআপ্লুত হয়েছেন আশিষের বৃদ্ধা মা।

গত কয়েক বছর ধরে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ভবঘুরে জীবন কাটাচ্ছিল মানসিক ভারসাম্যহীন আশিষ। পাড়া-মহল্লা কখনো বা সড়কের পাশে অন্যান্য ভবঘুরের মতো জীবন কাটাতেন মানুষের ফেলে দেওয়া পচা বাসি খাবার খেয়ে। গত বুধবার (২৬ জানুয়ারি) সড়কের পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকা অবস্থায় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি বালুবাহী ট্রাক তাকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়।

তার আর্তনাদ শুনে স্থানীয় কয়েকজন যুবক ছুটে এসে তাকে নিয়ে যান হাসপাতালে। দুর্ঘটনায় কোনরকম প্রাণে বেঁচে গেলেও মাথা, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত নিয়ে ঠাঁই হয় উপজেলা কোয়ার্টারের বারান্দায়।

কপালে ২২টি সেলাই দিয়ে বাঁচিয়ে তোলা হয় তাকে। এরপর থেকেই উপজেলা পরিষদের কয়েকজন যুবক দায়িত্ব নেন আশিষের। ওষুধ, খাবার-দাবার সবকিছুই চলত সময়মত। কিছুটা সুস্থ হয়ে স্থানীয় যুবকদের প্রশ্নের জবাবে পরিবার ও নিজের নাম পরিচয় দেয় মানসিক ভারসাম্যহীন ওই যুবক।

এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে শুরু হয় তার পরিবারের সন্ধান। গত শুক্রবার মৌলভীবাজার কমলগঞ্জের শমশেরনগর ইউনিয়নের ভাদাইর দেউল গ্রামে সন্ধান মেলে তার পরিবারের। মোবাইল ফোনে পরিবারের কাছে আশিষের সন্ধান দেয়া মাত্রই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা খাদিজা বেগম। 

সোমবার সন্ধ্যায় ছেলেদেরকে ফিরিয়ে নিতে দুর্গাপুরে আসেন তারা। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে হয়ে ওঠেন আবেগআপ্লুত।

আরও পড়ুন: বানোয়াট গল্প ছড়িয়ে পরিবারসহ নারীকে ‘সমাজচ্যুত’ করার অভিযোগ

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় পাঁচ বছর পূর্বে নিজ গ্রাম থেকেই নিখোঁজ হন আশিষ। তাকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান মেলেনি। ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে গত দু'বছর আগে গত হয়েছেন তার বাবা আব্দুর রহিম।

তারপরেও ছেলের খোঁজে মা খাদিজা খাতুন পাগলের মত ঘুরেছেন বিভিন্ন স্থানে। দীর্ঘদিন পর ছেলেকে কাছে পেয়ে আবারও মায়ের মুখে হাসি ফুটেছে। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খুঁজেও ওর কোনো সন্ধান পাইনি। আজ আমার ছেলেকে আবারো ফিরে পেয়েছি। আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। 

আশিষকে উদ্ধার করা স্থানীয় যুবকদের একজন জানান, কয়েকদিন ধরেই পাগলকে উপজেলা চত্বরে ঘুরাঘুরি করতে দেখলেও তার কোনা নাম-পরিচয় জানা ছিল না। হঠাৎ একদিন তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে উদ্ধার করে চিকিৎসা জন্য হাসপতালে নিয়ে যান।

তিনি আরও বলেন, আমরাই তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করি। একপর্যায়ে আমাদের কাছে তার পরিচয় দেন এবং আমরা তার পরিবারের সন্ধান শুরু করি। আমরা তার ঠিকানা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় খুঁজে বের করে তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছি।

দুর্গাপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, কিছুদিন আগে গুরুতর আহত অবস্থায় উপজেলা কোয়াটার চত্বরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দেখে আমার অফিসের কয়েকজন স্টাফ আমাকে জানায়। আমি তাৎক্ষণিক তাদেরকে ওর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেই। তারাই গত কয়েকদিন ধরে তাকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন।

ইতিমধ্যে তার পরিবারের সন্ধান নিশ্চিত হয়ে আমরা তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন মানসিক ভারসাম্যহীন থাকলেও সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর আবারও সে তার পুরনো স্মৃতি ফিরে পেয়েছে। তাকে যদি সঠিকভাবে সেবা-যত্ন করা হয় তাহলে আশিষ পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে বলেও জানান তিনি।


একাত্তর/টিএ