লিবিয়ায় মাফিয়ার হাতে বন্দি ছেলেকে ফিরিয়ে আনলেন মা

অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে একমাত্র ছেলে ইয়াকুব হাসানকে দালালদের মাধ্যমে টুরিস্ট ভিসায় লিবিয়ায় পাঠিয়েছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বারের শাহিনুর বেগম। 

২০১৯ সালের মে মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে মাফিয়ার হাতে বন্দি হন ইয়াকুব। এরপর থেকে সংসারে নেমে আসে বিপর্যয়। একমাত্র ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশা শাহিনুরকে ছেড়েই দিতে বলেছিলেন পরিচিতজনরা।

অবশেষে বাংলাদেশ দূতাবাস, জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও লিবিয়া সরকারের সহায়তায় প্রায় তিন বছর পর ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে এনে শাহিনুর বেগম জানালেন, দালাল চক্রের সদস্য সিলেটের জাহাঙ্গীর, দিনাজপুরের হাসানসহ লিবিয়ার দালালরা শাহিনুরের স্বামী লিবিয়ার প্রবাসী আবুল খায়েরকে এখনও হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে।  

শাহিনুর বেগম জানান, দীর্ঘ ছয় মাস ছেলের খোঁজ না পেয়ে পাগলপ্রায় হয়ে পড়েন তিনি। ছেলেকে ফিরে পেতে পুনরায় দালাল চক্রের মাধ্যমে চার দফায় প্রায় ২০ লাখ টাকা দেন মাফিয়াদের। এরপরও ছেলেকে ফিরে না পেয়ে লিবিয়া প্রবাসী স্বামীর সহযোগিতায় পাসপোর্ট ও ভিসা করে ছেলেকে উদ্ধার করতে লিবিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শাহীনুর। 

গত ৯ জানুয়ারি ছেলেকে উদ্ধারের অভিযানে লিবিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন শাহিনুর বেগম। অবশেষে নানা নাটকীয়তা শেষে ২১ মার্চ মা শাহিনুর ছেলেকে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফেরেন। 


এ খবরে উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের বাড়িতে মা-ছেলেকে দেখতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ। শাহিনুর বেগম ও তার ছেলে ইয়াকুব হাসানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এসব তথ্য।

তারা জানান, ইয়াকুবের বাবা আবুল খায়ের আগে থেকেই লিবিয়ায় ছিলেন। বাবা-ছেলের আয়ে দেশে থাকা মা আর দুই বোন নিয়ে সংসার বেশ ভালোই চলছিল। 

তবে উচ্চ আয়ের আশায় হবিগঞ্জের এক দালালের খপ্পরে পড়েন ইয়াকুব। অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন। ইতালি যাওয়ার পথে ল্যাম্ব দোসা দ্বীপে মাফিয়ার হাতে আটক হন ইয়াকুবসহ অন্তত ১৫০ বাংলাদেশি।

এ বিষয়ে শাহিনুর বেগম বলেন, লিবিয়ায় গিয়ে স্বামীর সঙ্গে তিনি বেনগাজি শহরে অবস্থান করেন। পরে পর্যায়ক্রমে প্রথমে বাংলা ভাষা জানেন এমন কয়েকজনকে খুঁজে বের করে তাদের কাছে সব খুলে বলেন তারা। তারা তাকে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। 

দূতাবাস ও আইওএমের কর্মকর্তারা সব শুনে শাহিনুর বেগমকে সাহায্য করেন। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মকর্তারা লিবিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়াকুবকে উদ্ধার করেন।

তিনি আরও জানান, প্রায় ছয় মাস বন্দী জীবনে অনাহার, অর্ধাহার, নির্যাতনে ইয়াকুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে উদ্ধারে চার দফায় প্রায় ২০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে মাফিয়াদের। তাদের কাছ থেকে যে দালালরা টাকা নিয়েছে তাদের একজন এখন দেশে আছেন। তার বাড়ি হবিগঞ্জ। এদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানালেন তিনি।

আরও পড়ুন: অস্ত্র-গুলিসহ ছয় মানবপাচারকারী গ্রেপ্তার  

ইয়াকুব জানান, সেখানে তাদের ওপর খুব অত্যাচার করা হতো। খাওয়ার জন্য একটা রুটি আর পানি দেয়া হতো। তাদের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন সাতজন বাংলাদেশি। তাদের একজনের নাম সুজন। বাকিদের নাম বলতে না পারলেও ইয়াকুব জানান, তারাও মাফিয়াদের হাতে অনেক আগে ধরা পড়েন। তবে তারা মাফিয়াদের কিছুটা বিশ্বস্ত। 

এদিকে ইয়াকুবের ফেরার খবর পেয়ে দেবীদ্বার কালিকাপুরের বাড়িতে যান কুমিল্লার শ্রম ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক দেবব্রত ঘোষ। তিনি ইয়াকুব ও তার মা শাহিনুর বেগমের সাথে কথা বলে তাদের কাছ থেকে দালালদের তথ্য নেন এবং তাদেরকে সব ধরনের আইনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। 

তিনি বলেন, কুমিল্লা জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও শ্রম-জনশক্তি অধিদপ্তরে তারা লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। অথবা লিগ্যাল এইড সার্ভিসের সহযোগিতা নিতে পারেন। 


একাত্তর/এসজে