ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাতে এখন পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ ১৩ জেলায় ২৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এদের বেশিরভাগই মারা গেছেন গাছ চাপায়।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খুলনার কয়রা-পাইকগাছা উপকূলের দুর্বল বেড়িবাঁধ। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ভোলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় বহু বসত ও দোকানপাট বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ফসলের। ভেসে গেছে ঘেরের মাছ। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন লাখো গ্রাহক।
ঘূণিঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় সব মিলিয়ে আনুমানিক ১০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণপ্রতিমন্ত্রী।
সোমবার রাতে সিত্রাং বাংলাদেশ অতিক্রমের পর প্রথম বড় ধরনের দুঃসংবাদ আসে কুমিল্লা থেকে। সেখানে গাছ চাপা পড়ে একই পরিবারের সব সদস্য মারা যান।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের গোটা হেসাখাল এলাকায় এখন শোকের ছায়া। ঝড় বৃষ্টি আগের রাতেও নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় অনেকে।
রাতে সিত্রাংয়ের ঝড়ো হাওয়ায় আকস্মিকভাবে একটি গাছ নিজামের ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি ও তার স্ত্রী মারা যান। হাসপাতালে মারা যায় তাদের কন্যা শিশু নুসরাত।
সোমবার রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশের ভোলার উপকূল দিয়ে স্থলভাগে উঠে আসে। সেই সময় ঝড়টির গতি ছিল ঘণ্টায় ৫৬ কিলোমিটার।
এতেই লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে ভোলা উপকূল। এখন পর্যন্ত ৭ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি দোকানপাট গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে।
ঘর ও গাছের চাপায় নিহত হয়েছেন চার জন। এদের মধ্যে ভোলা সদরে একজন, দৌলতখানে একজন ও চরফ্যাশন উপজেলায় একজন রয়েছে।
উপকূলের বাঁধের বাইরের বহু এলাকা জোয়ারে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। ঘরবাড়ি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
মঙ্গলবার সকালে ভোলার আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও তেমন বৃষ্টি হয়নি। নেই ঝড়ো বাতাসও। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে পরিস্থিতি। ফলে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেছেন মানুষ।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।
বাগেরহাটে ঘুর্ণিঝড়ের প্রভাবে ১২০০ বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে নিচু এলাকা। গাছপাপালা পড়ে ও ভারি বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় ১২শ’ কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাতে ঝড়ের সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় রামপাল, মোংলা, বাগেরহাট এলাকার কয়ের হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে। বিদ্যুৎহীন রয়েছে জেলার অধিকাংশ এলাকা।
তবে ঝড়ে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে।
বাগেরহাটের বেমরতা, বেটপুর, ফতেপুর, ভাটসালা এলাকায় ঝড়ে অসংখ্য গাছ পড়ে রয়েছে। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন এলাকার চিত্রও প্রায় একই।
যে যার মতো করে ঘরের ওপর পড়ে থাকা গাছ কেটে অপসারণ করছে। অনেক বাড়ির উঠান হাঁটুপানি জমে রয়েছে। নেই বিদ্যুৎ। রাস্তার ওপর উপড়ে পড়া গাছ সরানো হচ্ছে।
সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি বাগেরহাট জেলায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুদিনের টানা বর্ষণে ও ঝড়ের প্রভাবে মোংলা, রামপাল, সদরসহ বেশ কিছু এলাকার ঘের পানিতে ভেসে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্যও প্রকট হচ্ছে।
আইলার পর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে নদী-বাঁধের ভাঙন আতঙ্কে আছে খুলনার দুই উপজেলা দাকোপ ও কয়রাসহ জেলার উপকূলীয় মানুষরা।
কয়রা উপজেলার হরিনখোলা বেড়িবাঁধের দেড়শ’ মিটার বাধ ধসে পড়েছে। নির্ঘুম রাত কাটানোর পর স্থানীয় এলাকাবাসী ধসে যাওয়া অংশ মেরামত শুরু করেছেন।
দাকোপের বেশির ভাগ এলাকায় নতুনভাবে বাঁধে সংস্কার করা হলেও কমপক্ষে ছয়টি পয়েন্টে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
তবে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বরিশাল অঞ্চলের কোনো বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। বাঁধে কিছু দুর্বল জায়গা থাকলেও কোনো ধরনের ক্ষতি হয়নি।
তবে ফসলি জমির কিছু ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি উঠেছে। বেশ কিছু পুকুর ও ঘের অতি জোয়ারের কারণে ভেসে গেছে।
অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে টানা বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে বরিশাল নগরীর অন্তত অর্ধশত এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর তাণ্ডবে গাছের নিচে চাপা পড়ে শতবর্ষী বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। সোমবার রাতে সোনাখালী বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পটুয়াখালীর উপকূলজুড়ে টানা বর্ষণ থেমেছে। সোমবার রাত ৮টার পর থেকে বৃষ্টি থেমে গেলেও তার আগে দুদিনে প্রায় ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া বিভাগ।
মঙ্গলবার সকাল থেকে আকাশে হালকা মেঘ রয়েছে এবং মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্য উঁকি দেওয়ায় জনজীবনে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
জেলার ৮টি উপজেলার মধ্যে ৫ উপজেলায় এখনো বিদ্যুৎ সরবরাবহ স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য মাছের ঘের ও পুকুর পানিতে তলিয়ে গেছে।
ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের বিপদ কেটে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরে বহির্নোঙ্গর থেকে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে আবার জেটিতে ফেরাচ্ছে কর্তৃপক্ষ; চলছে পণ্য খালাসের কাজ।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আগের দিন জারি করা ‘অ্যালার্ট-৩’ মঙ্গলবার তুলে নেওয়ার কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, ভারি বর্ষণ আর জোয়ারের পানিতে রাতের পুরোটা সময় তলিয়ে ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও আসাদগঞ্জের বড় অংশ।
জোয়ারের পানির বান প্রায়ই তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুললেও গত দুই দশকের ঘূর্ণঝড়ের অভিজ্ঞতার মধ্যেও এতটা পানি কখনও উঠতে দেখেননি এখানকার আড়তদাররা।
মঙ্গলবার ভোরে ঝড় থেমে বৃষ্টি বন্ধ হলে আর ভাটার টানে পানি নেমে গেলে সকাল থেকে একটু একটু করে কেনাবেচায় ফিরতে শুরু করে আড়তগুলো।
ঘূর্ণিঝড়ের বিপদ কাটলেও চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলের মানুষ এখনো জোয়ার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায়। তবে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দেখা গেছে, উত্তাল সাগর ভোরের আলো ফুটতেই অনেকটা শান্ত।
মঙ্গলবার সকাল থেকে ঝলমলে চট্টগ্রামের আকাশ। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার রাত শেষে চাঞ্চল্য ফিরছে নগরে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করায় সড়কে মানুষ ও যানবাহনের আনাগোনা কম।
ঘূর্ণিঝড়ের উত্তাল ঢেউয়ে তছনছ হয়েছে কক্সবাজার সৈকত। বালিয়াড়ি ভাঙনের পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে রাস্তাঘাটও। সৈকতের সৌন্দর্য হারিয়ে পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে।
ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী সাগর দেখতে ভিড় করছেন পর্যটকরা। বালিয়াড়ি বা জিও ব্যাগে উঠে দেখছেন উত্তাল সাগর, তুলছেন ছবি। তবে ভয়ে কেউ নামছেন না সমুদ্রস্নানে।
তবে হতাশ সৈকতের লণ্ডভণ্ড দৃশ্য দেখে। সাগর উত্তাল থাকায় পর্যটকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিচ্ছেন লাইফ গার্ড কর্মীরা।
কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও সেন্টমার্টিনে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঘরে ফিরছেন কক্সবাজার উপকূলের মানুষ।
কিন্তু ঘরে ফিরে দেখছেন সব শেষ। পানির নিচে তলিয়ে যায় শুঁটকিমহাল, ধানী জমি, মাছের ঘের। সেন্টমার্টিন, মহেশখালী, কুতুবদিয়ায় লাখো মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়েন।
ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টির কারণে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের মোট ২ হাজার ১০০ হেক্টর জমির আমন ধান মাটিতে হেলে পড়েছে। কৃষকদের মতে এই পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি হবে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সিরাজগঞ্জে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সোমবার দিনভর ঝরো হাওয়া আর মুশুলধারে বৃষ্টিতে রোপা-আমনের ক্ষতি হয়েছে।
জেলার ৯ উপজেলার প্রায় ৫ শতাধিক হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। জমিতে হেলে পড়েছে বাড়তে থাকা ফসল। বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় শীতের আগাম সবজিও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে আসায় সোমবার বেলা ১২টা থেকে সারাদেশে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছিল বিআইডব্লিউটিএ।
প্রায় ২২ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টা থেকে লঞ্চসহ সারাদেশে সব ধরনের নৌযান চলাচল শুরু হয়।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সোমবার বিকেল ৩টা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বরিশাল বিমানবন্দরে উড্ডয়ন বন্ধ ছিল। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বিমানবন্দর ফের চালু করা হয়।
সোমবার রাজধানীতে ঝড়ো হাওয়া, গাছ ভেঙে পড়া ও বৃষ্টিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাজধানীর অনেক এলাকা।
এছাড়া অনেক সড়কে বৃষ্টির পানি জমে যায়। পানি ঢুকেছিল অনেকের ঘরেও। এতে অনেক এলাকায় ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানীবাসী।
একাত্তর/এআর