চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এখনও সীতাকুণ্ডের আগুন দগ্ধ মানুষের স্বজনদের আহাজারি আর আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠছে আশপাশের পরিবেশ।
বিশেষ হাসপাতালের ৩১ ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে গেলেই দেখা যাচ্ছে দগ্ধ রোগীদের পাশে কিংবা বাইরে স্বজনের আহাজারি আর জীবন বাঁচানোর আকুতি।
সীতাকুণ্ডের আগুন দগ্ধ এমনই একজন বাবুল। তার শরীরের ৫০ শতাংশ পুড়ে গেছে। আছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। অক্সিজেন লাগানো অবস্থায় বাবুলের পাশে বসে কাঁদছে মা।
আবার বাঁশখালীর জলদি এলাকার বাসিন্দা অর্পণ করের গল্পটা অন্যরকম। শনিবার বিকালে তিনি ডিপোতে কাজ শেষে বাসায় চলে যান। কিন্তু আগুন লাগার কথা শুনে ছুটে যান ঘটনাস্থলে।
এর পরপরই বিস্ফোরণে আহত হন অর্পণ কর। তিনি বোন রুম্পা করকে মুঠোফোনে কল দিয়ে বলেন, আমি বাঁচবো না। আমাকে তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও।
পরে আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে অর্পণকে খুঁজে পায় পরিবার। তার মতোই আগুনের খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন ডিপোর এক সুপারভাইজার রতন। তিনিও এখন হাসপাতালে।
সীতাকুণ্ড দক্ষিণ সলিমপুর গ্রামের দিদারুল আলমের ছেলে তোফাজ্জল আইটি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তিন বছর ধরে কাজ করছেন বিএম ডিপোতে। ডিউটি মাগরিবের নামাজের আগে শেষ হয়ে যায়।
ডিপোতে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফ্যাক্টরিতে চলে যান তিনি। গিয়ে দগ্ধ হন। মাকে ফোন করে বলেন, আমি মারা যাচ্ছি। আমাকে বাঁচাও।
আবার ডিপোতে কনটেইনার চেক করতেন ফেনীর বাসিন্দা নূর আহম্মদ (১৯)। শনিবার রাত থেকে ডিউটি ছিল তার। বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি।
পরে চোখ মেলে দেখেন চট্টগ্রাম মেডিক্যালে তিনি। তার পাশে বসে বাতাস করছিলেন আর চোখের জল মুছে দিচ্ছিলেন নূর আহম্মদের মা।
নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের বাসিন্দা ওমর ফারুকের (৩২) চোখ ও হাত পুড়ে গেছে। পোড়া শরীরে হাসপাতালের বেডে অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন, চোখে ব্যান্ডেজ।
এছাড়া দগ্ধ হয়েছেন মানিকছড়ির আনোয়ার হোসেন। এরা সবাই বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের আহতদের অবস্থাও একই।
আগুনে দগ্ধদের বেশিরভাগের চোখ ও শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকরা বলছেন, আহতদের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আগুন পুড়ে গেছে।
এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যালের ৩৬ নম্বর বার্ন ইউনিট ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছেন ৫০ জনের বেশি। বার্ন ইউনিটে আসন সংকটের কারণে ৩১ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা হচ্ছে।
সীতাকুণ্ডের নারকীয় আগুনে আহত হয়েছেন প্রায় দুই শতাধিক। আহতদের মধ্যে থেকে মৃত্যু সংখ্যা বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে এখনো আগুন ও ধোঁয়া, বিস্ফোরণের প্রভাব বিশাল এলাকায়
রোববার (৫ জুন) দুপুরে বার্ন ইউনিট এবং ৩১ নম্বর ওয়ার্ড গিয়ে দেখা যায়, আহতদের মধ্যে শ্বাসনালি ও চোখ পুড়ে যাওয়াদের সংখ্যা বেশি।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, আহতদের শরীরের তিন থেকে ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে। বেশিরভাগ শ্বাসনালি ও চোখ পোড়া রোগী।
শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়া রোগীদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দগ্ধ রোগী বাড়ার কারণে ৩১ ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের চিকিৎসা চলছে। সর্বোচ্চ দিয়ে রোগীদের সেবা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একাত্তর/এসি