চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ, খারাপ প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে

বাগেরহাটে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত চিংড়িতে বিভিন্ন ধরণের অপদ্রব্য মিশিয়ে ওজন বাড়ানো হচ্ছে। অধিক লাভের আশায় কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন ধরণের অপদ্রব্য দিয়ে জেলি তৈরি করে চিংড়িতে পুশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে গলদা ও বাগদা চিংড়িতে সিরিঞ্জের সাহায্যে নানা ধরণের জেলি পশু করে ওজন বাড়ানো হয়।

চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারেও। চিংড়ির মান নিয়ে শঙ্কিত ভোক্তারা।

এ অবস্থায় বাগেরহাট মৎস্য বিভাগ গত ৬ মাসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পুশ করার সময় এক হাজার ৬৬০ কেজি জেলিযুক্ত চিংড়ি জব্দ করেছে। পাশাপাশি চিংড়িতে জেলি পুশ করার অপরাধে বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

চিংড়িতে জেলি পুশ করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। এরপরেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো চিংড়িতে জেলি পুশ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরার বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাহিদা রয়েছে বিশ্ববাজারে। অধিক লাভের আশায় একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী চিংড়ির ওজন বাড়াতে সাগু, ভাতের মাড় ও অ্যারারুট দিয়ে এক ধরণের জেলি তৈরি সিরিঞ্জের মাধ্যমে তা চিংড়িতে পুশ করে থাকে।

অনেক সময় আড়ত এবং গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিংড়ি নিয়ে এসব অপদ্রব্য পুশ করা হয়।

ওই চিংড়ি হাত বদলের মাধ্যমে রপ্তানিকারক কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশেও যায়। মাঝে মধ্যে জেলিযুক্ত চিংড়ি ধরা পড়ে বিদেশের বাজারে।

এমতাবস্থায় চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ ঠেকাতে মৎস্য বিভাগ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ এবং র‌্যাব সদস্যরা বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করছে।


বাগেরহাট জেলা মৎস্য বিভাগ জানায়, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে মৎস্য বিভাগ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে নিয়ে বাগেরহাট সদর, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, চিতলমারী, রামপাল ও মোংলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযান চলাকালে বিভিন্ন চিংড়ি ডিপো এবং গ্রাম থেকে জেলি পুশ করা এক হাজার ৬৬০ কেজি চিংড়ি জব্দ করা হয়।

এর মধ্যে ১ আগস্ট ফকিরহাট উপজেলার ফলতিতা কেরামত আলী মার্কেটের একটি ঘরের সাটার খুলে জেলি পুশ করার সময় হাতে-নাতে ৯ জনকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে এক হাজার ২৮০ কেজি জেলিযুক্ত চিংড়ি জব্দ করা হয়। আটক ৯ জনের মধ্যে চারজনকে এক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং অন্য পাঁচজনকে অর্থদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক।

ছয় মাসে অভিযান চলাকালে ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, এর আগে গত ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে মৎস্য বিভাগ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে নিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৪৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ৫৪০ কেজি জেলিযুক্ত চিংড়ি জব্দ করে। সে সময় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। জব্দ করা জেলিযুক্ত সব চিংড়ি ধ্বংস করা হয়।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, বাগেরহাট জেলায় ৭২ হাজার ৭২৪ হেক্টর জমিতে ৭৭ হাজার চিংড়িঘের রয়েছে। এর মধ্যে ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে ৫২ হাজার বাগদা এবং ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ২৫ হাজার গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে।

জেলায় ৫৫ হাজার চাষি চিংড়ি চাষের সাথে যুক্ত।

২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাগেরহাট জেলায় মোট ৩৫ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে। ওই অর্থবছরে খুলনা বিভাগ থেকে ২৪ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন চিংড়ি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এসব চিংড়ি রপ্তানি করে চার হাজার কোটি টাকা আয় করেছে দেশ।

এর আগে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে বাগেরহাট জেলায় মোট ৩৫ হাজার ৬৭২ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৩৬৭ মেট্রিক টন চিংড়ি রপ্তানি করে দেশ তিন হাজার ৭০০ কোটি টাকা আয় করে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম রাসেল জানান, চিংড়ির মান বজায় রাখতে চাষি এবং ব্যবসায়ীদের নানানভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর চিংড়িতে যাতে কেউ কোন ধরণের অপদ্রব্য পুশ করতে না পারে সে জন্য চাষি এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সময় সতর্ক করা হয়েছে। এরপরেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক লাভের আশায় গলদা ও বাগদা চিংড়িতে বিভিন্ন ধরণের জেলি পুশ করছে।

চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ রোধ করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাথে নিয়ে তারা বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ করেছেন। অভিযান চলাকালে জড়িতদের আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চিংড়ির গুনগত মান নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন সময় তারা অভিযান চালিয়ে থাকে।


বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন জানান, চাষিরা গুনগত মান বজায় রাখতে নিয়ম মেনে মৎস্যঘের প্রস্তুত করে চিংড়ি চাষ করছে। ঘের থেকে চিংড়ি ধরা এবং বাজারজাত করা পর্যন্ত চিংড়ির মানের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। চাষি পর্যায়ে চিংড়িতে কোন ধরণের অপদ্রব্য পুশ করার সুযোগ নেই। অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়ি শিল্পকে ধ্বংস করতে মেতে উঠেছেন।

আরও পড়ুন: ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন হবে শিগগিরি: পরিকল্পনামন্ত্রী

বাগেরহাটের বারাকপুর পাইকারি মৎস্য আড়তের সভাপতি সৈয়দ জাকির হোসেন জানান, এই আড়তে পুশ করা চিংড়ি বিক্রি হয় না। জেলি পুশ করা চিংড়ি তাদের আড়তে আনার পর ধরা পড়লে তারা ওই চিংড়ি বাজেয়াপ্ত করে। বিভিন্ন আড়ত থেকে কতিপয় ব্যবসায়ী চিংড়ি ক্রয় করার পর জেলি পুশ করে ওজন বৃদ্ধি করে। এরপর ওই চিংড়ি তারা বিভিন্ন রপ্তানিকারক কোম্পানির কাছে বিক্রি করে থাকে।

জাকির হোসেনের অভিযোগ, বিভিন্ন কোম্পানি জেনে-বুঝেই পুশ করা ওই চিংড়ি কিনে নেয়। পুশ করা চিংড়ি রপ্তানির কারণে বিদেশের বাজারে দেশের চিংড়ির বাজার হারাচ্ছে। একারণে যারা চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করছে এবং যেসব কোম্পানি ওই চিংড়ি ক্রয় করে রপ্তানি করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও করেন তিনি।


একাত্তর/আরএ