প্রায় ৬০টি খুনের আসামি বিখ্যাত সন্ত্রাসী খুলনার এরশাদ শিকদারের বিলাসবহুল বাড়ি ‘স্বর্ণকমল’ ভেঙে ফেলা হচ্ছে। উৎসুক জনতা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভেঙে ফেলার কাজ দেখছেন এবং ছবি তুলছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) নগরীর সোনাডাঙ্গা মজিদ সরণিতে অবস্থিত বাড়ির সামনে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা যায়। এই বাড়ি নিয়ে যুগ যুগ ধরেই ছিল নানান রহস্য।
প্রচারণা রয়েছে- বাড়ির বিভিন্ন গোপন স্থানে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুকানো রয়েছে। এমনকি বাড়ি নির্মাণ কাজে যে শ্রমিক ও মিস্ত্রি ছিল তাদের অঙ্গহানিসহ প্রাণও নিয়ে নিয়েছিল এরশাদ শিকদার। এরশাদ শিকদারের বহু অপকর্মের সাক্ষী এই স্বর্ণকমল। বাড়িটিতে গোপন কুঠরি এবং অস্ত্রভাণ্ডারের কথাও শোনা যায়। প্রায়ই জলসা বসত বাড়িটিতে। শহরের নামিদামি ব্যক্তিরা যেতেন সেখানে।
সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ জানিয়েছে, বয়রা এলাকার একজন ব্যবসায়ীর কাছে বাড়ির অর্ধেক বিক্রি করা হয়েছে, তারাই ভাঙচুরের কাজ করছে। এটা কতখানি সত্য তারা নিশ্চিত নয়।
জানা যায়, এরশাদের দুই স্ত্রী খোদেজা বেগম ও সানজিদা নাহার শোভা। এরশাদ শিকদারের তিন ছেলে রয়েছে। তারা হলেন- মনিরুজ্জামান শিকদার জামাল, কামাল শিকদার ও হেলাল শিকদার। তারা পেশায় ব্যবসায়ী। এছাড়া সুবর্না ইয়াসমিন স্বাদ ও জান্নাতুল নওরিন এশা নামে এরশাদ শিকদারের দুই মেয়ে ছিল। যার মধ্যে এশা ২০২২ সালের ৩ মার্চ আত্মহত্যা করেন।
এরশাদ শিকদারের জন্ম ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার মাদারঘোনা গ্রামে। তার বাবার নাম বন্দে আলী। ১৯৬৬-৬৭ সালে তিনি তার জন্মস্থান নলছিটি থেকে খুলনায় চলে আসেন। খুলনায় আসার পর এরশাদ সেখানে কিছু দিন রেলস্টেশনের কুলির সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে রেললাইনের পাত চুরি করে বিক্রি করতো এমন দলের সঙ্গে যোগ দেন। পরে তিনি তাদের নিয়ে নিজেই একটি দল গঠন করেন ও এলাকায় ‘রাঙ্গা চোরা’ নামে পরিচিতি পান।
১৯৭৬-৭৭ সালে তিনি ‘রামদা বাহিনী’ নামে একটি দল গঠন করেন, যারা খুলনা রেলস্টেশন ও ঘাট এলাকায় চুরি-ডাকাতি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকত। এ রামদা বাহিনী নিয়েই এরশাদ ১৯৮২ সালে ৪ ও ৫ নম্বর ঘাট এলাকা দখল করেন এবং এর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে তিনি তৎকালীন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমান ২১ নম্বর ওয়ার্ড) কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর এরশাদ শিকদার বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর এরশাদ আবারো দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। কিন্তু সমালোচনার মুখে কিছু দিন পরই আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন। ১৯৯৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার সময়ও তিনি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার ছিলেন।
প্রায় ৬০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এরশাদ শিকদার। ২৪টি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেন তার বডিগার্ড নুরে আলম। ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনার জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এরশাদ শিকদার যখন জীবিত ছিলেন তখন অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার কোটি টাকা অর্জন করেছিলেন। ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, চোরাচালানসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করতেন না। অবৈধ উপায়ে অর্জিত এ টাকা তিনি ব্যাংকে রাখার পাশাপাশি এলাকায় বিভিন্ন ধরনের দাদন ব্যবসা, সুদের ব্যবসা, জমি ক্রয় ও বিক্রয় এবং বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ধার দিয়ে তাদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রাখতেন। আর এ অবৈধ উপায়ে অর্জিত টাকা দিয়েই তিনি এ বিলাসবহুল বাড়ি স্বর্ণকমল তৈরি করেছিলেন। সেই সময়ে বাড়িটিতে গোপন কুঠরি এবং অস্ত্র ভাণ্ডার ছিল বলে শোনা যায়। এক সময় সাধারণ মানুষের খুব আগ্রহের একটি জায়গা ছিল ‘স্বর্ণকমল’। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ বাড়িটি দেখতে আসতো। আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ওই বাড়িটি।
হাসতে হাসতে নির্মম পৈশাচিক অত্যাচার করে মানুষ হত্যা করতো এরশাদ শিকদার। বরফকল ছাড়াও খুলনা শহরের বিভিন্ন জায়গায় কতগুলো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানিয়েছিল তিনি। রেলওয়ে এলাকার পুরাতন পানির টাংকি, বরফকলের পেছনে পরিত্যক্ত মঠ এসব জায়গায় ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পগুলোর কোনোটাতে মানুষ মারা হতো ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে, কোনোটায় গুলি করে।
একাত্তর/এআর