মেয়ের সঙ্গে এইচএসসি পরীক্ষাও দিচ্ছেন মা

২০০৩ সালে মারুফা আক্তার যখন দশম শ্রেণির ছাত্রী, তখন তাকে বসতে হয় বিয়ে পিঁড়িতে। বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। তবে মনের ভেতরে উঁকি দিচ্ছিলো একটি আলো। মারুফার ঘর আলো করে যখন চার সন্তান এলো, তারপর সেই ইচ্ছে পূরণ করলেন তিনি। 

বড়ো মেয়ে যখন নবম শ্রেণির ছাত্রী, তখন স্বামী-সন্তানদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় তিনিও মেয়ের সঙ্গে একই শ্রেণিতে ভর্তি হন। এরপর মেয়ের সঙ্গেই বসেন এসএসসি পরীক্ষায়। উত্তীর্ণ হন মা-মেয়ে দুজনই। সেই থেকেই শুরু। আজও অব্যাহত আছে মারুফার প্রয়াসটি।

এবার চলতি এইচএসসি পরীক্ষাতেও মারুফা অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে পরীক্ষাতে বসেছে তার বড়ো মেয়েও। তারা দু’জনই নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। 

মারুফা আক্তার ওই কলেজের বি.এম শাখা থেকে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ডিমলা বি.এম কলেজ কেন্দ্রে এবং মেয়ে শাহী সিদ্দিকা একই কলেজের বিজ্ঞান শাখা থেকে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। 

মারুফা আক্তার (৩৫) নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের পুন্যারঝার গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলামের স্ত্রী। মারুফা-সাইদুল দম্পতির রয়েছে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। চার সন্তানের মধ্যে মেয়ে শাহী সিদ্দিকা সবার বড়ো। দ্বিতীয় ছেলে সন্তান এবার দশম শ্রেণির ছাত্র। তৃতীয় সন্তান অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী এবং সবার ছোট মেয়ে পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে।

মারুফার পরিবার জানায়, ২০২০ সালে মেয়ে শাহী সিদ্দিকার সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করেন মারুফা। মেয়ে জিপিএ ৩.০০ পেলেও মারুফা পান জিপিএ ৪.৬০।

মাধ্যমিক পাস করে মেয়ের সঙ্গে একই কলেজে ভর্তি হন মারুফা। এখন সে স্বপ্ন দেখে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে উত্তীর্ণ হলে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য ভর্তি হবে দেশের বড়ো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

মারুফা আক্তার বলেন, পড়াশোনার প্রতি আমার আগ্রহ থাকলেও এসএসসি পরীক্ষার আগে বিয়ে হয়। বিয়ের পর চার সন্তান মানুষ করতে গিয়ে নিজের পড়ার কথা আর ভাবার সময়ই হয়নি। এরপর নিজের ইচ্ছা ও স্বামী-সন্তানদের অনুপ্রেরণায় ছোটখাতা ফাজিল মাদরাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই। তখন মেয়েও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এরপর ২০২০ সালে মা-মেয়ে একই সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হই। 

মাধ্যমিক পাস করে আমরা মা-মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে ভর্তি হয় ডিমলা উপজেলার শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এবারও আমরা ভালো ফলাফলে আশাবাদী। 

তিনি বলেন, সমাজে আর দশজনের মতো করে নিজেকে একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে পারি এই জন্য লেখাপাড়া চালিয়ে যাচ্ছি। সেভাবে সন্তানদেরও এগিয়ে নিচ্ছি। এজন্যই কষ্ট করে হলেও লেখাপড়াটা আবারও শুরু করেছি। দেশের কোনো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষাগ্রহণের ইচ্ছে আছে।

মায়ের এমন আগ্রহে মেয়ে শাহী সিদ্দিকা বলেন, ভাবতে খুব ভালো লাগছে যে আমরা মা-মেয়ে একই সঙ্গে এইএসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি। এমন সুযোগ ক’জনার ভাগ্যে আসে! মা অনেক মেধাবী। সংসারসহ আমাদের চার ভাইবোনকে সমালানোর পর মা অনেক কষ্ট করে লেখাপাড়া চালিয়ে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: মায়ের লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষায় বসলেন শারমিন

মারুফার স্বামী সাইদুল ইসলাম বলেন, আমি আমার স্ত্রীর ইচ্ছার মর্যাদা দিয়েছি। সে যতদূর পড়তে চায় আমি সহযোগিতা করবো। তার লেখাপড়ায় যাতে কখনও কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসে সে জন্য আমি সব সময় সজাগ রয়েছি।

ডিমলা উপজেলার শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সরকারি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান বলেন, বিষয়টি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের মতো। ইচ্ছাশক্তি থাকলে বয়স কখনও বাধা নয়। মারুফা আক্তারের এমন উদ্যোগ অনেককে অনুপ্রাণিত করবে। মা-মেয়ের দু’জনের সাফল্য কামনা করি।


একাত্তর/এসি