চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে বিএম কনটেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও আগুনের ঘটনা প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হতে চলেছে। তবে সেই আগুন এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
সেই ডিপোতে অতি দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকায় সহজে আগুন নিভছে না। আগুন নেভানোর কাজে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি এলাকায় শনিবার রাত ৯টার দিকে বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগে।
এরপর সেখানে থাকা রাসায়নিকের কন্টেইনারে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকলে বহু দূর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। প্রায় আড়াই বর্গকিলোমিটার এলাকার ঘরবাড়ি কেঁপে উঠে।
প্রচণ্ড বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। অনেকের ঘরের জানালার কাচ, দরজা ভেঙে গেছে। বেশির ভাগ বাসার টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর ও বৈদ্যুতিক পাখা নষ্ট হয়ে গেছে।
বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত চার বর্গকিলোমিটার এলাকা কেঁপে ওঠে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে এখনো আগুন জ্বলছে।

বিস্ফোরণে পুরো এলাকায় রাসায়নিকের বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। এতে উদ্ধারকর্মীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। আশপাশের জনবসতিতে বাসিন্দারা নাক-মুখ ঢেকে চলাচল করছেন।
যখন বিস্ফোরণ ঘটে তখন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় পানি দিয়েই আগুন নেভাতে শুরু করে দমকল কর্মীরা। কিন্তু তাতে আগুনের তীব্রতা না কমে বরং বেড়েছে।
সেই সঙ্গে বেড়েছে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণও। একের পর এক কনটেইনার বিস্ফোরিত হচ্ছিলো। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের সাথে যোগ দেয় ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
মধ্যরাতের দিকে জানা যায় কদমরসুল এলাকার এই বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে অতি দাহ্য রাসায়নিক হাইড্রোজের পার অক্সাইডের একটি বড় মজুদ ছিলো।
আর সেই কারণেই পানি ছিটিয়ে আগুনকে বাগে আনা যাচ্ছিলো না। পরে পানির বদলে ফোম ব্যবহার শুরু করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
ফায়ার সার্ভিসের মোট ৩০টি ইউনিট সেখানে কাজ করার পরও সারারাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় রোববার সকালে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল যোগ দেয়।
কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের ৩০ ইউনিট ও সেনাবাহিনীর মিলিত চেষ্টায় রোববার সারাদিনেও আগুন নেভেনি। বিকেল পর্যন্তও বিভিন্ন কন্টেইনার জ্বলছিলো। থেমে থেমে হচ্ছিলো বিস্ফোরণ।

বিকেল ৫টার দিকে দেখা যায়, আগুন লাগা কনটেইনারগুলোয় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ওপর থেকে যন্ত্রের সাহায্যে পানি ছোটাচ্ছেন। কিছু জায়গায় জ্বলছে আগুন। কিছু জায়গায় ধোঁয়া।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর চট্টগ্রামের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাইন উদ্দিন বলেন, রাসায়নিকের কারণে আগুন নেভানো যাচ্ছে না।
তিনি জানান, ডিপোতে হাইড্রোজেন পারক্সাইড নামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ থাকার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আগুনে পর থেকে মালিকপক্ষ কাউকে পাচ্ছি না। মালিকদের কাউকে পেলে আমরা জানতে পারতাম কোন কনটেইনারে কী আছে।
মহাপরিচালক বলেন, আমরা এখনো ভেতরে পুরোপুরি ঘুরতে পারছি না। এ ঘটনায় ফায়ারের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যে কমিটি করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার সেকশনের বিশেষ দল কাজ করছে। কনটেইনারগুলোতে যেহেতু কেমিক্যাল সেজন্য ঢাকা থেকে ফায়ারের ২০ সদস্যের হেজবোর্ড টিম আনা হচ্ছে।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড একটি রাসায়নিক যৌগ। এটি যদি উত্তপ্ত করা হয়, তাহলে তাপীয় বিয়োজনে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বিস্ফোরক হিসাবে আচরণ করে।
উদ্ধার অভিযানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৫০ জন সদস্য কাজ করছেন। উদ্ধার অভিযান ও আগুন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য সেনাবাহিনীর একটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে।

এছাড়া সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ও নিরাপত্তা দলও নিয়োজিত রয়েছে। রাসায়নিক দ্রব্য বিস্ফোরণ হবার কারণে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সামগ্রী সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়া রোধে এ দল কাজ করছে।
এদিকে, বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাজাহান বলেন, আমরা বন্দর থেকে একটি তদন্ত কমিটি করেছি। অনিয়ম ছিল কি না, তা তদন্ত কমিটি অনুসন্ধান করে বলবে।
তিনি বলেন, ডিপোতে হাইড্রোজেন পারক্সাইডবাহী ২৬টি কনটেইনার ছিল। ডিপোর টিনশেডেও প্লাস্টিকের জারে এই রাসায়নিক ছিল।
আগুন লাগার পর কনটেইনারে থাকা রাসায়নিক ভর্তি জার ফেটে যায়। এতে হাইড্রোজেন পারক্সাইড বের হয়ে কনটেইনারের সংস্পর্শে আসে।
অক্সিজেন নির্গত হয়ে পানি ও আগুনের সংস্পর্শে কনটেইনারের ভেতরে তাপমাত্রা বেড়ে বিস্ফোরণ ঘটে। কনটেইনার ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে স্প্রিন্টারের মতো তা ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি জানান, বিএম কনটেইনার ডিপোতে রাসায়নিক দ্রব্য রাখার অনুমতি ছিলো না। ছিলো না রাসায়নিক সংরক্ষণের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাও।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ড বিস্ফোরণের কারণ হাইড্রোজেন পার অক্সাইড!
ডিপোতে কোথায় কি পরিমাণ রাসায়নিক ছিলো, সে বিষয়ে সঠিক ডিপোর মালিক কর্তৃপক্ষ তথ্য দেয়নি বলেও জানান চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান।
এম শাহজাহান বলেন, এখানে হাইড্রোজেন পারক্সাইডের মতো বিপজ্জনক পণ্যে আগুন লাগার পর, ক্রেন দিয়ে কনটেইনার সরিয়ে নিলে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা কমে যেত।
ডিপোতে এখনো অক্ষত থাকা হাইড্রোজেন পারক্সাইডসহ রাসায়নিক পণ্যভর্তি কয়েকটি কনটেইনার সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দেন বন্দর চেয়ারম্যান।
বিএম কনটেইনার ডিপোতে আগুন লাগার মুহূর্তে ২০০ কর্মরত শ্রমিক ছিলো। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই অগ্নিকাণ্ডে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ আছেন অনেকে।
একাত্তর/এসি
